আমাদের প্রজন্মে যদিও বিশ্বব্যাপী মহামারীর (Covid-19) ঘটনা এই প্রথম। তবে সময়ের ইতিহাসে এবং ইসলামের ইতিহাসেও এ পর্যন্ত বেশ অনেকগুলো মহামারী অতিবাহিত হয়েছে। মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ এবং ভয়াবহ আকারে যে কয়টি মহামারী ছড়িয়ে পড়েছিলো, সেগুলো নিম্নরূপ:

১- ১৮ হিজরি মোতাবেক ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে ছড়িয়ে পড়া আমওয়াস মহামারী।
২- ৬৯ হিজরি মোতাবেক ৬৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ছড়িয়ে পড়া জারিফ মহামারী।
৩- ৮৭ হিজরি মোতাবেক ৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে ছড়িয়ে পড়া ফাতায়াত মহামারী। এই মহামারীতে অধিকাংশ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণের মৃত্যু হওয়ায় এটিকে তাউনে আশরাফ তথা সম্ভ্রান্তদের মহামারীও বলা হয়।
৪- ১৩১ হিজরি মোতাবেক ৭৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ছড়িয়ে পড়া তাউনু মুসলিম ইবনু কুতাইবা।
৫- এছাড়া আব্বাসীয়, মামলুক এবং আইয়ুবী শাসনামলে ইসলামি প্রাচ্যে আরো কিছু মহামারী ছড়িয়ে পড়েছিল।

আমওয়াসের মহামারী (Bubonic Plague):

৬৩৯ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ১৮ হিজরির, মতান্তরে ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন ইসলামি খেলাফতের আমির। সে সময় সিরিয়া-প্যালেস্টাইনে দেখা দেয় মহামারি প্লেগ। খলিফা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে জানতে পারেন সিরিয়ায় মহামারি প্লেগ দেখা দিয়েছে। সে সময় হজরত উমর ছিলেন প্রায় অর্ধ জাহানের খলিফা। সে সময় সিরিয়া-প্যালেস্টাইনে ছিল হজরত ওমরের রাষ্ট্রীয় সফর। সফরের উদ্দেশ্যে তিনি মদিনা থেকে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে যান। মদিনা থেকে শামে অবস্থিত তাবুক গ্রামের ‘সারগ’ নামক এলাকার কাছে এলে সেনাপতি আবু উবাদাহ ও অন্য নেতাদের সঙ্গে দেখা হয়। ওমর (রা.)-কে তাঁরা অবহিত করল যে, সিরিয়ায় প্লেগ তথা মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ফিলিস্তিনের আল কুদস ও রামলার মধ্যভাগে অবস্থিত একটি অঞ্চল হলো আমওয়াস বা ইমওয়াস, সেখানে প্লেগ রোগ প্রথম প্রকাশ পায়। অতঃপর তা পুরো শামে ছড়িয়ে পড়ে। ইসলামের ইতিহাস এ ঘটনা “ত্বঊন আমাওয়াস” (طاعون عمواس) নামে পরিচিত। সিরিয়া মহামারি প্লেগ-এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায় হজরত ওমর প্রবীণ সাহাবাদের কাছে এ মর্মে পরামর্শ চান যে, তিনি সিরিয়া সফর করবেন নাকি মদিনায় ফিরে যাবেন? সাহাবাদের মধ্য থেকে দুইটি মতামত জানানো হয়-

হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাষ্ট্রীয় সফরে মহামারী প্লেগ আক্রান্ত অঞ্চলে যাবেন নাকি মদিনায় ফিরে যাবেন এ নিয়ে ৩টি পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়-

– প্রথমটি ছিল : প্রবীণ সাহাবাদের পরামর্শ
কিছু সাহাবা মতামত দিলেন যে, আপনি যে উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন, সে উদ্দেশে সফর অব্যাহত রাখেন। অর্থাৎ সিরিয়ায় যাওয়ার পক্ষে মত দেন। আবার কিছু সাহাবা বললেন, ‘খলিফার সিরিয়া যাওয়া উচিত হবে না।

– দ্বিতীয় ছিল : আনসার ও মুহাজিরদের পরামর্শ সভা
হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রবীণ সাহাবাদের কাছ থেকে দুইটি মতামত পাওয়ায় পুনরায় পরামর্শের জন্য আনসার ও মুহাজির সাহাবাদের ডাকলেন। তারাও মতপার্থক্য করলেন।

– সবশেষে ছিল : প্রবীন কুরাইশদের পরামর্শ সভা
খলিফা ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সবশেষে প্রবীণ কুরাইশদের ডাকলেন। তারা কোনো মতানৈক্য না করে সবাই এ মর্মে মতামত ব্যক্ত করলেন যে-
‘সিরিয়ার সফর স্থগিত করে আপনার মদিনায় প্রত্যাবর্তন করা উচিত। আপনি আপনার সঙ্গীদের মহামারী প্লেগের দিকে ঠেলে দেবেন না।’

হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রবীণ কুরাইশদের মতামত গ্রহণ করে সিরিয়ার সফর স্থগিত করে মদিনায় ফিরে গেলেন।

খলিফার মদিনায় ফেরত যাওয়া দেখে সেনাপতি হজরত উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন! আপনি কি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তাকদির থেকে পলায়ন করে ফিরে যাচ্ছেন?’

