আর-রহমান এবং আর-রহিম আল্লাহর নামে

আন-নববীর জন্ম

হাদিসশাস্ত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র ইমাম আন-নববীর পুরো নাম মুহিউদ্দীন আবু জাকারিয়া ইয়াহিয়া ইবন সারাফ আল-হিজামি আন-নববী। ৬৩১ হিজরীতে (১২৩৩ খ্রিস্টাব্দ) সিরিয়ার দক্ষিণ দামেস্কের আন-নাওয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ‘আলিম না হলেও সৎ ও আল্লাহভীরু ব্যক্তি হিসেবে বেশ সুপরিচিত ছিলেন। তিনি প্রথমে তাঁর ছেলেকে দামেস্কের সামারিয়া মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দেন। এখান থেকেই শুরু হয় বালক ইয়াহিয়ার ইলমের পথে অনন্য সফর।

ইলমের পথে সফর

ইমাম আন-নববীকে তাঁর পিতা সামারিয়া মাদরাসায় ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু সেখানে থাকার জন্য তাঁর নির্দিষ্ট কোনো ঘর ছিল না এবং সেখানে কোন আবাসিক ব্যবস্থাও ছিল না। তাই কিছুদিন পর মাদরাসার শিক্ষকের পরামর্শে তিনি রাওয়াহিয়াহ মাদরাসায় ভর্তি হলেন। সেখানে একটা ছোট্ট ঘরে থেকে একটানা কয়েক বছর পড়াশুনা করলেন।  পড়া শেষে তিনি আশরাফিয়াহ মাদরাসায় প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে চলে গেলেন। বর্ণিত আছে, ঘরটি এত ছোট আর তাতে বই এত বেশি ছিল যে, কেউ তার সাথে সাক্ষাত করতে এলে বসার জন্য কিছু বই সরিয়ে অন্য বইয়ের ওপর রেখে অতিথিকে বসার জায়গা করে নিতে হতো।

রাওয়াহিয়াহ মাদরাসায় তিনি আরবী ভাষা, হাদিস, ফিকহ, ইসলামিক শারিয়াহ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রতিদিন বারটি দার্‌সে অংশ নিতেন। তাঁর বিখ্যাত কিছু শিক্ষক ছিলেন ইসহাক ইব্‌ন আহমাদ আল-মাগরাবী আল-মাক্বদিসী (মৃ ৬৫০ হিজরি), আব্দুর রহমান আল-আনবারি (মৃ ৬৬১ হিজরি) এবং আব্দুল আজীজ আল-আনসারী (মৃ ৬৬২ হিজরি)। তিনি আবু ইসহাক ইবরাহীম আল-ওয়াসিত্বীর নিকট সহীহ মুসলিম শিক্ষা করেন। এরপর ৬৬৫ হিজরিতে মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি আশরাফিয়াহ মাদরাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। ধীরে ধীরে ‘আলিম হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি ও মাহাত্ম্য দামেস্কের দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি জীবনভর তাঁর এই জ্ঞানস্পৃহা ধরে রেখেছিলেন। তাঁর প্রতিটি মুহূর্ত পড়াশুনা, শেখা এবং শেখানোর কাজে কাটত। এমনকি বর্ণিত আছে, ঘুম যতক্ষণ না তাঁকে কাবু করে ফেলত ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি ঘুমাতেন না। তিনি তাঁর বইয়ের ওপর ভর দিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেন, তারপর চোখ কচলে আবার পড়া শুরু করে দিতেন। তিনি একবার নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, “আমি টানা দুই বছর মাটিতে (ঘুমানোর জন্য) পিঠ ঠেকাইনি বা কাত হয়ে শুইনি।” অর্থাৎ, তিনি পড়তে ও লিখতে থাকতেন যতক্ষণ না তাঁর বসা অবস্থাতেই ঘুম আচ্ছন্ন করে ফেলত। আল-কুতুব আল-ইয়াউনিনী তাঁর সম্পর্কে বলতেন, “জ্ঞানার্জন ছাড়া দিবা নিশির এক মুহূর্তও তাঁর পার হতো না। এমনকি যখন তিনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেন তখনও তাঁর মুখস্থকৃত পড়া আর নোট ঝালাইয়ে ব্যস্ত থাকতেন। এভাবে টানা ছয় বছর ধরে তিনি জ্ঞানার্জন চালিয়ে গিয়েছিলেন।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেন স্বয়ং আল্লাহ তাঁর সময়ে বারাকাহ ঢেলে দিয়েছিলেন। আল্লাহর প্রতি একান্ত আনুগত্যই হয়ত এর পেছনের মূল কারণ। যেমনটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে, তিনি প্রতিদিন বারটি দার্‌সে অংশ নিতেন। এ বিষয়ে দীকর বলেন,

