রাসূলুল্লাহ সা: এর খুব পরিচিত একটি হাদীস নতুন করে ভাবালো আজ:
‘হাফিজের মাথায় হাশরের মাঠে উজ্জ্বল মুকুট পরানো হবে।” [সুনান আবূ দাউদ]

ভাবছিলাম ‘স্ট্যান্ডার্ড মেইন্টেইন’ নিয়ে। প্রচলিত সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের মাথায় স্ট্যান্ডার্ডের এমন একটা ছক তৈরি করে দিয়েছে, সেই ছকের বাইরে কিছু চিন্তে করতে গেলে সাতবার ভাবতে হয়,পাছে লোকে ‘খ্যাত’ ভাবে। আর আমরাও পড়ি মরি করে ছুটি সেই এন্টি-খ্যাত হওয়ার বাসনায়। ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই- বাচ্চার নাম রাখার বিষয়টাই ধরুন। নাম রাখার ষ্ট্যাণ্ডার্ড মেইন্টেইন করতে গেলে একদম আনকমন একটা নাম হতে হবে; যার উচ্চারণ সুন্দর, অর্থও অসাধারণ, আমার পূর্বে আর কেউ রাখেনি এমন, এককথায় গুণে-মানে অনন্য। স্ট্যান্ডার্ড পরিমাপের এই পাল্লায় সবার আগে যে নামগুলো বাদ পড়ে যাবে, সেগুলোই হল ইসলামিক্যালি নাম রাখার ক্ষেত্রে সিরিয়ালের প্রথম সারিতে(যেমন: আব্দুল্লাহ, আব্দুর রহমান, নবী-রাসূলদের নাম, সাহাবাদের নাম)। কারণ? ওগুলো খুব খুব কমন, গ্রামের অশিক্ষিত সমাজে ঐ নামগুলো বেশি পাওয়া যায়, শুনতেও অত কিউট না। আবার সাহাবীদের নামও যদি খুঁজি, তাহলেও আনকমন & কিউটমোস্ট একটা নাম লাগবে, মানে পরিচিত সাহাবাদের নামগুলোও রুচিতে ধরেনা। আবার এরকম কিছু নাম যেমন: মোকলেস (অথচ ‘মুখলিস’ নামটির অর্থ ইখলাসওয়ালা) টাইপের নাম তো ভাবাই যায়না।


এই যে স্ট্যান্ডার্ড লেভেলের একটা ছক, এটা আমরা নিজেরাই তৈরি করেছি, আবার নিজেরাই তার মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছি, বেরুনোর জায়গা কম, আমি নিজেও কমবুদ্ধির বয়সে এই ছকবদ্ধ জীব ছিলাম। কৈশোরে মামা-খালা-চাচাদের বাচ্চাকাচ্চা হলেই আমাকে ফোন দিতো নামের জন্য, আর আমিও আব্বুর ‘আল-কাউসার’ ডিকশনারিখানা ঘেটে মহা আনকমন আরবি নাম বের করে করে সাপ্লাই দিতাম। যাহোক, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এই ছক থেকে বের হওয়ার সুযোগ হয়েছে যখন, তখন থেকেই প্ল্যান ছিলো: আমাদের নিজেদের বাচ্চাদের নাম রাখবো সুন্নাহর স্ট্যান্ডার্ডে, সমাজের স্ট্যান্ডার্ডে নয়, ইনশাআল্লাহ। তাতে করে মোস্ট কমন নামই ভাগে পড়বে, আলহামদুলিল্লাহ। আনকমনের খ্যাতা পুড়ি, সৌন্দর্য শব্দচয়নে না, সৌন্দর্য আমাদের চিন্তায়, সৌন্দর্য আল্লাহর সন্তুষ্টিতে….

ভাইয়ার মেয়েটার নাম রাখার দায়িত্ব পেয়েছিলাম, আমার সবচে প্রিয় মানবীর নামে নাম রেখেছি ‘আইশা সিদ্দীকা, এরচে কমন আর নেই। নিজের মেয়ের নাম রাখারও সুযোগ পেলাম। আমার রাসূলের সবচে প্রিয় কলিজার টুকরাটির নাম ছিলো ফাতিমাহ, সেটিই রেখে দিলাম। আমার ফাতিমাহ যেন জান্নাতে ফাতিমাহ রা: এর প্রতিবেশিনী হয়, যাকে ভালোবেসেই নামটা রাখা। আর আমাতুল্লাহ? আল্লাহর কাছে সবচে প্রিয় দুটো নাম: আব্দুল্লাহ আর আব্দুর রহমান, যখন থেকে এটা জেনেছি তখন থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ছেলেবাবুর মা হতে পারলে আব্দুল্লাহ নামটা রাখবো। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ মেয়ে দিয়েছেন, তাই আব্দুল্লাহ’র ফিমেইল ভার্শন আমাতুল্লাহ(আল্লাহর বান্দী) বেছে নিলাম। নামকরণের বৃত্তান্ত এখানেই শেষ।

মেয়েটাকে নিয়ে যেখানেই যাই, সবাই খুব উচ্চাশা নিয়ে জিজ্ঞেস করেন, নাম কী রেখেছি। উত্তরে সুন্দর করে নামটা বলার পর শ্রোতারা কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে যান, এরপর খানিক ভেবে কোনরকমে দায়সারা উত্তর দেন: হ্যা, সুন্দর। (কিন্তু এক্সপ্রেশন এমন, বোঝাই যাচ্ছে বেচারির মনে রোচেনি, হোক আরবি নাম, তাও একটু কিউট না হলে কি মানায়? ঐসব ফাতেমা টাতেমা শুনলেই কেমন গেয়ো গেয়ো শোনায়।) আবূ ফাতিমাহ অফিস থেকে এসে বললো: জানো? যতজনকে আমার মেয়ের নাম বলেছি, কেউ কমেন্ট করেনি, মানে পছন্দ হয়নি। বললাম: এমনটা জেনেই তো রেখেছিলাম, এ আর নতুন কী? 

