সোশ্যাল মিডিয়ার এ যুগে (অধিকাংশ) মানুষ মাত্রই show off প্রবণ। নিজের/নিজেদের ভালোলাগা, ভালোবাসা, ভালো থাকা আমরা যেন অন্যকে জানানোর জন্য একপায়ে খাড়া। কথায় বলে- “কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ”। আমাদের অবস্থাও তথৈবচ! যখন আমরা নিজেদের ‘বিন্দাস লাইফ’ মানুষের সাথে ‘share’ করতে ব্যস্ত তখনই হয়তবা আমাদের মতই আরেক সংসারে জ্বলছে অশান্তি কিংবা বিচ্ছেদের আগুন। অনেক সময়তো এও দেখা যায় যে, নিজেদের মধ্যেই ‘বনিবনা’ হচ্ছে না কিংবা তুষের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে অথচ সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরাই আবার নিজেদের happiness প্রচারে উচ্চকণ্ঠ। আসলে মানুষ যতই নিজেকে প্রবোধ দিক না কেন যে, ‘we are made for each other’- দুনিয়ায় এমন দুটি কোন মানুষ নেই যাদের মধ্যে ভালোলাগায়-পছন্দে-অপছন্দে কোনো না কোনো অমিল নেই।

একারণেই হয়তবা অনেক সাবধানী মানব-মানবী প্রশ্ন করে থাকেন, ‘যে মেয়েকে/ছেলেকে কখনও চিনলাম না, জানলাম না তার সাথে কীভাবে বাকি জীবন কাটাব?’ এই (কু)যুক্তির জবাব দেওয়া এই লিখার উদ্দেশ্য নয় বরং আজ আমি একটি উপায় বাতলে দিতে চাই যার দ্বারা স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের মাঝে অনেক অনেক অমিল ও মতপার্থক্য থাকার পরেও নিজেদের মধ্যে একটা ভাললাগার মেলবন্ধন তৈরী করতে পারবেন, নিজেদের অপছন্দগুলিকে দূরে সরিয়ে পছন্দগুলি দিয়ে অবসর সময়ের পুষ্পমালা গাঁথতে পারবেন ইনশা আল্লাহ। আর এই সংক্রান্ত যে কথাগুলো এখন বলতে চাই সেগুলো কোনটাই বই-পুস্তক থেকে পড়া নয়, বরং আমার ও চারপাশের প্রিয়জনদের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া।

নিজেদের অমিলগুলোকে দূরে সরিয়ে কাছে আসার জন্য সর্বপ্রথম স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এই বোঝাপড়ায় আসতে হবে যে, ‘আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তি শুধু মিলগুলিই নয় বরং আমাদের অমিল ও মতানৈক্যের কারণেও আমরা পরস্পরকে শ্রদ্ধা করি।’ ব্যাপারটা এভাবে ভাবুন- যদি আপনাদের মধ্যে কোন অমিল না-ই থাকত এবং একজন আরেকজনের সব কিছুতেই হুঁ হাঁ করে যেতেন তবে বিষয়টা কেমন বোরিং হত! না থাকত কোন গঠনমূলক আলোচনা আর না আসত কোন সৃজনশীল কাজের ধারণা। তথাপি স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মতানৈক্যের কারণে অনেক পরিবারে কোন পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য একটি গোলটেবিল বৈঠকও (মাশোয়ারা) করা হয়ে যায় আর সেখানে যদি আমরা আমাদের বুঝমান সন্তানদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করি তবে তারাও পারিবারিক সিদ্ধান্তে মত দিতে পারে এবং এভাবে শৈশবকাল থেকেই তাদের ডিসিশন নেওয়ার সক্ষমতা গড়ে উঠে। এভাবে পারস্পরিক মতানৈক্যকে আমরা একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলেই কিন্তু বুঝতে পারি যে দাম্পত্য জীবনে মতানৈক্য আমাদের প্রতি আল্লাহর কত বড় একটি ইহসান। কিন্তু কষ্টের বিষয় হল এই ইহসানকেই আমরা জীবনসংগী/জীবনসঙ্গিনীর উপর যুলুমের হাতিয়ার ও অভিযোগের ধনুক হিসেবে ব্যবহার করি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে।