“তিনি প্রতিদিন তাঁর উস্তাদদের বারটি দার্‌সে অংশ নিতেন। এসব দার্‌সে বিভিন্ন ব্যাখ্যার কাজ, লেখা যাচাই-বাছাই, মন্তব্যকরণ, বিভিন্ন দুরূহ বিষয়ে আলোচনা এবং সঠিক শব্দ নির্বাচনের কাজ চলত। এসব দার্‌সে প্রতিদিন অন্তত বার ঘন্টা তাঁর ব্যয় হতো। এরপর তিনি সারা দিনের অন্যান্য পড়ায় চোখ বুলাতেন ও প্রয়োজনমাফিক মুখস্থ করতেন। আর একাজে তাঁর কম করে হলেও দিনে আরও বার ঘন্টা লাগত। হিসেবে দেখা যাচ্ছে, এতেই তাঁর দিনের চব্বিশ ঘন্টা পুরো হয়ে গেল। তাহলে তিনি ঘুমাতেন কখন? খেতেন কখন? আর কখনই বা তিনি ইবাদাত-বন্দেগী করতেন, কিয়াম আল লাইল আদায় করতেন? কেননা, এ তো সুবিদিত যে, এই ইবাদাতগুলোও তিনি করতেন। তাহলে এতকিছু করার সময় তিনি পেতেন কোথায়? দিন-রাতের চব্বিশ ঘন্টাই তো তাঁর পড়াশুনায় কেটে যেত। এ থেকেই বোঝা যায়, আল্লাহ তাঁর ওপর কত বেশি রাহমাহ ও বারাকাহ দিয়েছিলেন। আল্লাহ তাঁকে এমন ক্ষমতা দিয়েছিলেন যে অন্যদের যা করতে দুইদিন লাগত তা তিনি একদিনে করে ফেলতেন। চরম পরিশ্রমের দ্বারা দশ বছরের ব্যবধানে একজন বিখ্যাত ‘আলিম হয়ে ওঠার রহস্য একমাত্র এভাবেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব। বরং, তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের ‘আলিমদের ইমাম। মাত্র পনের বছরে এত চমৎকার, বর্ণনামূলক এবং অসাধারণ লেখাগুলো রচনা করার পেছনে আর কী ব্যাখ্যা থাকতে পারে? তিনি তাঁর জীবনের সব মুহূর্তকে ব্যয় করেছিলেন জ্ঞানার্জন, শিক্ষকতা আর গ্রন্থ রচনার পেছনে।”

তাঁর দুনিয়াবিমুখতা

তিনি অতি সাধারণ ও সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। কিছু বর্ণনায় পাওয়া যায়, তাঁর পোশাক বলতে ছিল কেবল একটি পাগড়ি আর একটি জোব্বা। তিনি দুনিয়ার মাঝে কখনোই সুখ খোঁজেন নি। এমনকি এমন সময়ও তিনি কাটিয়েছেন যে, নাওয়াহ থেকে তাঁর পিতা সামান্য পিঠা আর জলপাই পাঠাতেন এবং সেগুলো ছাড়া আর কিছু তিনি মুখে দিতেন না। এর অন্যতম কারণ ছিল, তিনি জানতেন এ খাবারগুলো হালাল উৎস থেকে আগত।