সেনাপতি হজরত আবু উবাইদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছ থেকে এ কথা শুনে হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কষ্ট পেলেন। প্রিয় মানুষের কাছে যেভাবে আপনজন কষ্ট পায়। কেননা হজরত আবু উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন খলিফার অনেক পছন্দ ও ভালোবাসা পাত্র। তাছাড়া সেনাপতি আবু উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবাদের অন্যতম একজন।

তখন হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘হে আবু উবায়দাহ! এ কথাটি তুমি না বলে যদি অন্য কেউ বলতো! তিনি সেনাপতির কথার উত্তরে বললেন- ‘হ্যাঁ’, আমরা আল্লাহর এক তাকদির থেকে আরেক তাকদিরের দিকে ফিরে যাচ্ছি।’ হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতি আবু উবায়দাহকে এ কথা বুঝাতে একটি উদাহরণ তুলে ধরেন এবং বললেন-
‘তুমি বলতো, তোমার কিছু উটকে তুমি এমন কোনো উপত্যকায় নিয়ে গেলে যেখানে দুইটি মাঠ আছে। মাঠ দুইটির মধ্যে একটি মাঠ সবুজ শ্যামলে ভরপুর। আর অন্য মাঠটি একেবারে শুষ্ক ও ধূসর। এখানে উট চরানো নিয়ে বিষয়টি কি এমন নয় যে, ‘তুমি সবুজ-শ্যামল মাঠে উট চরাও। আর তা আল্লাহর নির্ধারিত তাকদির অনুযায়ীই চরিয়েছ। আর যদি শুষ্ক মাঠে চরাও, তা-ও আল্লাহর তাকদির অনুযায়ী চরিয়েছ।

সে সময় হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি হাদিস বর্ণনা করেন। সে হাদিসের বর্ণনায় হজরত আবু উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর জিজ্ঞাসার পরিপূর্ণ সমাধান ওঠে আসেছে।

হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিস শোনালেন। আর তাহলো-

إِذَا سَمِعْتُمْ بِالطَّاعُونِ بِأَرْضٍ فَلَا تَدْخُلُوهَا وَإِذَا وَقَعَ بِأَرْضٍ وَأَنْتُمْ بِهَا فَلَا تَخْرُجُوا مِنْهَا
‘তোমরা যখন কোনো এলাকায় মহামারী প্লেগের বিস্তারের কথা শুনো, তখন সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোনো এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব নেমে আসে, আর তোমরা সেখানে থাকো, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়েও যেও না।’ এ কথা শুনে ওমর (রা.) আলহামদুলিল্লাহ বললেন। অতঃপর সবাই ফিরে গেলেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৭২৯)

অন্য এক বর্ণনায় আছে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্লেগ সম্পর্কে বলেন, “এটা হচ্ছে একটা আজাব। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের উপর ইচ্ছা তাদের উপর তা প্রেরণ করেন। তবে, আল্লাহ মুমিনদের জন্য তা রহমতস্বরূপ করে দিয়েছেন। কোনো ব্যক্তি যদি প্লেগে আক্রান্ত জায়গায় সওয়াবের আশায় ধৈর্য ধরে অবস্থান করে এবং তার অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে, আল্লাহ তাকদীরে যা লিখে রেখেছেন তাই হবে, তাহলে সে একজন শহীদের সওয়াব পাবে।” [সহীহ বুখারীঃ ৩৪৭৪]

ওমর (রা.) মহামারি চরম আকার ধারণের খবর অবগত হন। ওমর (রা.) চাইলেন সেনাপতি আবু উবায়দা (রা.)-কে ফিরিয়ে আনতে। তাই ওমর (রা.) একটি চিঠি লিখলেন, ‘তোমার ওপর শান্তি বর্ষণ হোক। তোমার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ সম্পর্কে সরাসরি তোমাকে বলতে চাই। তাই তোমাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বলছি, আমার পত্র পড়ে আমার উদ্দেশে বের হওয়ার আগে পত্রটি তোমার হাতছাড়া করবে না। রাতে পত্র পৌঁছলে সকাল হওয়ার আগেই যাত্রা শুরু করবে। আর দিনের বেলায় পৌঁছলে সন্ধ্যা হওয়ার আগেই যাত্রা শুরু করবে।’

আবু উবায়দা (রা.) পত্র পড়ে উদ্দেশ্য বুঝে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ আমিরুল মুমিনিনকে ক্ষমা করুন।’ অতঃপর ওমর (রা.)-এর উদ্দেশে একটি পত্র লিখলেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন, আমি আপনার প্রয়োজনের বিষয় বুঝেছি। আমি এখন মুসলিম সেনাবাহিনীতে অবস্থান করছি। তাদের ছেড়ে যেতে চাই না। আল্লাহ তাআলা আমিসহ সবার ব্যাপারে ফায়সালা করবেন। অতএব হে আমিরুল মুমিনিন, আপনার সিদ্ধান্ত থেকে আমাকে মুক্ত করুন। আমার সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে আমাকে ছেড়ে দিন।’

আবু উবায়দা (রা.)-এর পত্র পড়ে ওমর (রা.) কাঁদতে থাকেন। আশপাশের মুসলিমরা ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘হে আমিরুল মুমিনিন, আবু উবায়দা কি শহীদ হয়েছেন? ওমর (রা.) বলেন, ‘না, তিনি এখনো শহীদ হননি। কিন্তু …।’ অর্থাৎ শিগগির তিনি শহীদ হবেন।’ (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৭/৪৪)

এরপর উমর রা. আবু উবাইদাকে পত্রের উত্তরে লিখলেন, ‘সালামুন আলাইক। পর সংবাদ এই যে, আপনি মুসলমানদেরকে নিয়ে একটু নিচু এলাকাইয় অবস্থান করছেন, আপনি তাদেরকে নিয়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু ও রোগমুক্ত অঞ্ছলে চলে আসুন।” আবু উবাইদা তেমনটিই করেছিলেন। এ ঘটনায় অসুস্থতা এবং দুর্যোগে সুরক্ষার উপায়-উপকরণ গ্রহণ এবং ব্যাধি সংক্রমণের উৎস থেকে নিরাপদ অবস্থানে সরে যাওয়ার শিক্ষা রয়েছে।

আবু উবাইদাহর (রাঃ) ইন্তেকালের পর সেনাপতি হন রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরেক প্রিয় সাহাবী মু’আজ ইবনে জাবাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। সবাই তখন প্লেগের আতঙ্কে ভীত-সন্ত্রস্ত। নতুন সেনাপতি হবার পর মু’আজ (রাঃ) একটা ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি বলেনঃ