আচ্ছা ভাবুন তো, শুধু কি আলু-তেল-পেঁয়াজ নিয়ে ঝগড়া করার জন্য আল্লাহ দুটি অসাধারণ মানুষকে এক ডোরে বেঁধে দেন? নাকি তার চেয়েও বড় কিছু করার ক্ষমতা তাদের মাঝে আছে দেখেই আল্লাহ তাদেরকে একত্রিত করেছেন? বারান্দার লতানো গুল্ম যেমন যত্ন-আত্তি পেলে গ্রিল বেয়ে তরতর করে উঠে যায় তেমনি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও একটা ভাল understanding থাকলে সেখানে ভালোবাসা-মায়া-মমতা-সহনশীলতা-শ্রদ্ধাবোধ তরতর করে বাড়তে থাকে।

তাহলে আমরা কী করতে পারি? স্বামী-স্ত্রী একত্রে অন্তত এমন একটি কাজ করুন যাতে আপনাদের দুজনেরই আগ্রহ আছে। যে দুটি মানুষ ২৪/৭ একসাথে একই ছাদের নীচে থাকেন তাদের মাঝে হাজার মতানৈক্য-অমিল থাকুক না কেন, এমন একটি বা দুটি কাজ খুঁজে পাওয়া মোটেও কঠিন হবে না যে কাজটায় স্বামী-স্ত্রী দুজনেই আগ্রহ বোধ করেন। দুজনকেই সমান আগ্রহী হতে হবে এমন নয়। হতে পারে কাজটায় কেউ একটু বেশী আগ্রহী, কেউবা আরেকটু কম কিন্তু সারকথা হল- আগ্রহ থাকতে হবে এবং নিজেদের স্বার্থেই সেই কাজে অংশগ্রহণের মানসিকতা থাকতে হবে। কাজগুলো হতে পারে এমন-

  • বাড়ির ছাদে বা বারান্দায় বাগান করা, যত ছোট পরিসরেই হোক না কেন কিংবা বাসায় একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরী গড়ে তোলা। এই কাজগুলির একটি সুবিধা হল এগুলো শুধু ‘করেই খালাস’-বিষয়টা এমন না। একবার কোন বাগান এবং লাইব্রেরী তৈরী হয়ে গেলে নিয়মিত তার যত্ন করা, ঝাড়া-মোছা করা, নিত্য নতুন সদস্যদের (বই/গাছ) আসার ব্যবস্থা করা-এমন অনেক কাজই করা লাগে যা দাম্পত্য সম্পর্কে একটা long term project হিসেবে কাজ করে। ভালো করে খুঁজে দেখলে এমন অনেক কাজই পাওয়া যাবে যা কিনা স্বামী-স্ত্রী একসাথে আনন্দ নিয়ে করতে পারে এবং কাজগুলোরও একটা পজিটিভ প্রভাব পরিবারে এবং নিজেদের মন-মননের উপর পড়ে।
  • একসাথে কিছু শেখা। হতে পারে Skill Development মূলক কোন কোর্স কিংবা কোন ইসলামিক কোর্স। এখন Udemy, Coursera এসব প্ল্যাটফর্মে ঘরে বসেই অনেক ক্রিয়েটিভ কিছু শেখা একেবারেই সহজ, শুধু দরকার আগ্রহ আর সদিচ্ছা এবং একটুখানি সময় ‘কুরবানী’ করার মানসিকতা। আবার অনেক ইসলামিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আছে যেখানে আরবী ভাষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইসলামিক টপিকের উপর কোর্স করা যায়। স্বামী-স্ত্রী একত্রে এমন কোন কোর্সে জয়েন করলে পড়ায় যেমন গতি থাকে তেমনি পড়ার মানও ভাল হয়। একজন আরেকজনকে একাডেমিক বিষয়ে সাহায্য করার পাশাপাশি উৎসাহ-উদ্দীপনাও দিয়ে থাকে।