এমনকি তিনি বৈধ ব্যাপারগুলোকেও এড়িয়ে চলতেন এই ভয়ে যে, সেসব হয়ত তাকে সন্দেহজনক বিষয়ের দিকে ঠেলে দিবে। তিনি দামেস্কের কোনো ফলই খেতেন না। কেননা, এসব ফলের অধিকাংশ বাগানই হয় ছিল ওয়াক্‌ফকৃত অথবা এতিম বা অন্য লোকের সম্পত্তি যা যথাযথ পন্থায় নিয়ন্ত্রণ করা হত না। তাঁর ভয় ছিল, হয়ত তাঁর খাবারটি হারাম উৎস থেকে এসে যেতে পারে। আরেকটি কারণ হলো, এসব বাগানের ফল অংশীদারী ফলনের মাধ্যমে উৎপাদন করা হতো এবং এই অংশীদারী ফলন হালাল হওয়ার ব্যাপারে আলিমগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হাদ্দাদ তাঁর এক পাদটীকায় এই সিদ্ধান্ত আসেন যে, আন-নববী হারামের ব্যাপারে জড়াতে এতটাই ভীত ছিলেন যে, সূক্ষ্মতম সন্দেহযুক্ত ব্যাপারেও তিনি অত্যধিক সতর্কতা অবলম্বন করতেন।

ইমাম আন-নববী অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন; যদিও তিনি চাইলেই তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা আর প্রভাবের বদৌলতে জাঁকজমক জীবনযাপন করতে পারতেন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুলাইমান আল-যারা’ই বর্ণনা করেন, এক ঈদে তিনি ইমাম আন-নববীর সাথে দেখা করতে যান। তিনি আন-নববীকে এক ধরণের স্যুপ খেতে দেখলেন যাতে কোনো মাংস ছিল না। ইমাম আন-নববী সুলাইমানকে সেই স্যুপ খেতে আহবান করলেন, কিন্তু সুলাইমান জানালেন, খাবারটি তার পছন্দনীয় নয়। সুলাইমানের ভাই এ সময় বেরিয়ে গিয়ে কিছু রান্না করা মাংস আর মিষ্টান্ন নিয়ে এলেন। সুলাইমান আন-নববীকে সেসব দিতে চাইলেন, কিন্তু আন-নববী তা নিতে অস্বীকার করলেন। সুলাইমান জিজ্ঞেস করলেন, “এসব খাওয়া কি হারাম?” তিনি উত্তর দিলেন, “না। কিন্তু এগুলো স্বৈরাচারীদের (বিলাসবহুল) খাবার।” এভাবে তিনি নাবি  (স) এর দৃষ্টান্ত অনুসরণের চেষ্টা করে গিয়েছেন; যেই মহান নাবি চাইলেই দুনিয়ার সুখ ভোগ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। ফলে দিনের পর দিনের তাঁর বাড়িতে মাংস রান্না হতো না কিংবা পরপর টানা দুদিন কখনোই তাঁদের রুটি জুটতো না। এখানে দেখা যাচ্ছে, সাধারণভাবে আন-নববী এধরণের খাবারকে হারাম বলেন নি, কেননা, নাবি (স) এরকম খাবার খেয়েছেন। বরং, তিনি খাবারগুলোর উৎসের ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন, তাই খাবারগুলো খেতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।

তাঁর সচ্চরিত্রের জন্যও তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিখ্যাত। তিনি এতটাই বিনয়ী ছিলেন যে, কখনওই তাঁর ছাত্রদের সেবা গ্রহণ করতেন না। বরং বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত তিনি নিজেই তাঁর ছাত্রদের সাহায্য করার চেষ্টা করে গিয়েছেন।

ইমাম আন-নববী নিষিদ্ধ দিনগুলো ব্যতীত প্রতিদিন সাওম পালন করতেন। সচরাচর তিনি সারা দিনে মাত্র একবার খেতেন, তা ছিল ইশার সালাতের পর এবং ভোরের আগে সারা দিনে মাত্র একবার পানি পান করতেন। তন্দ্রাচ্ছন্নতার ভয়ে তিনি ঠান্ডা পানি পান করতেন না। হাদ্দাদ এর ব্যাখ্যায় বলেন, আন-নববী মূলত এমনটা করতেন যেন তাঁর সবটুকু সময় তাঁর কাজ ও আল্লাহর ইবাদাতে ব্যয় করতে পারেন, যেন এই দুনিয়ার সুখ তাঁকে আচ্ছন্ন না করে ফেলে। হাদ্দাদ আরও লিখেন, জ্ঞান কখনও আরামের দ্বারা হাসিল হয় না। এমনকি তিনি বলেন যে, কেউ জ্ঞানের ক্ষুদ্র অংশও অর্জন করতে পারবে না যদি না তাঁর সবটূকু জ্ঞানের পেছনে ব্যয় না করে। একজন ব্যক্তি যদি তাঁর সবটুকু জ্ঞানের পথে নিবেদন করে, আশা করা যায় জ্ঞানের কিছু অংশ সে লাভ করতে পারবে। হাদ্দাদের মতে, আন-নববী জ্ঞানের ব্যাপারে এমন দৃষ্টিভঙ্গিই ধারণ করতেন। তিনি তাঁর হৃদয়কে পরিপূর্ণরূপে কেবলমাত্র দ্বীন ইসলামের জ্ঞানার্জনের জন্য অবারিত করে দিয়েছিলেন।

