১. প্রথম কথাটি আমাদের ভাইদের তথা স্বামীদের উদ্দেশ্যে। ছেলেরা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কম আবেগী এবং অধিক যুক্তিবাদী বলেই হয়ত স্ত্রীদের অনেক আহ্লাদ-আবদারকে যুক্তির ছাঁচে ফেলে বাতিল করে দেয়। স্ত্রীদের সকল আবেগ-আহ্লাদ-অভিযোগকে যুক্তি দিয়ে প্রত্যাখান করা এমনকি বিচার করতে যাওয়াও বোকামি। এতে সমাধানতো হয়ই না বরং আরও বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। ভাইয়েরা এখন থেকে একটা কথা মাথায় সেটআপ দিয়ে নিন- “স্ত্রীগণ তাদের সকল অভিযোগ-আবদার শুধু পূরণ করার জন্যই স্বামীর কানে দেয় তা না বরং অনেক সময় তারা শুধু এতটুকুই চায় যে কেউ তার অভিযোগ-আবদারগুলো অন্তত মন দিয়ে শুনুক।” সুতরাং এসব ক্ষেত্রে আপনি যদি সাময়িকভাবে যুক্তিকে একপাশে সরিয়ে রেখে শুধু মন দিয়ে (দিতে না পারলেও অন্তত দেওয়ার ভান করে) তার কথাগুলো শুনুন এবং তাকে সান্ত্বনা দিন, কিছু ভালোবাসার কথা বলুন। বোঝাতে চেষ্টা করুন যে, আপনি তার সকল আবদার মেটাতে যদি নাও পারেন অন্তত তার পাশে আছেন। সেই সাথে কথা এবং তর্কে ভুলেও কখনও স্ত্রীর সাথে প্রতিযোগীতা করবেন না। একজন শায়খ বলেছিলেন- “স্ত্রীকে জয় করার দুটি হাতিয়ার হল- দয়া এবং নীরবতা”। সুবহান আল্লাহ! এই গুণ দুটি যে কত পাহাড়সম দাম্পত্য সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে ভাবাও যায় না।

২. আমাদের সমাজে অহরহ যে দাম্পত্য সমস্যাগুলো ঘটে সেগুলো একটু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে অধিকাংশ সমস্যার মূল সূত্রপাত হয় জিহ্বার অসংযত ব্যবহার থেকে। আমরা স্বামী-স্ত্রী প্রত্যেকেই যদি আমাদের জিহ্বাকে আরেকটু সংযত করতাম তবে আমরা যেমন অনেক দাম্পত্য সমস্যা থেকে মুক্তি পেতাম তেমনি বিচ্ছেদের ছোবল থেকে বেঁচে যেত আমাদের সমাজের হাজারো সংসার। এই জিহ্বার অসংযত ব্যবহার হতে পারে অনেক উপায়ে, তন্মধ্যে কিছু আছে যেগুলো আমাদের স্বামী-স্ত্রীরা বেশি করে থাকে অথচ এগুলো একেবারে Nonsensical আচরণ। আমার কথাটা একটু বেশি রূঢ লাগতে পারে, দুঃখিত। কিন্তু আমি এটাই মনে করি। অনেক স্বামীর কথা শুনেছি, কথায় কথায় স্ত্রীকে বলে- “চলে যাও তোমার বাপের বাড়ী।” এই কথা শুরুতে অনেক স্ত্রীই এড়িয়ে গেলেও একসময় দেখা যায় ঠিকই ব্যাগ গুছাতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর স্বামী বেচারার মাথা ঠাণ্ডা হয়ে আসলে তখন লজ্জার মাথা খেয়ে বউ এর রাগ ভাঙ্গাতে যায়। আর ততক্ষণে স্ত্রী বাবার বাড়ি চলে গেলেতো শ্বশুরবাড়ির সামনে নিজের মান সম্মানের বারোটা বাজে। খুব দুঃখ লাগে যখন দেখি, এতটুকু আত্মসম্মানবোধও অনেক স্বামীরই নাই। এরা ঝগড়া করে স্ত্রীকে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিতে পারাটা নিজের ক্রেডিট মনে করে। অনেক স্বামী-স্ত্রী আছে যারা কথায় কথায় একজন আরেকজনকে বলে – “তোমার ভাত মুখে তুলব না”, স্ত্রীদের একটা কমন ডায়ালগ হল- “তোর বাপ আমাকে জীবনে অমুক জিনিষটা দিল না”, “তোর বাপের সংসারে জীবনে শান্তি কী জিনিষ বুঝলাম না”, “তুমি আমারে কী দিসো এই জীবনে?” ইত্যাদি। এসব কথাই হল স্বামীর প্রতি স্ত্রীদের অকৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ, আর কথাগুলো যদি মন থেকে না হয়ে নিছক রাগের মাথায় হয় তাহলে তা নির্বুদ্ধিতার বহিঃপ্রকাশ। একই কথা স্বামীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। স্বামী-স্ত্রী প্রত্যেকের জন্য বলি, রাগ করে তিনটি জিনিষ কখনও বন্ধ করবেন না- খাওয়া, কথা এবং বাড়িতে থাকা। দ্বিতীয়টি দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে মিটমাটের দুয়ার ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসা। সুতরাং মূলনীতি হল- “কঠোরভাবে করুন জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ, লুফে নিন সুস্থ দাম্পত্য জীবন”। 