এই প্রসঙ্গে নিজের একটি অভিজ্ঞতা বলি- IOU তে আমি এবং আমার আহলিয়া একসাথে BAIS  কোর্সে পড়েছি। এখানে ৪৮ টা কোর্সের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন কোর্স ছিল- মীরাসের কোর্সটি। অর্থাৎ  সম্পত্তি বণ্টনের নিয়মকানুন নিয়ে। আমার স্পষ্ট মনে আছে- জটিল গাণিতিক হিসাবের মারপ্যাঁচ আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকত না, কোর্সটির প্রায় পুরোটাই আমার আহলিয়া আমাকে পড়িয়েছে। দুজন একসাথে পরীক্ষা দিতে গিয়েছি এবং ফলাফলও মন্দ ছিল না আলহামদুলিল্লাহ। IOU এর পুরো ৬ বছরের যাত্রায় এমন অসংখ্য স্মৃতি আছে আমাদের। তাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস- যেকোন স্বামী-স্ত্রীই যদি একসাথে গঠনমূলক কোন একাডেমিক প্রোগ্রামে জয়েন করেন তবে এতে শেখাও যেমন হয় তেমনি নিজেদের মাঝে রসায়নটাও আবার নতুন করে ঝালাই হয়ে যায়।

  • একসাথে কিছু শেখানো। হয়ত ভ্রু কুঁচকে ভাবছেন- ‘একসাথে আবার কী শেখাবো?’ যদি আপনি/আপনারা কিছুটা এক্সট্রোভার্ট স্বভাবের হয়ে থাকেন তবে এই কাজটা খুব সহজ। সপ্তাহের একদিন একটি নির্দিষ্ট সময় বিল্ডিং এর কিংবা পরিচিত সার্কেলের বাচ্চাদের বাসায় ইনভাইট করুন। তাদের সাথে খেলাচ্ছলে গঠনমূলক কোন স্কিল কিংবা আদব ও ইসলামী মূল্যবোধ শিক্ষা দিন। কী শেখাবেন, কীভাবে শেখাবেন এবং কতটুকু শেখাবেন-এসব কিছুই বাচ্চাদের ‘নেওয়ার ক্ষমতা’ এবং তাদের অভিভাবকদের সাথে পরামর্শের ভিত্তিতে নির্ধারণ করুন। তবে অবশ্যই মাথায় রাখবেন- পুরো বিষয়টা যেন খেলার ছলেই হয় এবং এখানে স্কুল স্কুল ভাব না আসে। বাচ্চারা সারাটা সকাল-দুপুর স্কুল করে বাসায় এসে নিশ্চয়ই আবার স্কুলে যেতে চাইবে না! আর যেহেতু এই ধরণের কাজে বসায় স্পেস দরকার হয় এবং কিছুটা হৈ-চৈ হতে পারে তাই অবশ্যই আপনার বেটার হাফের সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিন। সবকিছুর মূল উদ্দেশ্যই যেহেতু ‘একত্রে কিছু করা’ তাই এই কিছু করতে গিয়ে আবার নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করবেন না।
  • সবচেয়ে ভাল হয় যদি পরস্পরের weak point সম্পর্কে ভাল ধারণা থাকে এবং সেই weak point নিয়ে কাজ করার সক্ষমতা থাকে। যেমন- যদি স্ত্রী আর্থিক হিসাব নিকাশ এবং ব্যাংক লেনদেন কিংবা money management ইত্যাদি কাজে কাঁচা হয়ে থাকে তবে স্বামী পারেন ধীরে ধীরে তাকে এসব কাজে দক্ষ করে তুলতে (এখানে ধরে নিচ্ছি যে স্বামী এসব কাজে পারদর্শি কারণ ছেলেদেরকে আর্থিক দায়িত্ব নেওয়ার উবাদে প্রায়ই এসব করতে হয়) এতে করে স্ত্রীদের জন্য সংসারের হিসাব নিকাশে সুবিধা হতে পারে। আবার স্বামী যদি বাচ্চার যত্ন-আত্তি নিতে কিছুটা ‘কাঁচামি’ করেন তবে স্ত্রীর উচিত স্বামীকে এইদিকে এগিয়ে দেওয়া। আফটার অল, বাচ্চাটাতো আর মায়ের একার না!
