সম্রাট নেপোলিয়ন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “আমি যদি কন্সটান্টিনোপল জয় করতে পারতাম, তাহলে পুরো বিশ্বই কব্জা করে ফেলতাম।”

কন্সটান্টিনোপল শহরের অদূরে ছোট্ট একটি গ্রাম, সেই গ্রামের অতি সাধারণ এক মা হুমা খাতুন। সন্তানকে নিয়ে ফজরের সালাত পড়ে বেরিয়েছেন সন্তানকে তার ছোট্ট পৃথিবী দেখাতে, যে পৃথিবীর শেষপ্রান্তে বাধা হয়ে দাড়িয়ে আছে এক দেয়াল। ওপারে তার কন্সটান্টিনোপল, অজেয় দুর্গসম এক শহরের নাম। মা আঙুলের ইশারায় সন্তানকে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন,

أنت يا محمد تفتح هذه الأسوار اسمك محمد كما قال رسول الله صلى الله عليه وسلم.

“মুহাম্মাদ! ঐ যে দেয়াল দেখতে পাচ্ছো না? ওর ওপারে কন্সটান্টিনোপল, সেখানে আজও মুসলমানদের বিজয়কেতন ওড়েনি। তোমাকে ঐ শহর জয় করতে হবে। তোমার নাম মুহাম্মাদ, রাসূল সা. তোমারই মত এক যুবকের ব্যাপারে এই জয়ের ওয়াদা করে গেছেন।”


ছোট্ট মুহাম্মাদ অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকে। ওর এট্টুকুন হাত দিয়ে একটা পাথর উঁচু করার ক্ষমতা নেই, অত্তবড় দেয়াল পেরিয়ে কিভাবে ঐ শহর জয় করবে? এ কি স্বপ্ন না কল্পনা?
كيف يا أمي أفتح هذه المدينة الكبيرة ؟!

মা সাহস দিয়ে বললেন, হ্যা, তুমি পারবে। তোমাকে পারতে হবে কুরআন দিয়ে, নেতৃত্ব দিয়ে; দক্ষ রণকৌশল ও মানুষের ভালোবাসা দিয়ে। (بالقرآن والسلطان والسلاح وحب الناس.)

রাসূলুল্লাহ সা: এই কন্সটান্টিনোপল শহর সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামের কাছে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, “লাতাফতাহুন্নাল কুসতুনতিনিয়াতা, ফালা নি’মাল আমীরূ আমীরূহা ওয়ালা নি’মা যাকাল জাইশ।” অর্থাৎ “নিশ্চিতরূপে তোমরা কুসতুনতিনিয়া জয় করবে। সুতরাং কতই না উত্তম হবে তার শাসক এবং তার জয় লাভকারী সৈন্যরা!” (মুসনাদ আহমদ) কুসতুনতিনিয়া (কন্সটান্টাইন) বিজয়ের সৌভাগ্য অর্জনের লক্ষ্যে খোলাফায়ে রাশেদীনের আমল থেকেই অভিযান পরিচালনার স্বপ্ন দেখা হলেও সর্বপ্রথম সেই অভিযান বাস্তবায়ন করেন প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আমীর মু’আবিয়া রা.। পরবর্তীতে সাহাবী হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রা., মোয়াবিয়া-তনয় ইয়াজিদসহ আরও অনেকে অভিযান চালালেও কস্তানতুনিয়া বিজয়ে সফলকাম কেউই হতে পারেনি।

দিন যায় মাস যায়, বছর গড়ায়। ছোট্ট মুহাম্মাদ প্রতিদিন ফজরের পর মায়ের সাথে কন্সটান্টিনোপল শহর জয়ের স্বপ্ন বোনে, জানেনা আদৌ তা মহীরূহে পরিণত হবে কিনা কোনদিন। ছোট্ট মুহাম্মাদ বড় হতে থাকে, একে একে কেটে যায় কুড়িটি বছর….

