আজ যে বিষয়টা নিয়ে লিখব সেটা হল স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ‘Mutual Trust’ বা পারস্পরিক আস্থা-বিশ্বাস। অনেকে এটুকু শুনেই নাক সিঁটকাতে পারেন যে ‘এ আর নতুন কী? এতো সবাই-ই বলে’। আসলে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সুসম্পর্কের রসায়নে নতুন কোন সূত্র/ম্যাজিক নেই। সুখী দাম্পত্যের তত্ত্বগুলো আমরা কম-বেশি সকলেই জানি আর এই গুগল-ইউটিউবের যুগে তো সেগুলো জানা আগের যেকোন সময়ের চেয়ে সহজ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা কয়জন সেগুলো মেনে চলি ? তো এই ‘বাস্তবে মেনে চলা’টাই আমাদের জন্য প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ তাই কথা বলব মূলত বাস্তবে কীভাবে আমরা নিজেদের মাঝে আস্থা-বিশ্বাস গড়ে তুলতে পারি কিংবা হারিয়ে যাওয়া সেই পুরনো আস্থা-বিশ্বাসের গাঁথুনি আরেকটু মজবুত করে তুলতে পারি তা নিয়ে।

যেহেতু আমাদের সমাজে বিয়ের মাধ্যমে একটি মেয়ে একেবারে নতুন পরিবেশে গিয়ে উপস্থিত হয় এবং নতুন জীবনের নানাবিধ অঙ্ক মেলাতে গিয়ে হিমশিম খায় তাই এই সময় তারা বড় নাজুক অবস্থায় থাকে। এই সময় তারা খুব বেশি করে চায় তাদের স্বামীদের পক্ষ থেকে একটু আশ্বাস-একটু সহযোগীতা। তাই বিবাহিত জীবনের একেবারে শুরুটাই হল আস্থা-বিশ্বাস গড়ে তোলার যথার্থ সময় এবং এজন্য আমাদেরকে সচেতনভাবে কাজ শুরু করতে হবে বিবাহিত জীবনের একেবারে প্রথম দিন থেকেই।

# যেসব ‘স্বামী’দেরকে তাদের বাবা-মা, ভাই-বোনদের ভরণপোষণ দিতে হয় তারা অনেক সময় বিয়ের পর বেমালুম বেখেয়াল থাকেন যে এখন তার ঘরে আরেকটি ‘নারী’ রয়েছে যারও রয়েছে তার স্বামীর উপর অধিকার। অথচ এই অধিকারটা অনেক স্বামীদের কাছে উপেক্ষিত থেকে যায়, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। তাইতো দেখা যায় (এক প্রজন্ম আগেও খুব বেশি দেখা যেত) ঈদে কিংবা অন্য যেকোন উপলক্ষে কেউ তার বাবা-মা, ভাই-বোনদের জন্য যে ‘মান’ এবং ‘পরিমাণ’ এর বাজার করেছে নিজ স্ত্রীর জন্য তার অর্ধেকও করেনি। শুধু উপলক্ষে নয় বরং বছরের বিভিন্ন সময়েও এই অসমতা অনেক ‘স্বামী’ করে থাকে। অথবা করলেও তার Attitude এমন ছিল যে ‘নিছক দায়িত্ব পালন করলাম’। অনেকে আবার নিজ বাবা-মা, ভাই-বোনদের জন্য যা খরচ করে এবং যতটুকু করে সেগুলো নিজ স্ত্রীর কাছে লুকোতে চায়। তারা ভাবে ‘আমার স্ত্রী জানলে হয়ত আমাকে এভাবে খরচ করতে দিবে না’ কিন্তু আসলে এতে ফল হয় উল্টো। স্ত্রী ভেবে বসে তার উপর তার স্বামীর ‘এতটুকু আস্থা নেই!’ এতে কিন্তু স্ত্রীর আত্মসম্মানে খুব আঘাত লাগে। আমার জানামতে, নিজ অধিকারটুকু ঠিকমত পেলে কোন স্ত্রী-ই তার স্বামীকে স্বামীর বাবা-মা, ভাই-বোনদের পেছনে খরচ করতে বাধা দিবে না কিন্তু স্বামী যখন নিজ বাবা-মা, ভাই-বোনদের পেছনে খরচ করতে গিয়ে নিজ স্ত্রীর হক ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় নষ্ট করে/লুকোতে চায় তখন এটা দাম্পত্য সম্পর্কের আস্থা-বিশ্বাস শুধু নষ্ট করে দেয় না বরং বলা যায় একেবারে শিকড় কেটে ফেলে, যদি স্বামী এই ভুল বুঝে ফিরে আসতে না পারে। এজন্যই আমাদের খালা-চাচীদের জেনারেশনে অনেক মহিলার কাছে শুনবেন- “ওর বাপতো সারাজীবন নিজের ভাই-বোনদেরই দেখে গেল, আমার দিকে তাকানোর সময় ছিলো তার?” আরেকটু আবেগপ্রবণ মহিলারা আপনজন/নিকটজনের কাছেতো সুযোগ পেলেই যুগ যুগের জমানো কষ্টের ডালা মেলে দিয়ে গল্প করে কীভাবে উনাদের ‘স্বামীগণ’ নিজ বাবা-মা, ভাই-বোনদের ‘পালতে’ গিয়ে উনার দিকে ‘ফিরেও তাকায়নি’। হ্যাঁ, এসব ‘কষ্টের কিচ্ছায়’ হয়ত আবেগের বশে কিছু অতিরঞ্জন থাকে তবে অবহেলার বিষয়টিতো আর মিথ্যা নয়, নাহলে একটি প্রজন্মের সিংহভাগ ‘অর্ধাঙ্গিনী’-র এসব গল্পের উৎপত্তির হেতু কী?