এতক্ষণ বকবকানির পর আগের কথায় ফিরে আসি। ঐযে হাদীসটা! মেয়েটা পেটে থাকতে খুব দু’আ করতাম: আল্লাহ! আমার মেমোরি পাওয়ার ভালোনা তাই চাইলেও অনেক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হই। আপনি আমার সন্তানদের প্রখর মেমোরির অধিকারী করুন, যে নি’আমত আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের কাজেই তারা লাগাবে। জানিনা, আল্লাহ কতখানি কবুল করবেন। তবু ইচ্ছেটা প্রবলভাবেই আছে: মেয়েটাকে হাফিযা, ‘আলিমা বানাবো, ইনশাআল্লাহ।

আমাদের স্বামী-স্ত্রী দুজনের পরিবারমণ্ডলে স্ট্যাটাসের ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডার্ড লেভেলের ন্যূণতম পরিমাপ হলো: সরকারি প্রতিষ্ঠানের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, এরপর যে যত উঁচুতে উঠতে পারে। বলছিনা, এসব প্রফেশান খারাপ, শীর্ষে উঠতে চাওয়া দোষের, ক্ষেত্রবিশেষে এগুলোও জরুরী। কিন্তু এটাকে স্ট্যান্ডার্ড লেভেল বানিয়ে ফেলাটাই বিপত্তির। আমাদের দেশে মাদ্রাসার ছাত্র ছাত্রীদের সামাজিক মূল্য কতখানি, সে বিষয়ে ঢের ধারণা আমাদের আছে, তাই ঐ পথে হাটতে চাওয়া মানেই আবার এন্টি-স্ট্যান্ডার্ড হয়ে যাওয়া, পরিবারের সবার কাছে ‘খ্যাত’ উপাধি পাওয়া। গতানুগতিক সমাজের বিপরীতে চলতে হলে সমাজ থেকে কোন এনফোর্সমেন্ট পাওয়া যায়না, তাই এনফোর্সমেন্টটা নিজেদেরই তৈরি করে নিতে হয়, যেমনটি নামকরণের ক্ষেত্রে বলেছিলাম: আমার ভালোলাগা আমার কাছে, কারও কাছে ভালো না লাগুক তাতে কী?

ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারের সার্টিফিকেট এ পরিবারে ঢের আছে, এই পরিবারে বরং হাফিজ, ‘আলিমেরই অভাব; সেটাই পূরণ করা জরুরী। আমাদের বন্ধু-বান্ধবী, আত্মীয়-পরিজনেরা হয়তো দুনিয়ায় বড়মুখ করে নিজের ছেলেমেয়ের পরিচয় দিতে পারবে। আমরা হয়তো পারবোনা, নিজে বড়মুখ করে যদি হাফিজ/আলিম পরিচয় দিই-ও, উত্তরে শ্রোতা আবারও অপ্রস্তুত হয়ে বাকা হাসি দেবেন: হ্যা, বেশ ভালোই তো! (কিন্তু ঐ অপ্রস্তুত হাসিই বলে দেবে ভেতরের খবর: নিজেরা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে মেয়েটাকে হুজুরনী বানালে?)

সমাজের বেধে দেয়া ছক থেকে বের হতে গিয়েও মাঝে মাঝে আবার ঢুকে পড়ি: আচ্ছা, আসলেই এমন করলে কি মান-সম্মান টিকবে? ‘মা, মা, মা এবং বাবা’ বইটি পড়ছিলাম, আর ঐ হাদিসটি পড়ে একটা দৃশ্য কল্পনায় ভেসে উঠলো:

হাশরের মাঠে কোটি কোটি উৎসুক জনতা ফলাফল প্রকাশের অপেক্ষায়, ‘ইয়া নাফসী ইয়া নাফসী’ রবে চিন্তার্ত ভয়ার্ত সমস্ত বনী আদম, চারদিকে কেবল অন্ধকার আর অন্ধকার; তার মাঝে আবূ ফাতিমাহ, উম্মু ফাতিমাহ সসম্মানে, সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে, মাথায় উজ্জ্বল তাজ, শুভ্র আলো ঠিকরে পড়ছে চারদিক- ওরা আজ হাফিযা কন্যার গর্বিত জনক-জননী (ইনশাআল্লাহ) …..আমরা নাহয় এই স্বপ্নটুকুই দেখলাম! না না, মিথ্যে নয়, স্বপ্ন নয়, সেদিন মানুষ চাক্ষুস দেখবে, দয়াময় রব্বের দেয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি সেদিন ইয়াক্বীনের চোখেই দেখবে মানুষ!

(আল্লাহ আমাদের কবুল করুন)

[বি: দ্র: আনকমন সুন্দর নাম রাখা শরিয়ত বিরোধী নয়, যেকোন সুন্দর অর্থবোধক নামই রাখা জায়েয, তবে আমি এখানে কেবল আমাদের ফিক্স করে দেয়া স্ট্যান্ডার্ড বিষয়টিই উল্লেখ করতে চেয়েছি: কমন মানেই অসুন্দর নয়। আর হ্যা, আল্লাহর আনুগত্য করে দুনিয়াবি উচ্চশিক্ষিত হওয়াও দোষের কিছু নয়, মানুষের আসল মাপকাঠি তো হচ্ছে ‘তাক্বওয়া’।]