“এই প্লেগ আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো মুসিবত নয় বরং তাঁর রহমত এবং নবীর দু’আ। হে আল্লাহ! এই রহমত আমার ঘরেও পাঠাও এবং আমাকেও এর যথেষ্ট অংশ দান করুন।” [হায়াতুস সাহাবাঃ ২/৫৮২]

দু’আ শেষে এসে দেখলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয়পুত্র আব্দুর রহমান প্লেগাক্রান্ত হয়ে গেছেন। ছেলে বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে কুর’আনের ভাষায় বলেনঃ “আল-হাক্কু মির রাব্বিকা ফালা তাকুনান্না মিনাল মুমতারিন- সত্য তোমার রবের পক্ষ থেকে। সুতরাং, তুমি কখনো সন্দেহ পোষণকারীর অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” [সূরা বাকারাঃ ২:১৪৭] পুত্রের সান্ত্বনার জবাব পিতাও দেন কুর’আনের ভাষায়ঃ “সাতাজিদুনী ইন শা আল্লাহু মিনাস সাবিরীন- ইন শা আল্লাহ তুমি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবে।” [সূরা আস-সাফফাতঃ ৩৭:১০২]

কিছুদিনের মধ্যে তাঁর প্রিয়পত্র প্লেগে আক্রান্ত হয়ে শহীদ হন, তাঁর দুই স্ত্রী শহীদ হন। অবশেষে তাঁর হাতের একটা আঙ্গুলে ফোঁড়া বের হয়। এটা দেখে মু’আজ (রাঃ) প্রচন্দ খুশি হন। আনন্দে বলেন, “দুনিয়ার সকল সম্পদ এর তুলনায় মূল্যহীন।” অল্পদিনের মধ্যে তিনিও প্লেগে আক্রান্ত হয়ে শহীদ হন। [আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, ৩/১৫১-১৫২]

শাম থেকে এই ভয়াবহ মহামারী দূর হয়েছিল আমর ইবনুল আস রা. ক্ষমতাগ্রহণের পর। তিনি লোকদেরকে উদ্দেশ্য করে ভাষণে বলেন, ‘হে লোকসকল, এই মহামারী যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন আগুনের মতো দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে। তাই এ থেকে বাঁচতে পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নিন। আগুন যখন জ্বালানোর মতো কিছু না পাবে, তখন এমনিতেই নিভে যাবে।’ এই আদেশ শুনে একজন সাহাবি প্রতিবাদ করে বললেন, ‘আমি রাসুলাল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গী ছিলাম। আল্লাহর কসম, আপনি ভুল করছেন। আপনি আমার গাধার চাইতেও বেশি বিভ্রান্ত।’ স্থিতধী আমর ইবন আল-আস এমন অপমানের পরেও ক্রুদ্ধ হলেন না। শুধু বললেন, ‘আমি আপনার উত্তর দিয়ে আপনার কথাকে মহীয়ান করব না। আপনাকে শাস্তিও দেবো না।’ অতঃপর লোকেরা তার আদেশ মেনে দলে দলে গিয়ে বের হয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নিতে থাকে। অবশেষে আল্লাহ এই মহামারীকে উঠিয়ে নেন। আমর ইবনুল আস রা.-এর গৃহীত এই পদক্ষেপ ওমর রা.-এর কানে পৌঁছায়। তিনি এটিকে অপছন্দ করেননি। এখান থেকে আমরা মহামারীর সময়ে একে অপর থেকে পৃথক হওয়ার এবং জমাটবদ্ধ না হওয়ার বৈধতা পাই।

এই মহামারী শামে গুরুতর আকার ধারণ করেছিল। এতে বিশ হাজারের অধিক মুসলমানের মৃত্যু হয়েছিল। যাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন সাহাবী এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব। তাদের মধ্যে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ, মুয়াজ ইবনু জাবাল, ইয়াজিদ ইবনু সুফিয়ান, হারিস ইবনু হিশাম (তাঁর সম্পর্কে এও বলা হয় যে তিনি ইয়ারমুকের যুদ্ধে শহিদ হয়েছেন), সুহাইল ইবনু আমর, উতবা ইবনু সুহাইল প্রমুখ সাহাবীগণ ইন্তেকাল করেন।

যুগে যুগে মহামারী ও মুসলিম দায়িত্বশীলদের অবস্থান:

৬৯ হিজরিতে জারিফ মহামারী ছড়িয়ে পড়ে বসরা নগরীতে। আবদুল্লাহ ইবনু জুবাইর রা.-এর খেলাফতকালে। মৃতের সংখ্যাধিক্যের কারণে এ মহামারীর নাম হয়েছিল জারিফ। জারিফ শব্দের অর্থ সুদূরপ্রসারিত। এই মহামারীতে মৃতের মিছিল প্লাবনের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। ৮৭ হিজরীতে ইরাক এবং বৃহত্তর সিরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে আরেক মহামারী। এটিকে তাউনু ফাতায়াত অথবা যুবতীদের মহামারী বলা হয়। কারণ, প্রথমে এটি মহিলা এবং কুমারীদের মাঝে ছড়িয়েছিল। অতঃপর পুরুষদের মাঝে ছড়িয়েছে। এটিকে তাউনু আশরাফও বলা হয়। কারণ, এতে সম্ভ্রান্ত এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মৃত্যু হয়েছিল অধিক হারে।

উমাইয়া শাসনামলের সর্বশেষ মহামারী ছিল ১৩১ হিজরীর তাউনু কুতাইবা ইবনু মুসলিম। এ মহামারীতে সবার আগে ইন্তেকাল করেন বিখ্যাত মুসলিম সেনাপতি কুতাইবা ইবনু মুসলিম। তার নামেই নামকরণ করা হয় এই মহামারীর। বসরায় আপতিত হওয়া এই মহামারীর স্থায়ীত্ব ছিল তিন মাস। রমজান মাসে এটি গুরুতর আকার ধারণ করে। তখন একইদিনে একহাজারের অধিক জানাজা পড়া হতো।