তিনি পাঠদানের বিনিময়ে কোনো সম্মানী গ্রহণ করতেন না। তাঁর জীবনীতে দেখা যায়, প্রথম দুই-এক বছর তিনি সম্মানী গ্রহণ করেছিলেন যা দিয়ে তিনি বই কিনেছিলেন এবং সেসব বই তাঁর মৃত্যুর পর দান করে গিয়েছিলেন। ওই দুই-এক বছর পর তিনি আর কোনো অর্থ মাদরাসা থেকে গ্রহণ করেননি।

এই দুনিয়ার যে একমাত্র সম্পদ আন-নববীর কাছে ছিল তা হলো তাঁর বইগুলো। হাদ্দাদের মতে, তিনি পানাহারের মতোই বইয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। যেমনটি আগে বলা হয়েছে, আন-নববীর ঘর ছিল বইয়ের একটা ছোটখাট গুদাম। তাঁর বইয়ের সংখ্যার ব্যাপারে তাঁর আল-তাহকীকের সূচনায় ধারণা পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, “সকল প্রশংসা আল্লাহর যে, আমার কাছে শাফি’ঈ ফিকহের ওপর সুপরিচিত, দুর্লভ এবং অন্যান্য প্রায় একশটি বই রয়েছে।” হাদ্দাদ বলেন, “কেবল ফিকহের বইয়ের সংখ্যাই যদি এতো হয়; যেখানে তাঁর পরবর্তী সময়েও এত বই পাওয়া যেত না, তাহলে হাদিসের অত্যাবশ্যকীয় কতগুলো বই তাঁর সংগ্রহে ছিল! কেননা, সে সময়ে হাদিসের প্রচুর বই সহজলভ্য ছিল।” তাজ উদ্দীন সুবকী (৬৮৩-৭৫৬)- যিনি প্রধান বিচারপতি ছিলেন- তাকে একদা অনুরোধ করা হলো ইমাম আন-নববীর আল-মাজমূ বইটি সম্পূর্ণ করার জন্য। তিনি অব্যাহতি চাইতে গিয়ে বলেছিলেন, ইমাম নববীর কাছে রেফারেন্সের জন্য যতগুলো বই ছিল তাঁর কাছে তত বই নেই।

এটা পরিষ্কার যে, বিশাল পাঠাগার বানানো ইমাম নববীর লক্ষ্য ছিল না। তাঁর বইয়ের ভাণ্ডার না ছিল সজ্জার জন্য, আর না ছিল প্রদর্শনীর জন্য। বরং সেসব বই থেকে তিনি নিজে অনেক উপকৃত হয়েছেন এবং তাঁর বক্তৃতা ও লেখনীর মাধ্যমে সেই জ্ঞান তিনি জনসাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন।

আন-নববীর অবিবাহিত জীবন

ইমাম নববী ইতিহাসের সেসব বিখ্যাত ‘আলিমদের একজন যারা কখনও বিয়ে করেন নি। অন্যান্য যেসব ‘আলিম জীবনে বিয়ে করেন নি তাদের মধ্যে ইব্‌ন তাইমিয়্যাহ এবং সায়্যিদ কুতুবও রয়েছেন। নববীর অবিবাহিত থাকার পেছনে বিভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এদের মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট কারণটি হলো, তাঁর দুনিয়াবিমুখতা এবং এ দুনিয়ার সুখের প্রতি অনাসক্তি। তাঁর জীবন ছিল জ্ঞানার্জন, শিক্ষাদান আর ইবাদাতে ভরপুর। এ দুনিয়ার আসক্তি তাই তাঁর হৃদয়ে নাড়া দিতে পারে নি।