২১ বছরের টগবগে তরুণ মুহাম্মাদ খান। পিতা মুরাদ খানের জীবতাবস্থায় মাত্র পনের-ষোল বছর বয়সে আরও বার দুয়েক সিংহাসনে আরোহন করলেও পিতার মৃত্যুর পর পুরো সালতানাতের ভার এসে পড়ে তার উপর। সময়টা ১৪৫৩ ঈসায়ী, মুসলিম ইতিহাসে তখন অটোমান সাম্রাজ্যের মধ্যাহ্নকাল। মায়ের কোল থেকে খ্রিস্টান সম্রাট কন্সটান্টাইন অধ্যুষিত কন্সটান্টিনোপল শহর জয়ের যে স্বপ্ন দেখে তিনি বড় হয়েছেন, তা বাস্তবায়নের এখনই সময়।

সম্রাট কন্সটান্টাইন তার শহরকে সবদিক দিয়ে সুরক্ষিত করার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। সমুদ্রবন্দরের মোহনায় বিরাট এক লৌহশিকল দুদিক থেকে এমন শক্ত করে বেধে দেয়া হয়েছে যে বহিরাগত কোন জাহাজের পক্ষে বন্দরে প্রবেশ করা একেবারেই অসম্ভব। নগরের চারপাশে গড়ে তোলা হয়েছে চৌদ্দ মাইল ম্যাসার্ধের মজবুত নগরপ্রাচীর। প্রাচীরের চারিদিকে খনন করা হয়েছে অনতিক্রম্য গভীর পরিখা। প্রাচীর ও পরিখা রক্ষার জন্য সুদৃঢ় টাওয়ারের মাধ্যমে চারিদিকে মোতায়েন করা হয়েছে অসংখ্য কামান ও তীরন্দাজ প্লাটুন। আর যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে চৌদ্দটি বিশালাকারের যুদ্ধজাহাজ।

অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান মুহাম্মাদের সম্বল মাত্র তিনশ’ নৌকাকৃতির জাহাজ, যার সবচেয়ে বড়টিও সম্রাট কন্সটান্টাইনের ক্ষুদ্রতম যুদ্ধজাহাজের সমতুল্য নয়। বসফরাস প্রণালীর এশীয় উপকূলে সুলতান বায়েজীদ ইয়ালদিরিম একটি দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন, সুলতান মুহাম্মাদ যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে প্রথেমেই এই দুর্গের বিপরীতে ইউরোপীয় উপকূলে আরেকটি দুর্গ নির্মাণ করে বসফরাস প্রণালীর প্রবেশপথ বন্ধ করে দেন। এই কাজগুলো তিনি করে ফেলেন রাতারাতি। এরপর যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তিনি সেনাবাহিনী নিয়ে সুড়ঙ্গপথে শহরের নগরপ্রাচীরের কাছাকাছি পৌছে যান। পরিখাগুলো একটু একটু করে ভরাট করে তারা প্রাচীর অবরোধ করে ফেলেন, আর চারদিক থেকে মিনজানিক ও প্রস্তর বর্ষণ করতে শুরু করেন। প্রাচীরের এপারে উসমানী বাহিনী, ওপারে সুবিশাল খ্রিস্টান বাহিনী। সুলতানের বাহিনী প্রাচীর বেয়ে উপরে উঠতে নিলেই খ্রিস্টান বাহিনী তেল গরম করে তাদের দিকে ছুড়ে মারতে থাকে। এভাবে ব্যর্থ হয়ে সুলতান নতুন কৌশল আটেন। প্রাচীরের সমান উচ্চতার উঁচু উঁচু কাঠের মিনার তৈরি করে তার নিচে চাকা লাগিয়ে প্রাচীরের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। যার উপরে সিড়ি লাগিয়ে উসমানীয় সৈন্যরা দলে দলে প্রাচীরের উপর উঠতে লাগলে খ্রিস্টান সেনাবাহিনী কাঠের মিনারগুলোর উপর জ্বলন্ত রজনের গোলা নিক্ষেপ করতে শুরু করে। সুলতানের এ কৌশলও পুরোপুরি কাজে লাগেনি, তথাপি অবরোধ চলতে থাকে।