এর কয়েক শতাব্দী পরে ৩৯৫ হিজরীতে মরক্কো ও আন্দালুস তথা আজকের স্পেনে মহামারীর কারণে দ্রব্যমূল্যের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। ধনী-গরীব সকলেই মারা যেতে থাকে। শহরের যে কোন মানুষকে দেখলে দেখা যাবে, সে রোগী দেখতে রেরিয়েছে কিংবা কোন রোগীর সেবা করছে, কিংবা কোন মৃতের জানাযা প্রস্তত করছে। কায়রাওয়ান শহরের মসজিদগুলো বিরান হয়ে পড়ে। ( আল বায়ানুল মুগরিব ফী আখবারিল আন্দালুস ও ওয়াল মাগরিব, ইবনু উযারী আল মারাকিশী)।

হিজরী ৪৪৮ সনে স্পেনে সংঘটিত এক মহামারীর বর্ণনায় ইমাম যাহাবী বলেন, আন্দালুসে (স্পেন) বড় ধরণের মহামারী দেখা দেয়। মানুষ দুর্ভিক্ষে নাকাল হয়ে পড়ে। এমনকি ইশবিলিয়াতে (সেভিল) অসংখ্য মানুষ মারা যায়। মসজিদগুলো বন্ধ হয়ে যায়। নামাজ পড়ার ও পড়াবার মতো কেউ বাকী ছিল না। (তারিখুল ইসলাম)

পরবর্তী বছর ৪৪৯ হিজরীতে মধ্যএশিয়াতে হানা দেয়া এক মহামারীতে প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ মারা যায়। যার প্রভাব ইরাক পর্যন্ত চলে এসেছিল। ইবনুল জাওযীর সূত্রে যাহাবী বলেন, “৪৪৯ হিজরীর জুমাদাল উখরাতে ’মা ওয়ারা আন্নাহার’ এর এক ব্যবসায়ীর চিঠি আসে। সেখানে মধ্য এশিয়া অঞ্চলে মরণঘাতী মহামারীর বর্ণনা দেন ব্যবসায়ী। একদিনে আঠার হাজার মানুষের জানাযার কথা জানান তিনি। আরেক গ্রন্থে মৃতের সংখ্যা ষোল লক্ষ পঞ্চাশ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়। ইবনুল জাওযী উল্লেখ করেন, “রাস্তাঘাট ফাঁকা। বাজারে লোক নেই। সকল বাড়ির দরজা বন্ধ। ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছু স্থগিত। রাতদিনের কাজ শুধু মৃতদের গোসল, দাফন ও কাফন। অধিকাংশ মসজিদ জামাত থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে’’। (তারিখুল ইসলাম)

৪৭৮ হিজরিতে এক মহামারী ছড়িয়ে পড়ে ইরাক, সিরিয়া এবং হিজায অঞ্চল জুড়ে। এর ধরণটা ছিল প্রচণ্ড জ্বর হতো। মানুষজন, পশুপাখি, মোট কথা প্রাণীজগৎ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। চারিদিকে মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়। আমিষের অভাবে ভুগছিল লোকজন। এক প্রকার কালো বাতাস আর বজ্রপাত গাছপালা উপড়ে ফেলছিল। লোকেরা ভাবতে শুরু করল কিয়ামত বুঝি চলে এসেছে! এই মহামারী প্রতিরোধ করতে তৎকালীন আব্বাসি খলিফা আল-মুকতাদী বি-আমরিল্লাহ (মৃত্যু ৪৮৭ হি.) নির্দেশ জারী করলেন, সবাই যেন আমর বিল-মা’রূফ ওয়া নাহী আনিল-মুনকার করে; অর্থাৎ সৎ কাজে আদেশ এবং অসৎ কাজে বাঁধা প্রদানে নেমে পড়ে। এতে করে সকল বাদ্য-যন্ত্র গুঁড়িয়ে দেয়া হলো। ভেঙে চুরমার করে দেয়া হলো মদের বোতল। আর দুর্নীতি সমূলে উচ্ছেদ করা হলো দেশ থেকে। ফলশ্রুতিতে কিছু কাল যেতেই সেই রোগ দূর হয়ে গেল।(বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, ১৩/২১৬)

ইবনু কাসির বলেন, ৬৫৬ হিজরিতে মঙ্গলরা যখন বাগদাদকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়, তখন মসজিদ-মাদ্রাসাগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। বেশ কয়েকজমাস বন্ধ হয়ে থাকে জামায়াত এবং জুময়ার নামাজ আদায়। মঙ্গোলরা চলে যাওয়ার পর চল্লিশদিন পর্যন্ত বাগদাদ বিরান অবস্থায় পড়ে থাকে। গুটিকয়েক মানুষ শুধু ছিল সেখানে। বাগদাদের পথে পথে কাটা বৃক্ষের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়েছিল লাশের পর লাশ। বৃষ্টি নেমে এলে পাল্টে যায় লাশের অবস্থা। পুরো বাগদাদ তাদের লাশের দুর্গন্ধে দূষিত হয়ে যায়। দূষিত বাতাসের কারণে ছড়িয়ে যায় মহামারী। এ বাতাস ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর সিরিয়াতেও। পরিবেশ বিপর্যয় এবং দূষিত আবহাওয়ার কারণে সেখানেও অনেক লোকের মৃত্যু হয়। মানুষ হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৩/২০৩)