৩. আমার পরিচিত এক দম্পতি। মাঝেমাঝেই নিজেদের মধ্যে কথা কাটাকাটি করেন। তাদের খুব কমন একটা চেঁচামেচির ট্রেণ্ড এরকম-
স্বামীঃ অমুকের বউকে দেখো, মাস শেষে তমুক পরিমাণ টাকা নিয়ে আসে। সংসারে দেয়। কত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে। আসলে চাকরি না করলে জীবনের স্ট্রাগল বোঝা যায় না। সারাজীবনতো আমার উপরে খাইলা, আমার কষ্ট আর কী বুঝবা!
স্ত্রীঃ তেনার স্বামীতো প্রায়ই নিজ হাতে রান্না করে। তুমি কতদিন আমাকে রান্না করে খাওয়াইসো? সারাজীবনতো আমার উপর দিয়েই গেলা, আমার কষ্ট আর কী বুঝবা!

এই কথাগুলো আমার নিজের কানে শোনা। আহা! অন্যের সংসারের সাথে নিজের সংসারের তুলনা দিয়ে নিজ হাতে নিজ পায়ে কুড়াল মারার মত নির্বুদ্ধিতা আর কী হতে পারে? আরে আল্লাহর বান্দা! মানুষের সংসারে কে কী করছে সেগুলো নিয়ে পিএইচডি করা বাদ দিয়ে নিজের ঘরের আগুনের সূত্র বের করে তা দ্রুত নেভানোর চেষ্টা করুন। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে অন্য দম্পতিদের সাথে তুলনা দিবেন না প্লীজ! প্লীজ! প্লীজ! আর নিজেদের দাম্পত্য সমস্যার কথা ঘুণাক্ষরেও জনে জনে বলে বেড়াবেন না। তৃতীয় কারও সামনে প্রিয় মানুষটার গীবত গাইতে পারলে অন্তরের জ্বালাটা সাময়িক কমতে পারে তবে একসময় তা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে সময় নিবে না। এই বিষয়ে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সতর্ক সচেতনতা জরুরী, বিশেষত স্ত্রীদের।