তবে এখানে বোনদেরকেও বলব- আপনারা আপনাদের স্বামীদেরকে তাদের বাবা-মা, ভাই-বোনদের পেছনে খরচ করতে দিতে দ্বিধা করবেন না। বিয়ের পরেও স্বামীর বাবা-মার দেখভাল করার দায়িত্ব কিন্তু স্বামীর উপরেই থাকে। এই দায়িত্ব পালনে আপনি সদা সর্বদা তাকে সাহায্য করুন, উৎসাহ দিন, তার মাঝে কোন গাফেলতি দেখলে আপনিই বরং আগ বাড়িয়ে আপনার স্বামীকে তার দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিন। ইনশা আল্লাহ আপনার প্রতি আপনার স্বামীর ভালবাসা বাড়বে বৈ কমবে না।

তাই ভাইদেরকে বলি- আপনি বাবা-মা, ভাই-বোনদের পেছনে খরচ করুন, কোন কৃপণতা করবেন না। যতটুকু লাগে করুন কিন্তু এগুলো আপনার স্ত্রীর কাছে Hide করবেন না কিংবা অন্যদের পেছনে খরচ করতে গিয়ে স্ত্রীর প্রাপ্যটুকু কমিয়ে দেবেন না। তবে কোন বিশেষ প্রয়োজনে/সময়ে শার’ঈভাবে কিংবা বাস্তব প্রয়োজনের খাতিরে প্রাধান্যের বিষয়টি সামনে চলে আসলে বাবা-মা, ভাই-বোনদের খরচে প্রাধান্য দিতে পারেন, তবে অবশ্যই স্ত্রীকে কারণটি বুঝিয়ে বলবেন। আর এই সময় স্ত্রী অযৌক্তিকভাবে বাধা দিলেও আপনি সেই বাধার কাছে নত হবেন না। তাকে যৌক্তিকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করুন আপনার কর্মের কারণ। এই একটি বিষয় আমাদের সমাজে ‘স্বামীগণ’ মেনে চলতে পারলে পারস্পরিক আস্থা-বিশ্বাস কত উন্নত পর্যায়ে উপনীত হতে পারে তা হয়ত আমরা ভাবতেও পারছি না। আল্লাহ সহায় !