৭৪৮ হিজরী মোতাবেক ১৩৪৭ খ্রিষ্টাব্দে মামলুকদের শাসনামলে বৃহত্তর সিরিয়া মুখোমুখি হয় আরেক মহামারীর। এ মহামারীতে সিরিয়ার অধিকাংশই অঞ্চলই আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এ কারণে এই মহামারীকে তাউনে আজম বলা হয়ে থাকে। আলেপ্পো, দামেস্ক, জেরুজালেম এবং উপকূলীয় শহরগুলোর অধিবাসীদেরকে এই মহামারী প্রায় নিঃশেষ করে দেয়। এমনিভাবে ৭৯৫ হিজরী মোতাবেক ১৩৯২ খ্রিষ্টাব্দে আলেপ্পোতে ছড়িয়ে পড়ে অপর এক ব্যাধি। যার নাম দেয়া হয় ‘আল-ফানাউল আজিম’ তথা মহাধ্বংস। এ মহামারীর করাল গ্রাসে আলেপ্পো এবং পার্শ্ববর্তী জনপদ থেকে ঝরে পড়ে দেড় লক্ষ মানুষের প্রাণ।

৭৪৯ হিজরীতে ইউরোপে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নামে পরিচিত মহামারী প্রসঙ্গে মাকরিযী বলেন, মানুষের মধ্য থেকে সকল ধরণের আনন্দ উবে যায়। এ সময় কেউ আনন্দের সাথে কোন কাজ করেছে, এমন দেখা যায়নি। কোন গানের আওয়াজ শোনা যেত না। বিভিন্ন মসজিদে আযান বন্ধ হয়ে যায়। এবং অধিকাংশ মসজিদ ও মসজিদের সাথে সংশ্লিষ্ট খানকা বন্ধ হয়ে যায়। (আননুযুমুয যাহিরাহ, আস সুলুক লি মারিফাতিল মুলুক) প্রায় একই সময়ে প্লেগের ভয়াবহতায় সিরিয়ার দামেস্ক শহর ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। মুরব্বিরা সিদ্ধান্ত নিলেন, শহরের বাইরে গিয়ে সবাই জমায়েত হয়ে সম্মিলিতভাবে দোয়া করবেন। কিন্তু এর ফল হলো ভয়াবহ। আরও দ্রুত ছড়াতে শুরু করল প্লেগ। মৃত্যুহার বেড়ে গেল জ্যামিতিক হারে।

হিজরী ৮২৭ সালে মক্কাতে বড় ধরণের মহামারী ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন গড়ে চল্লিশ জনের জানাজার আয়োজন হতে থাকে। রবিউল আওয়াল মাসেই এক হাজার সাতশত মানুষ মারা যায়। তখন মাকামে ইব্রাহিমে ইমামের সাথে মাত্র দুইজন ব্যক্তি নামাজ পড়েছেন সেখানে। (ইনবাউল গুমার বি আবনাউল উমার, ইবনু হাজার) এখানে কি সরকারী নিষেধাজ্ঞা ছিল নাকি স্বেচ্ছায় মানুষ বিরত থেকেছে, তা বলা কঠিন।

৮৩৩ হিজরীতে সংগঠিত এক মহামারীর প্রসঙ্গে ইবনু হাজার আসক্বালানী বলেন, সরকারী কর্মকর্তা শরীফ বংশের চল্লিশ জনকে একত্রিত করেন, যাদের সকলের নাম ছিল মুহাম্মাদ। তারা জুমার নামাজ থেকে আছর পর্যন্ত তেলাওয়াত করেন। ফলে দলে দলে মানুষ জমা হতে থাকে। ইবনু হাজার বলেন, এরপরই অজ্ঞাত কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকায় মহামারী আশংকাজনকভাবে বেড়ে যায় । (ইনবাউল গুমার) এরপর সপ্তাহ না ঘুরতেই ৪০ জন ছাড়িয়ে দিনে হাজারের বেশি মানুষ মারা যেতে শুরু করলেন।

অন্যদিকে ৮৪৮ হিজরীতে মিসরে একটি মহামারী দেখা দেয়। দৈনিক এক-দুই শত মানুষ মারা যেতে থাকে। তখন হেজায থেকে হাজীদের জামাত ফিরে আসে মিসরে। মানুষ তাদের অভিবাদন জানায়। তারপর থেকে মৃত্যুর হার আরও বেড়ে যায়। দৈনিক হাজার ছাড়িয়ে যায়। ধারণা করা হয়, সেদিন হাজীদের সাথে প্রচুর মানুষের মেলামেশা-দেখাসাক্ষাৎ হয় । যেটা মহামারী ছড়াতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। ইবনু হাজার বলেন, মহামারীতে থেকে বাঁচতে কাযী ইবনু আবী জারদাহ বাড়িতে অবস্থানের জন্য ডাক্তারকে অর্থ দেন। এবং তিনি অসুস্থতার ভান করেন। যাতে তাকে কোন জানাযায় ডাকা না হয় এবং আল্লাহ তায়ালা তাকে মহামারী থেকে নাজাত দেন। (ইনবাউল গুমার)

এরকম সংকটপূর্ণ সময়ে মুসলমানরা কখনোই আল্লাহ তায়ালা নিকটবর্তিতা এবং তাঁর কাছে দোয়া করার কথা ভুলে যায়নি। নেককার এবং সৎ ব্যক্তিগণ আল্লাহ তায়ালার কাছে তওবা, ইস্তেগফার করেছেন। অধিক পরিমাণে ইবাদতে লিপ্ত হয়েছেন। আল্লাহর প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধির জন্য তারা বন্ধ করে দিয়েছিলেন মদের দোকান এবং বিনোদন কেন্দ্রগুলোকে। মানুষ দূর হয়ে গিয়েছিল অসৎ কাজ এবং পাপাচারের জগত থেকে। সেই সাথে সোশ্যাল ডিস্টান্স তথা কোয়ারেন্টাইন বিষয়েও দরকারি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তারা। ১৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দে মাগরিব তথা মরক্কো এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর তারা কোয়ারেন্টিন তথা সঙ্গনিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং প্রাচ্য থেকে আগত এই দুর্যোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এ মহামারীর প্রকোপ থেকে বাঁচতে সক্ষম না হলেও তারা এটির আগমনকে কয়েক বছর পিছিয়ে দিয়েছিল। এটি প্রথমে ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে আলেকজান্দ্রিয়া থেকে ছড়িয়েছিল।

আলজেরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর মহামারীর আগমনকে বিলম্বিত করতে মরক্কোর শাসক সাইয়িদি মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ মরক্কোর মহাসড়কগুলোতে বসিয়েছিলেন সামরিক পাহাড়া। ১৭৯২ খ্রিষ্টাব্দে এই মহামারী থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা প্রণয়নে টাঙ্গিয়ারে একটি কাউন্সিল গঠন করা হয়েছিল। তারা সামুদ্রিক দিক থেকে সংক্রমন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কোয়ারেন্টিনের আদেশ দিয়েছিলেন। এর আগে মাওলা সুলাইমান মহামারী আক্রান্ত আলজেরিয়াতে কোয়ারেন্টিন আবশ্যক করেছিলেন।

মহামারী বিষয়ে সালাফদের লিখিত গ্রন্থসমূহ:

ফিলিস্তিনের গাজা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘আল কাওয়ারিসুত তবিয়িয়‍্যা ফি বিলাদিশ শাম ও মিসর’ (শাম ও মিসরের প্রাকৃতিক দুর্যোগ) নামক একটা এমফিল পত্রে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক যত দুর্যোগ আছে, যেমন দুর্ভিক্ষ, ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস, মহামারী, পঙ্গপালের হামলা ইত‍্যাদির মধ‍্যে মুসলমান ফকিহ ও চিকিৎসকগণ সবচে’ বেশি লেখালেখি করেছেন মহামারী বিষয়ে। বোঝা যায়, ইসলামের ইতিহাসে মহামারীকে ঘিরে উক্ত প্রশ্নগুলো সবসময়ই আবর্তিত ছিল। মহামারীকে নিয়ে আলেমগণের পৃথক অনেক গ্রন্থেরও অস্তিত্ব আছে।

এর মধ‍্যে তাজুদ্দিন সুবকির কথা উল্লেখযোগ্য। তিনি মহামারী সম্পর্কে লিখেছিলেন ‘জুযউন ফিত তাউন’। শিহাবুদ্দিন ইবনে আবি হাজালা তিলমেসানী লিখেছিলেন মহামারী বিষয়ে ‘আত-তিব্বুল মাসনুন ফি দাফইত তাউন’ (মহামারী মোকাবেলায় শরীয়ার প্রতিকার)। এছাড়াও আছেন ঐতিহাসিক ইবনুল ওয়ারদি। যিনি ‘আননাবা আনিল ওবা’ নামে বিবরণমূলক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন মহামারী নিয়ে। এর মধ‍্যে তার পূর্বের যুগগুলোর মহামারীর কথা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। কিন্তু তার যুগের বিবরণ কিছুটা লিপিবদ্ধ করে আর সামনে এগুতে পারেন নি। ৭৪৯ হি. সালের মহামারী তার প্রাণ নিয়ে যায়।

ইবনে হাজার আসকালানি রা. (৭৭৩ – ৮৫২ হি.) তার যুগে মহামারীর প্রকোপ উত্তরোত্তর বৃদ্ধির কারণে একটা গ্রন্থ রচনা করেন মহামারী নিয়ে। নাম ‘বাজলুল মাঊন ফি ফাদতিত তাউন’ (মহামারীর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনায় স্বল্প প্রয়াস) নামে। এই গ্রন্থে তিনি বলেছেন, “আল্লাহ মহামারী সৃষ্টি করেছেন কাফের সম্প্রদায়ের শাস্তি ও আজাবস্বরূপ। এক্ষেত্রে তিনি ঐসব বর্ণনা দ্বারা প্রমাণ দিয়েছেন, যাতে মহামারী দ্বারা পূর্ববর্তী জাতিদেরকে ধ্বংস করে দেয়ার বিবরণ আছে। আর তিনি মহামারীকে মুসলমানদের জন‍্য রহমতস্বরূপ বলে মত দিয়েছেন। দলিল দিয়েছেন ঐসব হাদিস দ্বারা যাতে বর্ণিত হয়েছে, মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে মৃত‍্যুবরণ করলে মুমিনরা জান্নাতে যাবে।” এই গ্রন্থ লেখা শুরু করার কিছুদিনের মধ‍্যেই তার দুই মেয়ে আলিয়া ও ফাতেমা ৮১৯ হি. সালে মারা যায় সেই মহামারীতে।

এছাড়াও আরো অনেক গ্রন্থ রচিত হয়েছে মহামারীকে কেন্দ্র করে। এর মধ‍্যে উল্লেখযোগ্য হল, দার্শনিক ইয়াকুব আল-কিন্দীর (২৫৪ হি.) ‘রিসালাতুন ফিল আবখারাতিল মুসলিহাতি লিল জাওয়ি মিনাল আওবিয়া’ (পরিবেশকে মহামারী-শোধন করতে কিছু উপকারী ধূম্র)। আছে হাফেজ ইবনে আবিদ্দুনয়ার (২৮১ হি.) ‘কিতাবুত তাওয়াইন’। আছে ইবনুল কায়‍্যিম জাওযিয়ার (৭৫১ হি.) ‘কিতাবুত তাউন’। বদরুদ্দিন যারকাশী (৭৯৪ হি.) লিখেছেন ‘রিসালাতুন ফিত তাউন’। জালালুদ্দিন সুয়ূতী (৯১১ হি.) লিখেছেন ‘মা ওরায়ার ওয়াউন ফি আখবারিত তাউন’ এবং ‘আল মাকামাতুত তাউনিয়‍্যা’।

পঞ্চাদশ শতকের একজন যুগসচেতন আলেম ছিলেন ইদরিস বিন হুসামুদ্দিন বাদলিসী (৯৩০ হি. মোতাবেক ১৫২৪ ঈ.)। তিনি একবার হজ্বযাত্রা করেছিলেন তুরস্কের কনস্টান্টিনোপল থেকে মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ার সমুদ্র পথে। কিন্তু ফেরার পথে তিনি জানতে পারলেন, মিসরে মহামারীর প্রকোপ চলছে। তাই মিসরে আর ঢুকলেন না, প্রবল ইচ্ছা থাকার পরও। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দামেস্ক ও হালাবের কতক আলেম তার সমালোচনায় রত হলেন। তখন তিনি তাদের জবাবে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, নাম ‘রিসালাতুন ফিত তাউন ওয়া জাওয়াযুল ফিরারি আনহু’ ( মহামারী থেকে পলায়নের বৈধতা)। এর আরেক নাম ‘আল-ইবা আন মাওয়াকিইল ওবা’।

