আমার যখন বিয়ে ঠিকঠাক হয় তখন একদিন আব্বা আমাকে ঘটা করে ডাকলেন কথা বলার জন্য। আমাদের মাঝে সব কথাতো দৈনন্দিন জীবনের ফাঁক-ফোকরেই হোত তাই সাধারণত ছোটবেলায় পাটিগণিত করানো ছাড়া আমাকে ঘটা করে ডেকে কথা বলা তেমন তার হয়ে ওঠেনি। এজন্যই সেদিন আন্দাজ করেছিলাম তিনি হয়ত ‘বিশেষ কিছু’ বলতে চাচ্ছেন। যাই হোক, সেদিন আব্বা বলেছিলেন- “সবসময় নিজের উপার্জনের ওজন অনুযায়ী চলবা আর নিয়মিত সঞ্চয় করবা ভবিষ্যতের জন্য। Cut your coat according to your cloth কথাটাতো আর এমনি এমনি আসেনি। মনে রাখবা, মানুষ অভাবে পড়ে তার উপার্জনের কমতির জন্য না বরং বেহিসাবী ব্যয়ের জন্য। আর ঋণমুক্ত থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করো, কখনও মানুষের কাছে ঋণগ্রস্থ হয়ো না”।

কথাগুলো আমি আমার ‘দাম্পত্য ডায়েরি’ তে লিখে রেখেছিলাম। এই কথাগুলোর কোন মূল্যমান কোন মানুষের পক্ষে নির্ণয় করা অসম্ভব। কথাগুলো আমার মনে এতটাই দাগ কেটেছিল যে, খুব সম্ভবত আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই কথাগুলো ভুলব না এবং আমার সন্তানদেরকেও আমি একই নাসীহা দিয়ে যাব ইনশা আল্লাহ। এই কথাগুলোকে দাম্পত্য জীবনে সুখে থাকার ‘Golden Rule’ বললেও অত্যুক্তি হবে না। অযোগ্য সন্তান হিসেবে আব্বা-আম্মার অনেক কথা মানতে না পারলেও সেদিন আব্বার বলা এই কথাটা আমি আমার দাম্পত্য জীবনে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলি আলহামদুলিল্লাহ এবং এর ফলও আমি পেয়েছি। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমাকে কখনও কারো কাছে ঋণ নেওয়াতো দূরের কথা, মাসের শেষে গিয়ে হাতখরচের সামান্য টাকাও ধার করতে হয়নি। এ শুধু আল্লাহরই প্রশংসা যিনি তার এক বান্দাকে অভাবমুক্ত রেখেছেন আরেক বান্দার উসীলায়। তাই আমি married/going to be married ভাই-বোনদেরকে বলব, আমার বাবার কথাগুলো আপনারাও আপনাদের দাম্পত্য জীবনে মেনে চলুন, দেখবেন সংসার কতটা মধুর হয়। আপনার মাসিক আয় যত কমই হোক না কেন, অবশ্যই অবশ্যই সামান্য পরিমাণ টাকা হলেও নিয়মিত সঞ্চয়ের চেষ্টা করুন। আয়ের কমতি যেন আপনার সঞ্চয়ের ব্যর্থতার কারণ না হয়। আর ‘বাধ্যতামূলক’ সঞ্চয়টুকু করার পর আপনি যেভাবে স্বাচ্ছন্দ্যে (স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে আর বিলাসীতার সাথে-দুটো বিষয় এক নয়) চলতে পারেন সেভাবেই চলুন। আপনার যদি সহজে স্মার্টফোন কেনার সামর্থ্য না থাকে তবে শুধু মানুষকে দেখানোর জন্য জোর করে টাকা ধার করে বা নিজের উপর চাপ নিয়ে তা কিনতে যাবেন না, অফিসের কলিগদের মত ‘ব্র্যাণ্ডের কাপড়’ পরার সামর্থ্য না থাকলে মার্জিত ও রুচিশীল স্বল্প দামের কাপড়ই পরুন। আপনার সৌন্দর্য কাপড় কিংবা মোবাইলের ব্র্যাণ্ডে নয়, আপনার সৌন্দর্য আপনার রুচিশীলতা ও মানসিকতায়। এগুলো উদাহরণ মাত্র। একই ধরণের ভুল আমরা অহরহ করে থাকি। সামর্থ্য নাই ইচ্ছামত জিনিষ কেনার, ব্যস- একটা ক্রেডিট কার্ড নিয়ে নিই আর ইচ্ছামত ‘শপিং’ করে টাকা উড়াই। সেখানেও লিমিট শেষ হয়ে গেলে তখন মানুষের কাছে হাত পাতি ক্রেডিট কার্ডের বিল দেওয়ার জন্য। সাথে যুক্ত হয় মানুষের পাওনা পরিশোধের অতিরিক্ত মানসিক চাপ।