অনেকে বলেন, বিয়ে করার মতো সামর্থ্য তাঁর ছিল না। এটা সুস্পষ্ট যে, তাঁর কাছে কখনওই বিয়ে করার মতো সম্পদ ছিল না। তবে এটা তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছাই বলা চলে। কেননা, তিনি চাইলেই সম্পদ অর্জন করতে পারতেন, যেমন, শিক্ষাদানের অর্থ গ্রহণ করতে পারতেন।

অন্যদিকে দীকর আরেকটি অভিমত ব্যক্ত করেন। তাঁর মতে, ইমাম নববীর তাকওয়া ও আল্লাহ ভীতি তাঁর এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ। খুব সম্ভবত তিনি ভয় করতেন যে, তাঁর স্ত্রীর অধিকার রক্ষা করতে পারবেন না, যা ফলত আল্লাহর অসন্তুষ্টিকে ডেকে আনবে। আল্লাহ বলেন যে, নারীদের অধিকার রয়েছে তাদের কর্তৃত্বশীলদের ওপর। একটি পরিবার হলো একটি ক্ষুদ্র সমাজব্যবস্থা যেখানে স্বামী সেই সমাজের প্রধান। তাই তার কাঁধে তখন অত্যন্ত গুরুদায়িত্ব থাকে। আসমার হাদিস যেখানে আসমা তাঁর স্বামীকে বিভিন্ন সাহায্য করার কথা বর্ণনা করেন, নববী তার ব্যাখ্যায় লিখেছেন,

“এসব পালন করার মাঝে মানুষের মঙ্গল ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। নারীগণ তাদের স্বামীদের, যেমনটি তিনি বলেন, খাদ্য প্রস্তুত, রান্না-বান্না, কাপড় ধোওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে সাহায্য করেন । এর সবই তার স্বামীর প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে একজন নারীর ঐচ্ছিক কাজ। এ সৎকর্মগুলোর কোনোটিই তার ওপর আবশ্যকীয় নয়। যদি সে এর কোনো একটি কিংবা সবগুলো করতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তার কোনো পাপ হবে না। বরং, স্বামীর দায়িত্ব হলো স্ত্রীর একাজগুলো করে দেওয়া এবং এগুলো করতে স্ত্রীকে বাধ্য করায় স্বামীকে অনুমতি দেওয়া হয় নি। এগুলো মহিলাদের অতিরিক্ত কাজ যা তাদের ইচ্ছাধীন। এই চমৎকার প্রথাটি প্রথম প্রজন্ম থেকে এখন পর্যন্ত পালিত হয়ে আসছে। কেবলমাত্র দু’টি বিষয় নারীদের জন্য আবশ্যকীয়ঃ তার স্বামীর জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখা এবং গৃহে অবস্থান করা।

যদি এটাই নববীর বিয়ে না করার কারণ হয়ে থাকে (হতে পারে যে, এটা তাঁর নিজের জন্য অতিরিক্ত ছিল) তবে তাঁর এই সচেতনতা থেকে প্রত্যেক স্বামীরই শিক্ষা নেওয়া উচিত যে, বিয়ে কোনো ছেলেখেলা নয়, বরং এটা এমন এক সম্পর্ক যার ব্যাপারে শেষ বিচারের দিনে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে।

ইমাম আন-নববীকে একবার বলা হয়েছিল, বিয়ে তো একটি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সুন্নাহ এবং তিনি খুব সম্ভবত এই একটি সুন্নাহই তাঁর জীবনে পালন করেন নি। তিনি একথা শুনে উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি ভয় করি যে, একটি সুন্নাহ পালন করতে গিয়ে আমি আরো দশটি হারাম কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলব।”

আন-নববীর চিরবিদায়

হয়ত তিনি চাইলেই পারতেন সৎ জীবিকা অর্জন করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে জীবনযাপন করতে। কিন্তু তাতে ইলমের যে বড় খেদমত তিনি আঞ্জাম দিয়ে গেছেন, তা থেকে মুসলিম উম্মাহ বঞ্চিত হতো। এটাই আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলার ইচ্ছা ছিল। এভাবে ইলমের প্রচার ও প্রসারে সম্পূর্ণ জীবন কাটিয়ে এই মহান মনিষী ৬৭৬ হিজরীর (১২৭৭ খ্রিস্টাব্দ) ২৪ রজব তাঁর জন্মস্থান আন-নাওয়া গ্রামে মৃত্যুবরণ করেন।