আজ লিখার আগে ভাবছিলাম কী দিয়ে শুরু করব! ভাবছিলাম আর ডায়েরির পাতা উলটাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা লিখায় চোখ পড়ল-

ওর সাথে বাইরে ঘুরতে গেলে সর্বদা হাসিমুখে থাকতে হবে। কিছুতেই বিরক্ত হওয়া যাবে না। বিরক্তি দূর করতে না পারলে যাওয়ার চেয়ে না যাওয়াই ভাল।

লিখাটি পড়ার সময় ঘটনার শানে নুযুল মনে পড়ল। বিয়ের পরপর প্রথমদিকে এই বদভ্যাসটা আমার ছিল। আহলিয়ার সাথে বেড়াতে গিয়ে সামান্য কারণে বিরক্ত হয়ে যেতাম। হয়ত বৃষ্টির দিনে পাশ দিয়ে কোন গাড়ী শাঁ শাঁ করে আমাকে কাদাপানিতে ভিজিয়ে চলে গেল, ব্যস! হয়ে গেলাম চরম বিরক্ত। ঘুরার মুডটাও নষ্ট, সাথে আহলিয়ার কষ্ট! আলহামদুলিল্লাহ, এই বদভ্যাস এখন আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।  

বিষয়টা শুনতে হালকা লাগলেও আসলে কিন্তু স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যই খুব ক্রিটিকাল। অনেক সময় এমন হয় যে, স্বামী-স্ত্রী সপ্তাহান্তে অনেক প্ল্যান করে কোথাও ঘুরতে গেছেন কিন্তু মাঝপথে কোন এক কারণে একজন বিগড়ে গেল। ব্যস! দুজনেরই ঘোরার বারোটা বাজল। হয়ত একসাথে কোথাও খেতে যাওয়া হল কিন্তু খাবার অর্ডার করার পরই তুচ্ছ কোন কারণে বাধল ঝগড়া। এরপর দুজন চুপচাপ খেয়ে ঘরে প্রত্যাবর্তন। বিষয়টা কিন্তু আসলেই খুব পীড়াদায়ক। আমাদের এই কর্মব্যস্ত চাকুরি/ব্যবসায়ী জীবনে জীবনসঙ্গিনীর সাথে ঘোরাঘুরির সময় কতটুকুই বা পাই? এই যৎসামান্য সময়টুকুও যদি আমরা মনোমালিন্যে অপচয় করি তবে আর থাকে কী? যাদের অল্পতেই বিরক্ত হওয়ার/রেগে যাওয়ার অভ্যাস আছে তারা কিন্তু এই বিষয়টা কিছুতেই হাল্কা ভাবে নিবেন না। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্কে মারাত্মকভাবে আঘাত হানতে পারে এই সমস্যাটি। বেটার হাফকে নিয়ে বের হওয়ার আগে তাই সচেতনভাবে মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। তাই আসুন আজ থেকে মনস্থির করি- স্বামী/স্ত্রীর সাথে বাইরে ঘুরতে গেলে সর্বদা হাসিমুখে থাকব, কিছুতেই বিরক্ত হব না। বিরক্তি দূর করতে না পারলে বাইরে গিয়ে ঝগড়া না করে ঘরে থেকেই গল্প করব তবুও অবসরটুকু ঝগড়া করব না।

সাংসারিক জীবনে যখন একঘেয়েমি ভর করে তখন স্বামী-স্ত্রীর মাঝের স্বাভাবিক আহ্লাদ-ভালবাসায় ঘাটতি আসাটা স্বাভাবিক। এমনকি তা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীলতা ও দয়া-মায়ার ঘাটতি পর্যন্তও গড়াতে পারে। এর কিছু লক্ষণ এমন-

  • অফিস থেকে কাজের ফাঁকে স্ত্রীকে ফোন দিলেন কিন্তু স্ত্রী সংসারের/পেশাগত কাজের ব্যস্ততায় আপনার ফোন দেখে খুশী হওয়ার পরিবর্তে বিরক্ত হল।
  • স্ত্রী বাসা/অফিস থেকে কাজের ফাঁকে আপনাকে ফোন দিল আর অফিসের কাজের ব্যস্ততায় আপনি ফোন দেখে বিরক্ত হলেন।
  • আপনি অফিস থেকে এসে স্ত্রীকে পরিপাটি দেখতে চান অথচ সংসারের এত এত কাজ সামলে আপনার জন্য কিছুটা পরিপাটি হতে তার বিরক্ত লাগে।
  • আপনি এত এত বাজার-কেনাকাটা করেন কিন্তু কখনও স্ত্রীর জন্য সামান্য কিছু হাদিয়া নিয়ে আসার কথা ভাবলেও বিরক্তি লাগে।
  • স্বামী/স্ত্রীর একজন আরেকজনের সাথে কিছুক্ষণ একসাথে বসে গল্প করতে চাইলে কোন একপক্ষের মনে হওয়া- ‘এই বয়সে এত ন্যাকামি আসে কইত্তে?’