# পারষ্পরিক আস্থা-বিশ্বাস গড়ে তোলার জন্য একেবারে বাসর রাতেই আপনি প্রথম পদক্ষেপটি নিতে পারেন। এটি আমাকে আমার এক উস্তাদ বলেছিলেন আর তা হল- বাসর রাতেই স্ত্রীকে সারাজীবনের জন্য নিজ বাবার বাসায় বেড়াতে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দেওয়া। অনেকে হয়ত ভাবছেন- ‘এতে অনুমতির কী আছে? যখন ইচ্ছা যাবে…’ আসলে শার’ঈভাবে চিন্তা করলে বিষয়টা একটু অন্যরকম। বিয়ের পর একজন স্ত্রী তার স্বামীর অনুমতি ছাড়া নিজ বাবার কাছে যখন ইচ্ছা তখনই যেতে পারে না। কারণ, বিয়ের পর স্বামীর হকের বিষয়টা সামনে এসে যায়। তাই দ্বীনদার বোনেরা অনেকেই বিষয়টা নিয়ে কিছুটা পেরেশানির মধ্যে থাকেন যে, যে প্রাণপ্রিয় বাবার ঘরের আদরের দুলালী হয়ে ছিলেন এতদিন সেই বাবার কাছে ‘যখন মন চাইবে তখনই’ আসতে পারবে তো ? তাই, আপনি বিয়ের রাতেই এই বিষয়ে তাকে সাধারণ অনুমতি দিয়ে দিন। দেখুন এতে কি কাজ হয়!

এক্ষেত্রে, শুধু এক্ষেত্রে নয় বরং বিবাহিত জীবনের সকল ক্ষেত্রেই, চিন্তার ভারসাম্যটা খুব জরুরী। আপনি বাসর রাতে স্ত্রীকে অনুমতি দিয়ে দিলেন মানেই এই নয় যে, আপনি পরবর্তীতে তাকে কখনো নিষেধ করতে পারবেন না। বাস্তবতার নিরিখে এবং প্রয়োজনের সাপেক্ষে যেকোন মানের বুঝদার স্ত্রী-ই বুঝে নেবেন যে কখন তার বাবার কাছে যাওয়ার উপযুক্ত সময়। কেউ আবার একে ‘মিথ্যা আশ্বাস’ বলে ভুল বুঝবেন না। আসলে বোঝাতে চাইছি, স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই প্রতিটি বিষয়েই বাস্তবতার চাহিদা ও চিন্তার ভারসাম্য মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

# পারস্পরিক আস্থা-বিশ্বাস অর্জনের জন্য আমরা আরেকটি কাজটি করব আর তা হল- পরস্পরকে পরস্পরের ‘অতীত’ নিয়ে কোন প্রশ্ন করব না। যে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ভেতর দিয়ে আমরা যাচ্ছি তাতে বিবাহপূর্ব কোন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়াটা বলা যেতে পারে আমাদের সমাজে এক প্রকার ‘Norm’ হয়ে গিয়েছে। তবে আলহামদুলিল্লাহ, এখনও এমন অনেক ভাই-বোন রয়েছেন যাদেরকে সমাজের এই ব্যাধি স্পর্শ করতে পারে নি। তো, আমাদের কারোরই উচিত নয় বিয়ের পর spouse কে এই নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা কিংবা সন্দেহ পোষণ করা। কারণ, সে স্বীকার করুক আর না-ই করুক, তার সম্পর্ক থাকুক আর না-ই থাকুক, বিয়ের পর এগুলো জেনে আপনার অশান্তি ব্যতীত কোন ফায়দা নাই। এমন অনেকের কথা শুনেছি যারা ভাবত তার স্বামী/স্ত্রীর বিবাহপূর্ব সম্পর্ক থেকে থাকলেও তার এমন কিছু খারাপ লাগবে না। কিন্তু সম্পর্কের কথা জানার পরই সংসারে সন্দেহ-সংশয় আর অশান্তির আগুন জ্বলে উঠেছে। শয়তানের কী সূক্ষ্ণ চাল!
কেউ কেউ আবার একটু বেশি ‘সাধু’ সেজে আগ বাড়িয়ে নিজে বিয়ের আগে কী কী ‘আকাম’ করেছে spouse এর কাছে সেগুলোর বিবরণ দেয়। এটা হল মূর্খতার উপর মূর্খতা। আপনি বিয়ের আগে কী করেছেন সেগুলো কখনও আগ বাড়িয়ে বলতে যাবেন না, এমনকি রসিকতার ছলেও না। ঠিক তেমনি আপনার spouse বিয়ের আগে কী করেছে সেগুলোও কখনও আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করতে যাবেন না, এমনকি রসিকতার ছলেও না।