ঋণগ্রস্থতা এমন এক অভিশাপ যা আপনার দাম্পত্য জীবনের সুখ-শান্তিকে নিমিষেই তছনছ করে দিতে পারে। ইসলামী শরীয়া মোতাবেক স্বামী তার পরিবারের ভরণ-পোষণ দিতে বাধ্য। এই দায়িত্ব পালনে স্বামী যখন ‘নিজ দোষেই’ অক্ষম হয়ে পড়ে তখন স্ত্রী-সন্তানদের শাসন করার জন্য প্রয়োজনীয় ‘জোর’টুকু সে হারিয়ে ফেলে। একজন বিবাহিত পুরুষের স্ত্রীকে যদি তার বাবার ঘর থেকে টাকা এনে স্বামীর সংসারের অভাব মেটাতে দিতে হয় তবে সেই স্বামীর জন্য এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কিছু হতে পারে না। আর এ ধরণের অভাবের মুখোমুখি হয়েই অনেক পরিবারের মেয়েরা বাইরে আসে চাকরি-বাকরি করে সংসারে ‘সাপোর্ট’ দেওয়ার জন্য। এসব ভাইদেরকে বলি, কী দরকার ছিল শুরুতে সেই ‘ঠাটবাট’ বজায় রাখার জন্য ঋণগ্রস্থ হওয়ার? সেদিন সমাজের চোখে তথাকথিত ‘লেভেল’ বজায় রাখার চিন্তাটুকু বাদ দিলে আজ আপনার স্ত্রীকে জীবন ও সম্ভ্রমের ঝুঁকি নিয়ে বাইরে কাজ করতে হোত না।
তবে এখানে ভুল বোঝাবুঝির কোন অবকাশ নেই। অনেক ভাই আছেন যারা তাক্বদীরের নির্ধারণে এবং নিজেরা ঋণ থেকে বেঁচে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পরও পরিস্থিতির খাতিরে ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়েন। আমি নিশ্চয়ই তাদের কথা বলছি না। এ ধরণের ভাইদেরকে সাহায্য করতে ইসলাম আমাদেরকে নির্দেশ দেয় বলেই সুদবিহীন ঋণকে (কর্জে হাসানা) অনেক বড় সাওয়াবের কাজ হিসেবে ইসলাম চিহ্নিত করেছে। আবার অনেক মা-বোনদেরকেও পরিস্থিতি ও বাস্তবতার খাতিরে কাজে নামতে হয়, তারাও আমার উপরোক্ত আলোচনার অন্তর্ভুক্ত নন।

দাম্পত্য সুখের দ্বিতীয় আরেকটি Golden Rule হল- ‘সাদাক্বাহ’। স্বামী একাই যদি উপার্জনক্ষম হয়ে থাকে তবে স্বামীর উচিত নিয়মিত ভিত্তিতে সাদাক্বাহ করা। আর স্ত্রী উপার্জনক্ষম হয়ে থাকলে কিংবা স্বামীর কাছ থেকে হাতখরচ নিলে তারও উচিত তার সম্পদ থেকে সামান্য পরিমাণ হলেও নিয়মিত ভিত্তিতে (সাপ্তাহিক/মাসিক) সাদাক্বাহ করা। এতে যে একটা সংসারে কী পরিমাণ বরকত আসে তা বলে/লিখে বোঝানো অসম্ভব। খুব ভাল হয় যদি স্বামী-স্ত্রী একত্রে অন্তত একজন ইয়াতিমের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিতে পারেন। আমার পরিচিত এক বোন ও তাঁর স্বামী এই কাজটি করে থাকেন। তাঁরা আমাকে জানিয়েছেন সেই ইয়াতিমের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাঁদের সংসারে শুধু বরকত আর বরকত আসতেই আছে! সুবহানাল্লাহ! ফালিল্লাহিল হামদ!

