তানিয়া আজ খুব বিরক্ত, ফাইজার দাদা দাদীকে রেগুলার তার আপডেইট জানাতে হবে। কেমন আছে, কী করছে, আজকে কী কী নতুন কথা শিখলো…. সব সব। এত সময় কি আছে দুদিন পর পর ফোন দেয়ার? অদ্ভূত মানুষজন, দাদা-দাদী তো আরও আছে, নাতি-নাতনি নিয়ে এত অবসেশনের কী আছে? উনারা উনাদের মত ভালো থাকুক না, ছেলেমেয়েদের জীবনে এত ইন্টারফেয়ার করার কি দরকার? তারা বড় হয়ে গেছে, এটাতো বুঝতে হবে। তাদেরও নিজস্ব জগৎ আছে…..ওদের বাচ্চারা বড় হলে তাদের সাথে কখনোই ওরা এমন করবেনা, ইনশাআল্লাহ।

সিনারিওটা বিবেচনা করুন, বেশ কমন ঘটনা। আমরা যখনই বিষয়গুলো নিজেদের দিক থেকে চিন্তা করি, নিজেকেই একদম ঠিক মনে হয়। হয়তো আমরা সমাধানটাও চিন্তা করে ফেলি ফাইজার মা-বাবার মত: আমরা যখন দাদা-দাদী/নানা-নানীর অবস্থানে যাবো তখন পটটা একদম উল্টে ফেলবো। বিষয়টা নিয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখি, আমাদের এই চিন্তাটা কি আসলেই ১০০% ঠিক? আমার আজকের পচিশ-ত্রিশের চকচকে লেন্স আর ৫০-৬০ এর ঘোলাটে লেন্সের ভিউ কি পুরো একরকম থাকবে? আসলেই থাকবে?

আরেকটু পিছনে ফিরে দেখি গল্পটা….

ফাইজার বাবা তারিক সাহেব তখন একদম ছোট্ট, বাবা মায়ের প্রথম সন্তান। বাবামায়ের চোখের মনিটা জন্ম হলো, কী যে আদর, কী যে ভালোবাসা! প্রতিদিন বাবা মায়ের আদরে একটু একটু করে বড় হচ্ছে বাচ্চাটা, বাচ্চার প্রতিটি হাসি যেন বাবামায়ের হৃদয়ে আনন্দের ঝিড় বইয়ে দেয়, কল্পনার চোখে দেখতে পায়: তারিক বাবুটা বড় হয়ে বাবার হাত ধরে গুটি গুটি পায়ে স্কুলে যাচ্ছে, ভাবতেও চোখে পানি চলে আসে। দেখতে দেখতে বসা শিখে গেলো, এরপর হামাগুড়ি, এরপর দাঁড়ানো, এরপর হাটতেও শিখে গেলো। দিন যায় মাস যায়, বাবামায়ের স্বপ্নের বাচ্চাটা চোখের সামনে বড় হয়ে যেতে থাকে…. স্কুলের ফার্স্ট বয়, বাবামায়ের সারাদিন চিন্তা ছেলেটা অনেক বড় হবে। স্কুল পেরিয়ে কলেজে উঠে যায়, কলেজ পেরিয়ে ভার্সিটি। ভালো একটা ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ানোর জন্য বাবামায়ের কষ্টের শেষ নেই, কত রাত যে মা ছেলের পাশেই কাটিয়েছেন, ছেলে যদি রাতে উঠতে না পারে! এরপর সত্যি সত্যিই ছেলেটা খুব ভালো একটা ভার্সিটিতে চান্স পেয়ে গেলো। কিন্তু ভার্সিটিটা অন্য শহরে…..

বাবা-মায়ের চোখে অনেক স্বপ্ন: ছেলে আমার বড় হবে। কিন্তু তার জন্য তাকে যে কোল থেকে ছেড়ে বহুদূর পাঠিয়ে দিতে হবে। তিল তিল করে যে বাচ্চাটাকে এতদিন কাছে রেখে বড় করে তোলা, তাকে দূরে রেখে ওরা থাকবে কি করে? বিগত ২০ টা বছর যে একটা দিনও তারিককে ছাড়া থাকেননি তারা, এখন কি করে থাকবেন তারা? ওদের জীবনের কানায় কানায় যে ছেলেটা জায়গা করে নিয়েছে! ভাবতে ভাবতেই কেদে ফেলেন, রান্না করতে গিয়ে কাদেন, খেতে বসে কাদেন আর চোখ মোছেন, ছেলে আবার দেখে না ফেলে!

বিদায়ের দিন ঘনিয়ে আসে। ছেলেটা ট্রলি টেনে নিয়ে ক্যাম্পাসে চলে যায়। স্টেশান পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বাবা মা ফিরে আসেন। পুরো ঘরটা এখন নিরব, হাহাকার করছে চারদিক। তারিকের জন্মের ২০ বছর পর বোধহয় বাবা-মা আবার আগের মত দুইজনের সংসারে প্রবেশ করলেন: তখন আর কেউ ছিলোনা, কিন্তু এখন তাদের চোখের মনি সন্তানটা দূরে, বহুদূরে…. ডাইনিং টেবিলে খেতে বসলে তারিকের চেয়ারটা ফাকা থাকে, ফাকা চেয়ার দেখে বাবামায়ের মনটা হু হু করে ওঠে: ছেলেটা আমার কি না কি খাচ্ছে! খাবার গলা দিয়ে যায়না। ছেলের রুমে গেলেই তার কাপড়চোপড়, বই খাতা, ব্যাট-বল…. দু’জোড়া চোখ আবার ভিজে যায়!

