জাপানীজ সাইকায়াট্রিস্ট কোবায়াশি সুকাসা ১৯৯০ সালে একটা আর্টিকেলে একটি ভেন ডায়াগ্রামিক মডেল নিয়ে আলোচনা করেন। এই মডেলটির নাম ইকিগাই(Ikigai)। ইকিগাই শব্দটির অর্থ reason for being অর্থাৎ ‘বেচে থাকার উদ্দেশ্য’। তার মতে, প্রত্যেকটি মানুষের একটি ইকিগাই আছে। এটি সেই কারণ যার কারণে মানুষ জীবনটাকে উপভোগ করে কিংবা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠে।

এই মডেলটি বেশ সুন্দর। এখানে চারটি সার্কেল থাকে, যার প্রথম সার্কেলটি নির্দেশ করে ‘আপনি কী করতে পছন্দ করেন’। এরপরের সার্কেলটি নির্দেশ করে ‘আপনি কোন কাজটি ভালো পারেন’। পরেরটি ‘কোন কাজটি করে আপনি উপার্জন করতে পারেন’। শেষেরটি হচ্ছে ‘পৃথিবী আপনার কাছে কী চায়’। এই মডেলটি পূরণ করার জন্য প্রথমে আপনি এই চারটি সার্কেলের প্রতিটির মধ্যে আপনার নিজের উত্তরগুলো লিখুন। প্রতিটি সার্কেলেই অন্তত কয়েকটি উত্তর আপনি পাবেন। এখন সবগুলো সার্কেলে যে পয়েন্টটি কমন পড়ে যায়, সেটিই আপনার কাঙ্ক্ষিত ‘ইকিগাই’। সেই কাজটিকেই আপনি আপনার ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিতে পারেন।

একটু এক্স্যাম্পল দিই। একজন মানুষ হয়তো অনেকগুলো কাজ পছন্দ করে: আর্ট করতে, বই লিখতে, মানুষের সাথে আড্ডা দিতে, ব্যবসা করতে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে সে খুব ভালো পারে কিংবা দক্ষতা আছে যেটিতে তা হলো, বই লেখা। এবার আসি পরেরটায়, সে কি এটা থেকে টাকা উপার্জন করতে পারে? হ্যা, পারে। যদি সে একটি পাবলিকেশানে কাজ করে কিংবা বই প্রকাশ করা শুরু করে। এবার লাস্ট পয়েন্ট মিলিয়ে নিই, পৃথিবী তার কাছে কী চায়? হ্যা, সে যদি একটা বই লিখে ‘একশ হাসির উপায়’, তাহলে এরকম বই আসলে পৃথিবীর তেমন কোন উপকারে আসেনা। কিংবা ‘শত্রু নিধনের মন্ত্র’ এই ধরণের বই উল্টো পৃথিবীর ক্ষতিসাধন করে।বরং সে যদি উপকারী ও প্রোডাক্টিভ কোন বই লিখে, তাহলে তাতে পৃথিবীর উপকার আছে। সুতরাং ‘ভালো বিষয়ে বই লিখে প্রকাশ করা’ এই কাজটিই হতে পারে তার ইকিগাই: এটা করতে সে ভালোও বাসে, কাজটি করায় তার দক্ষতাও আছে, সে এর মাধ্যমে পরিবারের জন্য উপার্জন করছে এবং পৃথিবীরও কিছু উপকার হচ্ছে। সুন্দর না?

যাহোক, কদিন আগে এই মডেলটি সম্পর্কে জানার পর আমার মাথায় এটার একটা ইসলামিক ভার্শন ঘুরছিলো(প্লিজ, ডোন্ট আস্ক মী: সবকিছুর মধ্যে ইসলাম টেনে আনেন ক্যান? এই মনে করেন, আমার ভাল্লাগে, তাই )। তো সেটা কেমন?

islamic iki

চিত্র ২ দেখুন। এখানে ৪ নং সার্কেলটিকে একদম প্রথমে নিয়ে আসা হয়েছে আর এটার নামটা একটু বদলে গেছে, পৃথিবী আমার কাছে কী চায় এর পরিবর্তে ‘আল্লাহ আমার কাছ থেকে কী চান’। আমাদের মুসলমানদের জীবনের উদ্দেশ্য পৃথিবীকে সন্তুষ্ট করা নয়, কেবল এবং কেবলমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা। আর আল্লাহ তো বলেই দিয়েছেন আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য:
وما خلقت الجن والإنس إلا ليعبدون.
“আমি জ্বিন ও মানবজাতিকে কেবল আমার ইবাদাতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” [যারিয়াত: ৫৬]