এই ধরণের সমস্যার একটা খুব সহজ সমাধান ইসলাম আমাদেরকে বাতলে দিয়েছে। আর তা হল- বেশি বেশি সালামের চর্চা করা। অধিক পরিমাণ সালাম বিনিময় শুধু যে ঘরের বাইরের মানুষদের সাথেই সুসম্পর্ক গড়ে তোলে তা না বরং স্বামী-স্ত্রীর মাঝেও পারস্পরিক মমতা-ভালবাসা বাড়িয়ে দেয়। বাসায় ঢুকেই একে অপরকে সালাম দেওয়া, ফোন রিসিভ করে প্রথমেই সালাম দেওয়া, এমনকি এক ঘর থেকে আরেক ঘরে গেলেও সালামের অভ্যাস করা একটি সংসারে মমতাময় পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। এই সালাম বিনিময়ের অভ্যাস শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের উচিৎ সন্তানদেরকেও এই শিক্ষা দেওয়া এবং বাসায় বাবা-মা,দাদা-দাদী, নানা-নানী,ছোট-বড় সকলের মাঝে বেশি বেশি সালামের চর্চা জারি রাখা।

এবার আমার এমনই একটি উপলব্ধির কথা শেয়ার করতে চাই যা আমি ব্যক্তিগত সার্কেলে সবাইকেই বলে থাকি। আর সেটা হল- বাবা-মায়েদের নামে সাদাকাহ করা ও নিয়মিত দূয়া করা। এর আগে কোন এক পর্বে বলেছিলাম স্বামী-স্ত্রী একসাথে নিয়মিত ভিত্তিতে সাদাক্বাহ করলে পরিবারে অপরিসীম বরকত ও আল্লাহর রহমত নেমে আসে। আরেকটু আগ বাড়িয়ে আমরা যদি আমাদের বাবা-মা এবং শ্বশুর-শাশুড়ির পক্ষ থেকে নিয়মিত ভিত্তিতে সাদাক্বাহ করি (বিষয়টা আরও গুরুত্বপূর্ণ যদি তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে থাকেন) তবে তা যেমন তাদের সাওয়াবের খাতায় যুক্ত হবে তেমনি এই কাজের উসীলায় আল্লাহ আমাদেরও সাংসারিক জীবনে বরকত দিবেন। আচ্ছা, কোন স্ত্রী যদি দেখে তার স্বামী তার (স্ত্রীর) বাবা-মায়ের নামে দূয়া-সাদাক্বাহ করছে কিংবা কোন স্বামী যদি দেখে তার স্ত্রী তার (স্বামীর) বাবা-মায়ের নামে দূয়া-সাদাক্বাহ করছে তাহলে কি একে অপরের প্রতি সহানুভূতি, ভালোবাসা জাগবে না? আর এতে আমরাও সাওয়াবের ভাগীদার হব ইনশা আল্লাহ।

স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিৎ একে অপরের প্রতি নিজের ভালোলাগার-পছন্দের বিষয় ও বস্তু শেয়ার করা। যেমন- আমরা ছেলেরা প্রায়শই বাইরে এটা-ওটা খেয়ে থাকি (পেশাগত কারণেও আমাদেরকে বেশিরভাগ বাইরে যাওয়া-আসা করতে হয়)। কখনও এমন কিছু খেতে গিয়ে যদি আমাদের ভাল লেগে যায় তবে আমরা বাসায় নিয়ে আসতে পারি। স্ত্রী যদি দেখে তার স্বামী Randomly কিছু পছন্দ করে স্ত্রীর জন্য নিয়ে এসেছে তবে বিষয়টা কাকে না আনন্দ দিবে ? এখানে খাদ্য কিংবা খাওয়াটা মুখ্য না, স্বামী যে স্ত্রীর কথা স্মরণ করে তা নিয়ে এসেছে এই ‘স্মরণ করা’টাই মুখ্য। এই কাজ স্ত্রীরাও বাইরে গেলে স্বামীর জন্য করতে পারেন।

এবার বোনদের উদ্দেশ্যে একটি কথা বলে আজকের মত শেষ করি। বোনদের ব্যাপারে একটি কথা শোনা যায়-স্ত্রীরা কোন Past Issue সহজে ভোলে না। কথাটি কিছুটা হলেও সত্য বটে। হয়ত আজ মুখ ফস্কে কিছু একটা বলে ফেলবেন এবং ২/১ দিন যেতে না যেতেই আপনি তা ভুলে যাবেন (পুরুষরা বৈশিষ্ট্যগতভাবেই এমন-কোন কিছু বেশীদিন মাথায় রাখে না) কিন্তু দেখবেন যে, আপনার স্ত্রী কয়েক বছর পরেও  একেবারে সময় ও সুযোগ মত আপনাকেই আপনার কথা ফিরিয়ে দিবে। হয়ত অনেকেই বলবেন যে- সবাইতো এমন না। জ্বী বোন, আসলেই সবাই এমন না। কিন্তু সত্য কথা হল নারীদের অধিকাংশেরই একটা প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য এটা। তাহলে এখান থেকে কী শিক্ষা? স্বামীদের জন্য শিক্ষা হল- এমন কিছু স্ত্রীকে বলবেন না যা ভবিষ্যতে আপনার বিরুদ্ধেই দলীল হয়ে যায়। আর স্ত্রীদের জন্য শিক্ষা হল- Never ever drag any past issue for lifetime.