সাহিত্য এবং মুভি (কিংবা ডকুমেন্টারী) এই দুইটা জিনিষের বড় একটা ক্ষমতা হল মানুষের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা। সম্পূর্ণ অবাস্তব একটা বিষয়কে এমনভাবে বাস্তবায়িত করা হয় যে মেকি কান্না পড়ে/দেখেও মানুষ কাঁদে, মেকি আনন্দে আনন্দিত হয়। মুভির শখ কোনদিন আমার ছিল না তবে স্কুলের শেষের দিকে সাহিত্য পাগল ছিলাম, কলেজে পড়াশোনার চাপে সাহিত্য পড়া কমিয়ে দিলেও অল্পস্বল্প পড়া হত। বুয়েটে আসার পর সাহিত্যপ্রীতি পুরোপুরি আমাকে ছেড়ে চলে যায়। এখন যখন বছর কয়েক আগে পড়া সাহিত্যগুলো নিয়ে ভাবি তখন অবাক হয়ে যাই যে Spiritually Void একটা বিষয় কীভাবে সারা পৃথিবীর মানুষকে নাড়িয়ে দিতে পারে। হালাল-হারামের প্রশ্নে যাওয়ার কোন কারণ/দরকার কোনটাই এখানে নেই কিন্তু বাংলা এবং ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে আমার দুটো আলাদা ভাবনা কাজ করে যেগুলো বলতে চাচ্ছি।

শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ এদের বইগুলিতে ঐ সময়ের গ্রাম এবং শহরের মানুষের চিন্তাধারা খুব স্পষ্ট বোঝা যায়। একটা বিষয় খেয়াল করেছি যে ঐ সময়ের মানুষের লজ্জাবোধ অনেক বেশি ছিল তা সে যে ধর্মের অনুসারীই হোক না কেন! বাসার মেয়েরা বাইরের লোকদের সামনে আসতে কী পরিমাণ লজ্জা পেত তা বোঝা যায় এই ধরণের কথায়- “ঠাকুর কখন যে অন্দরমহলে আসিয়া উপস্থিত হইল তাহা নীলাদ্রি খেয়াল করে নাই। তৎক্ষণাৎ মাথার কাপড়খানা টানিয়া দিতে যাইয়া লজ্জায় যেন মাটির সাথে মিশিয়া গেল-ধরণী দ্বিধা হও।” নিশ্চয়ই ঐ সময়ের মানুষও এমন লাজুক এবং শালীন ছিল। লেখকের লেখায় সমাজের একটা ছাপ থাকেই। এখনকার মানুষের মধ্যে লাজ-লজ্জা যেমন দুর্লভ বস্তু তেমনি এখনকার বাংলা সাহিত্য থেকেও লজ্জাবোধ একেবারেই উধাও। এখনকার যুগে শরৎচন্দ্র ঐ কথা লিখলে সবার আগে নারীদেরকে বস্তাবন্দি করার অপরাধে সুশীলদের গালি বন্যায় ভেসে যেত।

ইংরেজী সাহিত্যে জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণার ছাপ প্রবল। পাশ্চাত্য সমাজ আগে থেকেই যে আত্মিক শূণ্যতায় ভুগছে তার স্পষ্ট প্রমাণ পাশ্চাত্য সাহিত্য। এই বিতৃষ্ণার কারণ কখনও প্রেমে ব্যর্থতা টাইপের লেইম কিছু আবার কখনও প্রচণ্ড দরিদ্র্যতা। স্রষ্টা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা এবং সঠিক উত্তর না পাওয়াও অন্যতম একটা কারণ। “দি আউটসাইডার” এর মোরসল্ট, “দি এডভেঞ্চার অব অগীমার্চ” এর দুই ভাই, “দি ওয়াল” এর পাবলো কিংবা “মেটামরফোসিস” এর বাসার বড় ছেলে-ঘুরে ফিরে একই বানীঃ জীবনের কোন অর্থ নেই কিংবা জীবনে বাঁচতে চাও তো দুই নাম্বারি করো। এইসব আবেগ কতটা বোগাস তার একটা নমুনা বলি-

জা পল সাঁত্রে-র “দি এজ অব রিজন” গল্পের নায়ক ম্যাথু। তার প্রেমিকা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে একদিন। এখন সে তাকে বিয়ে করতে পারছে না। কারণ, এই জোরপূর্বক বিয়েতে ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়। প্রেমিকার গর্ভপাতের জন্য পাঁচ হাজার ফ্রাঙ্ক দরকার যেটাও সে দিতে পারছে না নিজের অভাবের কারণে আবার চুরি করতে পারছে না নৈতিকতার কারণে। অবশেষে জীবনের কোন অর্থ খুঁজে না পেয়ে ম্যাথু ঘুরে বেড়ায় প্যারিসের পথে পথে। শেষমেষ দানিয়েল নামের আরেক ছেলে সেই মেয়েকে সব জেনেশুনে বিয়ে করে আর এভাবেই নাকি জয় হয় মানবতার।

আমরা আল্লাহর কাছে এসব অপসাহিত্য থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

৭ এপ্রিল, ২০১৪