সুতরাং একজন মুসলিমের জীবনের প্রথম ও প্রধান ‘Reason for being’ হচ্ছে আল্লাহর ইবাদাত তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। এজন্য জীবনের উদ্দেশ্য কিংবা ক্যারিয়ার বাছাই করার সময় এই পয়েন্টটিকেই আমাদেরকে প্রথমে ফোকাস করতে হবে। এই সার্কেলে যেটা বাদ যায়, সেটা একেবারেই বাদ, আমার জীবনে সেটিকে স্থান দেয়ার কোন সুযোগ নেই। যেমন: মনে করুন, আমি ফিন্যান্স/একাউন্টিংয়ে পড়েছি, বিষয়টাতে আমার আগ্রহ, দক্ষতা সবই আছে, আমি একটা কনভেনশনাল ব্যাংকে জব করলে হয়তো পৃথিবীর কিছু মানুষ আমার মাধ্যমে উপকৃতও হবে। কিন্তু সমস্যা পয়েন্ট ১ এ। কনভেনশনাল ব্যাংক/সুদি ব্যাংকে এমনকি দারোয়ানের চাকুরি করাও হারাম। সুতরাং এটা কোনভাবেই আমার ক্যারিয়ার হতে পারেনা। আবার মনে করুন, কেউ হয়তো ছবি আকতে খুব পছন্দ করে, আকাআকির হাতও আছে এজন্যেই সে চারুকলা বিভাগে ভর্তি হতে পারেনা, কারণ ওখানে তাকে হারামে ইনভলভড হতে হবে। কারোর গান গাওয়া পছন্দ হলেই সে মিউজিক ইনিস্টিউটে কাজ করতে পারেনা কারণ মিউজিক ইসলামে হারাম। এই হারাম মিউজিককে ইসলামিক গানের মধ্যে ঢুকিয়ে কেউ যদি মিউজিককে ইসলামাইজ করতে চায়, সেটিও চলবেনা, কারণ মিউজিক জিনিসটা বাই ডিফল্ট হারাম, যেমন মাদকের ইসলামিক ভার্শন বানানো সম্ভব না তেমন। আল্লাহর কাছে কোন কাজের অনুমোদনের শর্ত দুটি: নিয়ত ঠিক থাকতে হবে, কাজের উপায়টা সুন্নাহ অনুমোদিত হতে হবে, এই দুটির কোন একটির ব্যত্যয় হলেই সেই কাজটি দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব না, আর সেই কাজটি আমাদের সার্কেলেও ঢুকবেনা। এই হলো আমার সার্কেল ১ এর ব্যাখ্যা।

এভাবে বাকি ৩ টি সার্কেলও যদি মিলে যায় আমার এমন কোন পছন্দের কাজের সাথে যার মাধ্যমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আল্লাহর ইবাদাত হয় অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব, তাহলে সেটিই হতে পারে আমার কাঙ্ক্ষিত ‘ইকিগাই’। এমনকি ১ নং সার্কেলের কারণে যদি বাকি ৩টি সার্কেলের কোনটি ত্যাগও করতে হয়, তারপরও সেটিই আমার ‘ইকিগাই’ হিসেবে বেছে নিতে হবে, কারণ আমাদের মডেলে ১ নংটাই মুখ্য।

আর হ্যা, ইসলাম আমাদের মেয়েদের জন্য সহজতা দিয়েছে, পরিবারের ভরণপোষণ কিংবা উপার্জনের দায়িত্ব আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়নি, এই দায়িত্বটি সম্পূর্ণই পুরুষের, আমরা উপার্জন করতে চাইলে সেটি আমাদের ঐচ্ছিক, আবশ্যিক নয়। সেক্ষেত্রে মুসলিম মেয়েদের জন্য ইকিগাই বের করা আরেকটু সহজ, আপনি চাইলে ‘কোন কাজটি থেকে আপনি উপার্জন করতে পারেন’ এই পয়েন্টটা পুরো বাদ দিয়ে বাকি ৩ টি মিলিয়েই জীবনের একটা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঠিক করে ফেলতে পারেন। তবে বৈধ পন্থায় কোন নারী যদি পর্দা রক্ষা করে অন্য দায়িত্বগুলো আঞ্জাম দিয়েও কিছুটা উপার্জন করতে চায়, তাতে বাধা নেই, ইনশাআল্লাহ।

ইকিগাই মডেল দিয়ে হোক, কিংবা অন্য কোন উপায়েই হোক, জীবনের একটা লক্ষ্য ফিক্স করা, তা পূরণে কাজ করে যাওয়া কিন্তু খুব জরুরী। ‘আইলাম আর গেলাম’ এই মূলনীতি মুমিন জীবনের জন্য নয়, মানুষকে আল্লাহ দুনিয়াতে পাঠিয়েছেনই খলীফা হিসেবে। প্রত্যেকটি মানুষকেই আল্লাহ কোন না কোন স্পেশ্যাল কোয়ালিটি দিয়ে পাঠিয়েছেন, যে হয়তো একটা কাজে ভালোনা, সে আরেকটা কাজে অবশ্যই ভালো। যাকে যে কোয়ালিটি/নিয়ামত দেয়া হয়েছে, সেই নিয়ামাত কাজে লাগিয়ে সে কী করেছে, নিয়ামতের কতটুকু সদ্ব্যবহার সে করেছে, মৃত্যুর পর তার জবাবদিহিতা তাকে করতে হবে।
ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ.
“অতঃপর সেদিন তোমরা অবশ্যই নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” [তাকাসুর: ৮]

খুব ছোট্ট একটি লক্ষ্য হোক, তা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়, তবে তা-ই হোক আমাদের বেচে থাকার কিংবা পথচলার প্রেরণা…..

চিত্র ১: Ikigai মডেল
চিত্র ২: ইসলামিক Ikigai মডেল