# স্বামী-স্ত্রী পরস্পর পরস্পরের মোবাইল নিয়ে ‘গবেষণা’ (!) কিংবা ‘গোয়েন্দাগিরি’ করবেন না। যদিও স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কোন পর্দা নেই কিন্তু স্বামী/স্ত্রীর মোবাইলে এমন কিছু থাকতে পারে যা পর্দার কারণে স্ত্রী/স্বামীর জন্য দেখা জায়েয নয়। আমি শার’ঈভাবে হালাল জিনিষের কথাই বলছি আর হারামতো সর্বাবস্থায় উভয়ের জন্যই পরিতাজ্য। এছাড়াও শয়তানের ওয়াসওয়াসায় spouse এর মোবাইলে-ম্যাসেঞ্জারে-ই-মেইলে দেখা/পড়া ম্যাসেজ বা অন্য কিছু থেকেও অনর্থক সন্দেহ মনে দানা বাঁধতে পারে। তাই spouse এর মোবাইল নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা আজ থেকে সম্পূর্ণ বন্ধ!

# পারস্পরিক আস্থা-বিশ্বাস নষ্টের জন্য দায়ী আরেকটি ‘আপাত নিরীহ’ অস্ত্র হল- স্বামী কর্তৃক দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে রসিকতা। এই রসিকতা সরাসরি স্ত্রীর সাথেই হোক কিংবা নিজ বন্ধুমহলেই হোক (যদি স্ত্রী জানতে পারে)-এটি আপনার প্রতি আপনার স্ত্রীর আস্থা একেবারে চুরমার করে দিবে যদি আপনি এই রসিকতাকে অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেন। পাশাপাশি আপনি যা করবেন না তা নিয়ে স্ত্রীকে দিনের পর দিন মানসিক কষ্টে ও চাপের মধ্যে রাখাটা কতটা মানবীয় আচরণ ? আপনি হয়ত রাতের বেলা রসিকতা করে ঘুমিয়ে যাবেন, ঘুম থেকে উঠেই আবার সবকিছু ভুলে যাবেন। কিন্তু আপনার স্ত্রীর ক্ষেত্রে এমনটা হবে না। আপনার ঐ রসিকতাই দিনের পর দিন সূঁচের মত সন্দেহের খোঁচা দিতে থাকবে তাকে। এটি কি আপনার জন্য খুব সুখনীয় কিছু? আপনি সত্যিকার অর্থেই দ্বিতীয় বিয়ে করতে আগ্রহী হলে এবং নিছক আবেগ না দিয়ে বরং বাস্তবতা ও প্রয়োজনের তাগিদে দ্বিতীয় বিয়ে করার সুস্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারলে ‘ফালতু রসিকতা’ না করে দ্বিতীয় বিয়েটা করে ফেলুন। কিন্তু এই বিষয়টা নিয়ে রসিকতা করে অনেক ‘দ্বীনি ভাই’ও ইসলামের একটি বিধানকে তাচ্ছিল্যের বস্তু বানিয়ে দিচ্ছেন। এটি কি গুনাহের কাজ নয় ভাইয়েরা ?