আলজেরিয়ায় ফরাসি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াকু সৈনিক, হানাফি ফকিহ, বিচারক ও দার্শনিক হামদান বিন উসমান খাজার (১৭৭৩ – ১৮৪২ ঈ.) একটি গ্রন্থ ‘ইতহাফুল মুসান্নিফিন ওয়াল উদাবা বি-মাবাহিছিল ইহতেরাযি আনিল ওবা’ (মহামারী থেকে সতর্কতার আলোচনা)। এই বইতে তিনি খন্ডন করেছেন ওইসব রক্ষণশীলদের যারা কোন ধরণের পরিবর্তন মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। যারা কেবলই ভরসাকারী, যারা আল্লাহর ইচ্ছার উপর সকল বিষয়ের দায়ভার চাপিয়ে দিয়ে নিজেরা ঘরে বসে ঘুমায়। যারা মহামারী ও ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে কোন ধরণের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ ও তা থেকে বাঁচার মাধ্যম গ্রহণ করে না। গ্রন্থটির শুরুতে সে যুগের আট জন শ্রেষ্ঠ ফকিহ ও বিজ্ঞ আলেমের অভিমত যুক্ত করা হয়েছে। বইটিতে তিনি كرنتينه (Quarantine) এর প্রয়োজনীয়তা বিষয়েও নিজ মতামত ব্যক্ত করেছেন। (বিস্তারিত: মহামারী বিপর্যয়ে সচেতনতা : অষ্টাদশ শতকের হানাফি ফকিহের ব্যাখ্যা)

ছোঁয়াচে রোগ ও মহামারীতে রাসূল সা. ও সাহাবাদের আমলঃ

■ নবী(ﷺ) এর আমলঃ
.
নবী(ﷺ) একবার সাহাবীদের নিকট থেকে বায়আত নিচ্ছিলেন। বায়আতের সময়ে হাতে হাত রাখতে হয়। এসময় বায়আত নিতে আগত সাকিফ গোত্রীয় প্রতিনিধি দলের মাঝে একজন কুষ্ঠ রোগী ছিলেন। কুষ্ঠ একটি ছোঁয়াচে রোগ। [১] নবী(ﷺ) তাঁর কাছে সংবাদ পাঠালেন যেঃ আমরা তোমাকে বায়আত করে নিয়েছি। তুমি ফিরে যাও। হাদিসটি বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত আছে। আমরা এখানে লক্ষ করলাম যে, নবী(ﷺ) এই ছোঁয়াচে রোগীর সংস্পর্শে না এসে তাঁকে ফিরে যাবার জন্য বার্তা দিলেন।

মহানবী ﷺ আরেক হাদীসে বলেছেন,
لَا يُورِدَنَّ مُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ
চর্মরোগাক্রান্ত উটের মালিক যেন সুস্থ উট দলে তার উট না নিয়ে যায়।” (বুখারী ৫৭৭১, মুসলিম ৫৯২২নং)

আরেক হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন, “রোগের সংক্রমণ ও অশুভ লক্ষণ বলতে কিছুই নেই। পেঁচার ডাকে অশুভ কিছু নেই, সফর মাসেও অশুভ কিছু নেই, আর কুষ্ঠরোগী থেকে সেই রকম পলায়ন কর, যে রকম সিংহ থেকে পলায়ন কর।” (বুখারী ৫৭০৭, মিশকাত ৪৫৭৭নং)

হাদীসের অর্থ হবে, সংক্রামক ব্যাধি আছে, তা থেকে দূরে থাক, সে রোগকে বাঘের মত ভয় কর। তবে এ কথাও মনে রেখো যে, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোন রোগ তোমার শরীরে সংক্রমণ করতে পারে না।
.
■ মক্কা-মদীনা ও শামের সাহাবীদের আমলঃ
.
একবার এক কুষ্ঠ আক্রান্ত মহিলা মহিলা কা’বায় তাওয়াফ করছিলেন। এটা দেখে উমার(রা.) তাঁকে বললেন, “হে আল্লাহর দাসী, অন্য মানুষকে কষ্ট দিও না। হায়, তুমি যদি তোমার বাড়িতেই বসে থাকতে!” এরপর সেই মহিলা বাড়িতে অবস্থান করতে লাগলেন। ঘটনাটি ইমাম মালিক(র.) এর মুয়াত্তায় বর্ণিত আছে। আমরা জানি যে কা’বায় তাওয়াফের সময় সেখানে অনেক মানুষ থাকে। উমার(রা.) তাঁকে এই ছোঁয়াচে রোগ নিয়ে কা’বায় তাওয়াফ করতে নিষেধ করে বাড়িতে অবস্থান করতে বলেছিলেন।

তাছাড়া আমাওয়াসের প্লেগের ঘটনায় আমরা উমার রা., আমর ইবনুল আস রা. প্রমুখ সাহাবীর গৃহীত সিদ্ধান্তের কথা জেনে এসেছি।

উপরের ঘটনাগুলো ভালো করে লক্ষ করি —
.
১। স্বয়ং নবী(ﷺ) একজন ছোঁয়াচে রোগীর সংস্পর্শে না এসে হাত দিয়ে তার বায়আত নেননি। তিনি যদি সত্যিই এটা বুঝিয়ে থাকতেন যে সংক্রামক ব্যধি বলে কিছু নেই, তাহলে কেন এটি করলেন? আজকে অনেক মুসলিমও ভুল ব্যাখ্যা করে বলছেনঃ সংক্রামক রোগ বলে কিছু নেই, সতর্কতা অবম্বনের প্রয়োজন নেই। আমরা কি আজ নিজেদেরকে রাসুল(ﷺ) এর চেয়েও বেশি তাকওয়াবান ভাবছি?