মাস যায় বছর পেরোয়…. ছেলে পাস করে, বাবা মা হৈ হুল্লোড় করে ছেলের বিয়ে দেন। ছেলে পিএইচডি করতে স্ত্রীসহ এবরোডে চলে যায়। বাবা-মায়ের বাসার সেই ফাকা জায়গাটুকু আর পূরণ হয়না। বাবা তবু বাইরে ব্যস্ত থাকেন, মা বাসায় বসে প্রচণ্ড ডিপ্রেশানে পড়ে যান, কোন কাজে মন দিতে পারেন না। মাঝে মাঝে জীবনের ডায়েরি খুলে হিসাব মেলাতে চেষ্টা করেন, জীবনটাকে ব্যর্থ মনে হয়। আসলেই কি তার জীবনের কোন অর্থ আছে? মাঝে মাঝে কেমন যেন পাগল পাগল লাগে তার। রাতে ঘুম আসতে চায়না…..

ছেলেটা কেমন আছে জানা হয়নি! ভাবতে ভাবতেই মোবাইলের কল বাটনে চাপ দেন মা:
– আব্বু, কেমন আছো তোমরা? আমার দাদুমনিটা কী করছে আজ? ওকে এত দেখতে ইচ্ছে করছে, ওর একটা ভিডিও পাঠাও না বাবা!

(এই যে তারিকের গল্পটা, চরিত্র বদলে এখানে তানিয়াকে বসালেও একইরকম আরেকটা গল্পের প্লট তৈরি হয়ে যাবে, সেখানেও হয়তো অপেক্ষার প্রহর গুণছে আরও দু’জোড়া রিটায়ার্ড চোখ: মেয়েটা আমার কবে ফিরবে…..)

দৃশ্য এখানেই শেষ। দুইদিকের দুটো পট দেখালাম।এখন বলুন, কে ভুল কে ঠিক? দুজনেই ঠিক, তাইনা? বৃদ্ধবয়সে সন্তানেরা নিজ নিজ কাজে দূরে চলে যাওয়ার পর বাবা-মা আবার একা হয়ে যান, এই বিচ্ছেদের কারণে বাবা-মায়েরা, বিশেষ করে মায়েরা একরকম কঠিন ডিপ্রেশানের স্টেইজ পার করে থাকেন। এটাকে বলা হয় ‘এম্পটি নেস্ট সিন্ড্রোম(Empty Nest Syndrome)’। যে পাখি দুটো এতদিন খাবার জোগাড় করে এনে বাচ্চাদের মুখে তুলে দিতো, এখনও তাদের খাবার জোগাড় করতে হয় আগের মতই কিন্তু বাচ্চাগুলোর ক্ষুধার্ত মুখ আর নেই, ওদের আনা খাবারের জন্য অপেক্ষা করে কেউ আর বসে থাকেনা। অধিকার হারানো কিংবা অধিকার ভাগাভাগির এই ধাক্কাটা সামলে ওঠা কঠিন, খুব কঠিন…..

সমাধান? উভয়পক্ষ থেকেই যতদূর সম্ভব পজিটিভ থিংকিং।

 আমরা ছেলেমেয়েরা আসলেই যদি ব্যস্ত থাকি, বাবামায়েদের সাথে যদি একদম প্রতিদিন কথা বলার সময় করে উঠতে না-ও পারি, বাবা-মায়েদের এই ফীলিংসগুলোর যেন মূল্যায়নের চেষ্টা করি অন্তত।তাদের এই আবেগ-অনুভূতিগুলোকে অবসেশন বা অনধিকারচর্চা ট্যাগ না দিয়ে দিই। একদিন তো আমরাও এমন এম্পটি নেস্টার(Empty Nester) হবো, সেদিন হয়তো এই কষ্টগুলো আমাদেরকেই ব্যাকফায়ার করবে।

 আর বাবা-মায়েরা? এম্পটি নেস্টিং খুবই কঠিন, তবু এটাই তো বাস্তবতা। একটা বইয়ে পড়েছিলাম, ডিমের খোলসের ভেতর যতদিন পাখির বাচ্চা থাকে ততদিন খোলসটা তাকে বাইরের বিরূপ পরিবেশ থেকে প্রোটেকশন দেয়। কিন্তু যখন বাচ্চার বেরিয়ে আসার সময় হয়, তখন খোলসের নিজকে ভেঙেই বাচ্চাকে বাইরে যেতে দিতে হয়, জোর করে খোলসের ভেতর আটকে রাখলে বরং তখন বাচ্চাটাই আহত হবে। মানবজীবনের সম্পর্কগুলোও এমন, অধিকারগুলোও। যে যাবার যখন যাবার, তাকে ছেড়ে দিতে হয়, এই ত্যাগের মধ্যেই মা-বাবার মহানুভবতা, স্বার্থকতা, প্রাপ্তিগুলো ওপারে। সন্তানের খোজ-খবর আমরা অবশ্যই নেবো, তাদের কাছে ন্যায্য অধিকারগুলোও চাইবো, কিন্তু তাদের উপর যেন অনাকাঙ্ক্ষিত ‘হেলিকপ্টার প্যারেন্ট’ হয়ে না বসি; স্পেইস তো তাদেরও দরকার, তাদের জীবনেও ব্যস্ততা আছে, অসুস্থতা আছে, সুখ আছে, দুঃখ আছে৷ ঐযে বললাম, কিছু মানুষের জন্য ত্যাগেই সুখ। আজকে আপনারা, কাল আমরাও….. 

[শেষ লাইনগুলো লিখতে গিয়ে নিজেই কেদে ফেললাম: আমাদের অপারগতাগুলোর জন্য মাফ করে দিও আম্মু, আব্বু, বাবা, মা। সত্যিই তোমাদের ঋণ শোধ করার যোগ্যতা আমাদের নেই।  ]