যেকোন দাম্পত্য সমস্যা প্রথমে একান্তে নিজেরা বসে সমাধান করার চেষ্টা করুন। এক বৈঠকে না হোক, দুই-তিন-চার-পাঁচ যতবার লাগে বসুন, দুজন তাহাজ্জুদ পড়ে (তাহাজ্জুদ না পারলে দিনে নফল সালাত পড়ে) আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে ভিক্ষা চান আল্লাহ যেন আপনাদের অন্তর দুটিকে আবার জোড়া লাগিয়ে দেয়। এরপরও কাজ না হলে উভয়ে নিজ পরিবারের কোন অভিজ্ঞ-বিজ্ঞ-অভিভাবকসুলভ-দায়িত্বশীল সদস্যকে বিষয়টা বলুন। তাদের পরামর্শ মোতাবেক নিজেদের মধ্যে মিটমাটের সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন। আসলে মুরুব্বিদের চেয়েও বড় ভূমিকা এক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী নিজেরাই রাখতে পারে- আন্তরিকভাবে পরস্পর মিলেমিশে থাকতে চাওয়ার মাধ্যমে।

৪. এবার ভাইদের খুব স্পর্শকাতর দুটো নসীহা দিয়ে বিদায় নিই-

• আপনার স্ত্রী যখন আপনার জন্য সাজুগুজু করবে, তা যত সামান্যই হোক না কেন কিংবা তাকে যেমনই লাগুক না কেন, অবশ্যই অবশ্যই তার প্রশংসা করবেন। আপনার স্ত্রী আপনার জন্য নিজেকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে অথচ আপনি তা খেয়ালই করলেন না, প্রশংসাতো দূরের কথা-এটা একটা বড়সড় অপরাধ। তবে এরচেয়েও বড় অপরাধ হল স্ত্রীর সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করেও তাকে খোঁটা দিয়ে বা ছোট করে কিছু বলা কিংবা অন্যের স্ত্রীর সাথে তার তুলনা দেওয়া।

• যেকোন সময়ই গায়রে মাহরাম কোন মহিলার দিকে তাকিয়ে থাকা নিষিদ্ধ, এর অসংখ্য রুহানী ক্ষতি রয়েছে। তবে স্ত্রীর সামনে কোন গায়রে মাহরামের দিকে তাকিয়ে থাকার ক্ষতি আরও বেশী। এতে স্ত্রী যেমন ভয়াবহ মানসিক আঘাত পায় তেমনি তার আত্মবিশ্বাসও ভেঙ্গে পড়তে পারে। সে ভাবতে পারে, ঐ মহিলার মাঝে এমন কিছু আছে যা তার স্বামীকে মুগ্ধ করছে অথচ তা তার মধ্যে নেই। কিন্তু এটা নিছক শয়তানের ধোঁকা। তাই স্ত্রীর সামনে গায়রে মাহরাম মহিলার দিকে না তাকানোর ব্যাপারে আরও অধিক কঠোরতা অবলম্বন করুন ভাইয়েরা। অনেক দ্বীনি ভাই-বোনেরাও এক্ষেত্রে একটা ভুল করে থাকেন আর তা হল ভাইয়েরা স্ত্রীদের সামনে তাদের (ভাইদের) ভাবীর অত্যন্ত প্রশংসা করে থাকেন কিংবা অন্যান্য গায়রে মাহরামের তুলনায় ভাবীর সাথে পর্দার ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা দেখান। এই বিষয়টা কিন্তু দ্বীনদার স্ত্রীদের দারুণ অপছন্দের একটা বিষয়। এমনিতেও হাদীসে দেবর-ভাবীর সম্পর্ককে মৃত্যুতুল্য বলা হয়েছে। তাই বিয়ের পর আপন ভাবীদের সাথে পর্দার ক্ষেত্রে কোন শিথিলতা দেখালে চলবে না। বোনদের জন্য এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে ভাসুরের সাথে পর্দার কঠোরতা। ভাসুরের সাথে পর্দার শিথিলতাও দ্বীনি ভাইদেরকে দারুণভাবে কষ্ট দেয়। আর ভাসুরতো অন্যান্য গায়রে মাহরামের মতই একজন গায়রে মাহরাম, তার আলাদা কোন বিশেষত্ব নেই।