ওদিকে জলপথে বসফরাস প্রণালীর বাধা অতিক্রম করে কন্সটান্টাইন বাহিনীর ৪ টি রসদবাহী জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করেছে জেনে সুলতান সেই পথে শক্ত প্রহরা নিযুক্ত করেন, যেন আর কোন রসদবাহী জাহাজ ঢুকতে না পারে। সুলতান সবসময় যুদ্ধক্ষেত্রে তার বাহিনীর সাথে কিছু আল্লাহওয়ালা আলেম, আবেদ ও যাহেদ ব্যক্তিদের সাথে নিতেন, যারা সর্বক্ষণ আল্লাহর কাছে দু’আয় মশগুল থাকতো। অবরোধের সময় বাড়তে থাকলে এরই মাঝে সুলতানের মাথায় আল্লাহর ইচ্ছায় আরেক নতুন বুদ্ধি খেলে যায়। সমুদ্রপথে গোল্ডেন হর্নের কাছাকাছি স্থানটি সমুদ্রবেষ্টিত থাকায় সেদিক থেকে আক্রমণের ব্যাপারে খ্রিস্টানবাহিনী মোটামুটি নিশ্চিন্ত ছিলো। সুলতান চাইলেন সেই দিক থেকে আক্রমণ করে নগরপ্রাচীরের বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দিতে। যেই ভাবা সেই কাজ! গভীর রাতে সমস্ত শহর যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, সুলতান বাহিনী তখন চৌদ্দ মাইল চওড়া স্থলপথজুড়ে কাঠের তক্তা বিছিয়ে তার উপর আশিটি জাহাজ তুলে দেয়। হাজার সৈন্য তা ঠেলে ঠেলে গোল্ডেন হর্ন বন্দরের পানিতে নিয়ে ছেড়ে দেয়। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই শহরবাসী দেখতে পায়, উসমানীয় জাহাজসমূহ নগরীর নিচে সারি সারি পুল তৈরি করে ফেলেছে, আর কামান থেকে মুহুর্মুহু গোলা বর্ষিত হচ্ছে। খ্রিস্টানবাহিনীর জাহাজগুলো উসমানীয় জাহাজগুলোতে হামলা করতে অগ্রসর হলেই কামানের গোলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়ে পানির নিচে তলিয়ে যেতে থাকে।

ওদিকে নগরপ্রাচীরের সংগঠিত সৈন্যবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ায় ও উসমানীদের অনবরত গোলাবর্ষণে নগরপ্রাচীরে অনেকগুলো ফাটল সৃষ্টি হয়। উসমানী বাহিনী দলে দলে সেখান দিয়ে নগরে প্রবেশ করতে থাকে, শুরু হয় সম্মুখ যুদ্ধ। নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে খ্রিস্টানদের লাশের স্তূপ জমা হতে থাকে, এক পর্যায়ে উসমানীয় বাহিনীর হাতে নিহত হয় সম্রাট কন্সটান্টাইন। বিজিত হয় অজেয় কন্সটান্টিনোপল। সুলতান আপন ঘোড়ায় চড়ে প্রাচীরের ভগ্ন অংশ দিয়ে সোজা শহরে ঢুকে যান, সেন্ট আয়া সুফিয়া গির্জায় পৌছে প্রথমবারের মত ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি তুলে সালাতে দাড়িয়ে যান। ঐ দিন থেকে সুলতান মুহাম্মদ খান পরিচিত হন ‘সুলতান ফাতিহ মুহাম্মাদ’ বা বিজয়ী সুলতান নামে। পূর্ণ হলো শেষনবী মুহাম্মাদ সা. এর দিয়ে যাওয়া সেই প্রতিশ্রুতি, আর সাহসী মায়ের গেথে দেয়া সেই আশৈশব স্বপ্ন। এই মা হলেন আমাদের সেইসব মায়েদের একজন, যাদের তারবিয়াতেই বেড়ে উঠেছিলো সুলতান ফাতিহ মুহাম্মদ, সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী, তারেক বিন যিয়াদ, মূসা বিন নূসাইর কিংবা সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইরের মত সময়ের অসমসাহসী সন্তানেরা… যাদের হাতেই দেশ থেকে দেশান্তরে পৌঁছে গিয়েছিলো রাসূলুল্লাহর উড়িয়ে যাওয়া ইসলামের বিজয়কেতন। কে বলে, আমাদের মায়েরা সাহসে-সমরে পিছিয়ে?