স্বামী-স্ত্রীর উচিত সাধারণ সাদাক্বাহ-র পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে বা প্রতি মাসে নির্দিষ্ট কোন সাদাক্বাহ করা। হতে পারে কোন ইয়াতিমের নিয়মিত সকল খরচ বহন করা কিংবা কোন মসজিদ/মাদ্রাসায় প্রতি মাসে কিছু টাকা সাদাক্বাহ করা। অনেকে হয়ত ভাবছেন ‘এত সাদাক্বাহ করার টাকা কোথায় পাব?’। এটা একটা অমূলক আশঙ্কা। কারণ, সাদাক্বাহ-র পরিমাণের চেয়ে মুখ্য হল ইখলাস। দূর্বল ইখলাস নিয়ে লক্ষ টাকা দান করার চেয়েও খাঁটি ইখলাস নিয়ে একশ টাকা দান করা আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। তাই অতি সামান্য পরিমাণ হলেও নিয়মিত দিন, এমনকি মাসে পঞ্চাশ টাকা বা তার কম হলেও।
নিয়মিত আমলের অন্যতম একটা ফযীলত হল, যতদিন সামর্থ্য আছে ততদিন সাদাক্বাহ করে গেলে যদি আল্লাহ আপনাকে ভবিষ্যতে এই সাদাক্বাহ করা থেকে অক্ষম করে দেন কিন্তু আপনার অন্তরে ঐ সাদাক্বাহ করার তামান্না থাকে তাহলেও আপনি নিয়মিত ঐ সাদাক্বাহ করার সাওয়াব পেতে থাকবেন। সুবহানাল্লাহ! এর চেয়ে বেশী আর কি চাই!

দাম্পত্যসুখের ৩য় Golden Rule হল- ‘জিহ্বাকে সংযত রাখা এবং কানকে সজাগ রাখা’। আগে প্রথম অংশটুকু বাখ্যা করি। অর্থাৎ অনর্থক কথাবার্তা পরিহার করা এবং বিশেষত মনোমালিন্যের সময় যথাসম্ভব চুপ থাকা সংসারে শান্তি রক্ষার্থে অপরিহার্য। এইদিক দিয়ে মেয়েরা অনেকটা দূর্বল বলে ছেলেদেরকেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে চুপ থাকার গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয়। তবে অবশ্যই স্ত্রীদেরও উচিত এই চুপ থাকার গুণ অর্জনে যথাসম্ভব চেষ্টা করা এবং এটিকে শুধুমাত্র ‘স্বামীর দায়িত্ব’ বলে ভুলে না যাওয়া। হয়ত মেয়েরা এই বিষয়ে সৃষ্টিগতভাবেই দূর্বল আর তাই এই নিয়ে তাদেরকে খোঁটা না দিয়ে আমাদের উচিত তারা যখন ভাল মুডে থাকে তখন তাদেরকে Reminder দেওয়া। আর যদি স্বামী-স্ত্রী একটা পারস্পরিক সিদ্ধান্তে আসতে ও মেনে চলতে পারেন যে- ‘যখন একজন চেঁচামেচি শুরু করবে তখনই আরেকজন চুপ হয়ে যাবে’ তবে দাম্পত্য কলহ এবং অশান্তি অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব।

এবার আসি দ্বিতীয় অংশের বাখ্যায়। ‘কানকে সজাগ রাখা’ অর্থ হল- আপনার স্ত্রী যখন আপনাকে কিছু বলবে তখন মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনবেন। যদি একান্ত ব্যস্ততার কারণে শুনতে না পারেন তবে প্রথমেই জানিয়ে দিন যে আপনি এখন ব্যস্ত আছেন এবং ফ্রী হলে তার কথা শুনবেন। একদিকে আপনার স্ত্রী কথা বলেই যাচ্ছে আর আপনি মোবাইল/টিভি/ল্যাপটপ স্ক্রীনে বুঁদ হয়ে আছেন-এমন দৃশ্য মেয়েদের জন্য খুব সুখকর নয়। আবার শুধু হুঁ হাঁ করে দায়সারাভাবে শুনে পার করে দিলেও সমস্যা যাবে না বরং আরো বাড়তে পারে। তাই স্ত্রীর কথা শুনে বুঝতে চেষ্টা করুন সে আসলে কী চায়? আপনার কাছে কোন পরামর্শ চায় নাকি শুধুই তার মনের আবেগটুকু প্রকাশ করতে চায়। সে পরামর্শ চাইলে আপনি পরামর্শ দিন আর শুধু আবেগের প্রকাশ ঘটালে আপনিও তাকে বুঝতে দিন যে, আপনার কাছে তার আবেগের মূল্য আছে। অযাচিত পরামর্শ কিংবা পেরেশানির মুহূর্তে রোমান্স- কোনটাই সুখকর অভিজ্ঞতা নয়!