২। এক মহিলার কা’বায় তাওয়াফ করার ঘটনাতে আমরা দেখলাম যে, পূণ্যময় কাজ হওয়া সত্ত্বেও উমার(রা.) তাঁকে সেটি করতে নিষেধ করছিলেন। কারণ সেই মহিলা ছিলো কুষ্ঠ আক্রান্ত। কা’বায় তাওয়াফের স্থানে ব্যাপক জনসমাগম হয়। এক্ষেত্রে উমার(রা.) অন্য মানুষদের অসুবিধার কথা ভেবে এ কাজ থেকে সেই মহিলাকে বারণ করেছিলেন। লক্ষ করি উমার(রা.) সেখানে কী বলছিলেনঃ “…অন্য মানুষকে কষ্ট দিও না… তুমি যদি তোমার বাড়িতেই বসে থাকতে।” আধুনিক যুগেও আমরা দেখি যে ছোঁয়াচে রোগাক্রান্ত মানুষকে জনসমাগমের মাঝে যেতে নিষেধ করে গৃহে অবস্থান করতে বলা হয়। একে বলা হয় Home isolation।

৩। শামে যাবার পথে বৈঠকে বয়োজ্যেষ্ঠ মুহাজির সাহাবীগণ উমার(রা.) কে বলেছিলেনঃ ” আপনি লোকজনকে নিয়ে ফিরে যান এবং তাদেরকে এই মহামারীর কবলে ঠেলে দেবেন না”। এ থেকে বোঝা গেলো রাসুল(ﷺ) এর সাহাবীগণ রোগের সংক্রমণে বিশ্বাস করতেন এবং তারা মোটেও রাসুল(ﷺ) এর হাদিস থেকে এটা বোঝেননি যে ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই। তাঁরা যদি এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে রোগের সংক্রমণে বিশ্বাস না-ই করতেন, তাহলে এই কথা কেন বললেনঃ “তাদেরকে এই মহামারীর কবলে ঠেলে দেবেন না” ? এ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে সাহাবীরা মনে করতেন মহামারী কবলিত এলাকায় গেলে সুস্থ মানুষও এতে আক্রান্ত হতে পারে।
.
৪। রাসুল(ﷺ) থেকে হাদিস রয়েছে, কোনো এলাকায় সংক্রামক মহামারী হলে সেখানে প্রবেশ না করতে বা সেখান থেকে বেরিয়ে না যেতে। উপরের বিবরণে আমরা এটিও দেখলাম যে এই হাদিসের আলোকে রাসুল(ﷺ) এর সাহাবীগণ মহামারী কবলিত শামে প্রবেশ থেকে বিরত ছিলেন। আমরা আধুনিক যুগেও দেখি সংক্রামক রোগাক্রান্ত অঞ্চলের ব্যাপারে একই রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় যাতে সেখানে গিয়ে অন্যরা আক্রান্ত না হয় এবং সেখান থেকে রোগটি বাইরে ছড়িয়ে না যায়। ইসলামে যদি সংক্রামক ব্যধিকে অস্বীকার করা হতো, তাহলে রাসুল(ﷺ) কেন এমন আদেশ দিয়েছিলেন?
.
৫। আলোচ্য ঘটনা থেকে আরো বোঝা গেলো সংক্রামক রোগ থেকে সাবধানতা অবলম্বন করা এবং আক্রান্তদের থেকে দূরে থাকা মোটেও তাকদির অস্বীকার করা নয়, শির্ক নয়, তাকওয়ার খেলাফ নয়। উমার(রা.) শামে যাবার পথের সেই ঘটনায় তাকদিরের ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করেছেন। রাসুল(ﷺ) এর সাহাবীগণ শির্কে লিপ্ত হননি বা তাকওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁদের কমতি ছিলো না। বরং তাঁরা রাসুল(ﷺ) এর হাদিস থেকেই এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।
.
৬। আমরা উপরে দেখলাম যে, শাম অঞ্চলের মধ্যে সাহাবীরা ঐ এলাকায় একসাথে না থেকে পাহাড়ী এলাকায় ফাঁকা ফাঁকা হয়ে ছড়িয়ে গিয়েছিলেন। যাতে সংক্রামক রোগটি তাঁদের মধ্যে সহজে ছড়িয়ে যেতে না পারে। আমর ইবনুল আস(রা.) এর বক্তব্যটি পুনরায় লক্ষ করিঃ “এই রোগের যখন প্রাদুর্ভাব হয় তখন আগুনের ন্যায় লেলিহান শিখা ছড়িয়ে জ্বলতে থাকে। সুতরাং তখন তোমরা পাহাড়ে গিয়ে তা থেকে আত্মরক্ষা করো।” শামের সাহাবীরা এর উপরেই আমল করেছেন। আধুনিক যুগেও ছোঁয়াচে রোগের সংক্রমণ হ্রাস করার জন্য এরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় যাকে বলে Social distancing।

গুরুত্বপূর্ণ আরও দুটি লেখা-

মহামারীতে সতর্কতা অবলম্বন কি তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী ? মহামারী নিয়ন্ত্রণ : ধর্মীয় মহলে বিতর্ক

ইসলামে ছোঁয়াচে রোগের অস্তিত্ব আছে কি ? ইসলাম কি ছোঁয়াচে রোগের অস্তিত্ব অস্বীকার করে?

তথ্যসূত্রঃ

১। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া

২। http://www.fateh24.com

৩। ছোঁয়াচে রোগ নিয়ে দ্বিমুখী বিতর্ক: মুশফিকুর রহমান মিনার

৪। The Crisis of COVID-19 & Lessons from Past Epidemics | Shaykh Dr. Yasir Qadhi

৫। The Plague that Killed Sahaba and the Coronavirus | Omar Suleiman

৬। আরিফুল ইসলাম ভাইয়ের নোট