  • স্বামী-স্ত্রী একত্রে যদি ভলান্টারি কাজ করা যায় তবে সেটা একেবারে সোনায় সোহাগা। হতে পারে কোন সেমিনার/কনফারেন্স/স্কলারদের হালাকা আয়োজনে কাজ করা কিংবা বাচ্চাদের নিয়ে কোন প্যারেন্টিং প্রোজেক্টে কাজ করা। এই ধরণের কাজে একসাথে অনেকগুলো skill ডেভেলপ করে। আর তারচেয়ে বড় কথা হল, এই ধরণের কাজে দু’জন একসাথে যুক্ত হলে একে অন্যের অনেক hidden talent চোখে পড়ে যা হয়ত সাংসারিক ‘ক্যাচক্যাচানি’র চাপে দুজন ভুলেই গিয়েছিল কিংবা কখনও চোখ মেলে দেখারও সুযোগ হয়নি। বাচ্চাদের সাথে নিয়ে করলে তারাও ছোট থেকেই এই skill গুলোর সাথে পরিচিত হতে থাকে এবং তাদের নিজেদের অজান্তেই এগলো adopt করতে শুরু করে। এই ধরণের কাজ যে সবসময় ঘরের বাইরেই করতে হবে তা জরুরি না। ঘরে থেকেও বাচ্চাদের নিয়ে অথবা বাচ্চাদের ছাড়াও এমন কাজ করার সুযোগ আছে।
  • স্বামী-স্ত্রী একত্রে যদি দ্বীন প্রচারের কাজ করা যায় তবে সম্ভবত এর চেয়ে উত্তম আর কিছু হতে পারে না। তবে এখানে অবশ্যই শার’ঈ নীতিমালা মেনেই কাজ করতে হবে। এই কাজের জন্য প্রচলিত কোন দাওয়াতী মেহনতের সাথে যুক্ত হতেই হবে এমন না। আবার দম্পতিদের মধ্যে কেউ একজন এমন কোন মেহনতে আগে থেকেই জুড়ে থাকলে আরেকজনের জন্য সহজ হয়ে যায় দাওয়াতের প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পাওয়াটা। তবে অন্তত নিজ নিজ পরিসরে এবং পরিচিতিজনদের মাঝে দাওয়াতী কাজে সময় দিলে এতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকত ও রহমত নেমে আসে। মেয়েরা সহজেই পারেন নিজেদের বিল্ডিং এর অন্যান্য মহিলাদের মাঝে প্রয়োজনীয় (তাদের মেজাজ ও নেওয়ার ক্ষমতা বুঝে) ইসলামী বই গিফট দেওয়া কিংবা বাচ্চাকে স্কুলে নিয়ে গিয়ে অন্যান্য ‘ভাবী’দের সাথে খেজুরে আলাপ না করে সুযোগ বুঝে দ্বীনের কথা বলা, গীবতের ঘ্রাণ পেলেই গীবতের ভয়াবহতা নিয়ে আলাপ শুরু করা, কীভাবে নিজেদের পরিবারে দ্বীনের মাধ্যমে আল্লাহর বারাকাহ ও সুকুন (প্রশান্তি) নেমে এসেছে সেই গল্প শোনানো। এই কাজগুলি কম-বেশী সকল স্ত্রীগণই করতে পারেন। আর স্বামীদের জন্যতো দাওয়াতের ক্ষেত্র অনেক প্রশস্ত- সেই আলোচনা এখন নিষ্প্রয়োজন।
  • সকল কাজই যে long term বেসিসে হতে হবে তা নয়। এমন অনেক ছোট ছোট কাজ রয়েছে যেগুলো নিয়মিত করলেও স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অমত ও অমিলের জায়গাগুলোতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা সম্ভব হয় । দুজন একসাথে বাইরে খেতে যাওয়া কিংবা ছুটির দিনে কোথাও বেড়াতে যাওয়া (কাছে বা দূরে, পাহাড়ে বা সমুদ্রে…), একসাথে morning/evening walk এ যাওয়া, অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া কিংবা নিদেনপক্ষে ছুটির দিনে দুজনে মিলে প্রিয় কোন খাবার রান্না করা। মনে রাখতে হবে, এসব কাজের কোনটিতে হয়ত একজনের আগ্রহ কম থাকবে কিংবা একেবারেই থাকবে না কিন্তু তাই বলে বাদ দেওয়া যাবে না। নিজেদের স্বার্থেই নিজের উপর তার পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়াটা শিখতেই হবে।

এখানে আমি একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করলাম মাত্র।  আপনারা নিজেরাই খুঁজে নিন আর কী কী কাজ আপনারা অবসরে করতে পারেন যা কিনা শত অমিল-দ্বিমত থাকা সত্বেও আপনাদেরকে ভালোবাসার বাহুডোরে বেঁধে রাখবে। আর হ্যাঁ, যত যা-ই করুন না কেন, আল্লাহর কাছে আপনাদের মিল-মহব্বত-জোড়ের জন্য কক্ষণো দূয়া করতে ভুলবেন না, কক্ষণো না।