ফেসবুক এমন একটা জায়গা যেখানে নিত্যনতুন হটকেক আবির্ভূত হয়। যখন যেটা আসে মানুষ সেটা নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এগুলোকে তেমন একটা পাত্তা দিতাম না কখনই। আর কে না জানে যে প্রতিবারই কুরবানীর আগে এদেশের সেক্যুলার সমাজের মাথাব্যথা শুরু হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাদের পক্ষ থেকে যে দাবীর সূত্রপাত তা আমাকে এই লিখাটি লিখতে বাধ্য করেছে আর সেটা হল- “এবারের ‘ঈদুল আদহা-য় কুরবানী না দিয়ে বন্যার্তদের মাঝে সেই টাকায় ত্রাণ বিতরণ করা উচিত।” এই কথাটি যদি শুধুমাত্র সেক্যুলার সমাজের ধারক বাহকদের পক্ষ থেকে আসত তবুও হয়ত এই লিখাটি জন্ম নিত না। কিন্তু আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম আমি যাদেরকে টুপি মাথায় সালাত আদায় করতে দেখেছি তাদের কেউ কেউও আজ সেক্যুলারদের এই উদ্ভট দাবীর সাথে একাত্মতা জ্ঞাপন করছে। এবং তারা নিজেদেরকে মুসলিম হিসেবে বিশ্বাস করে ও পরিচয় দেয়, কুরআনের প্রতি তাদের একটা জন্মগত সফট কর্ণার আছে এবং ইসলামকে তারা আল্লাহ প্রদত্ত দ্বীন হিসেবে বিশ্বাসও করে। আমার আতঙ্কটা এখানেই। মিষ্টতার আড়ালে সেক্যুলারদের মিথ্যা যুক্তি যেন তাদেরকে তাদের অজান্তেই ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত না করে সেজন্যই এই ক্ষুদ্র চেষ্টা। মোটা দাগে বললে- আমার এই লিখার টার্গেট অডিয়েন্স ইসলাম বিদ্বেষী সেক্যুলাররা নয় বরং তাদের ধোঁকার শিকার মুসলিমরা।বন্যার মৌসুমে কুরবানী করার ব্যাপারে যে আপত্তিকর দাবীগুলো এসেছে সেগুলোকে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়-১। কুরবানী না করে সেই টাকা বন্যার্তদের মাঝে দান করে দেওয়া উচিত। কারণ, কুরবানী হল ‘ত্যাগ স্বীকার করা’ আর এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ‘ত্যাগ স্বীকার করা’ হল বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানো। কেউ কেউ আবার বলছেন- কুরবানী মানে ‘প্রিয় বস্তু দান করে দেওয়া’। আর বর্তমান সময়ে টাকার চেয়ে প্রিয় আর কী আছে? সুতরাং বন্যার্তদের টাকা দান করলেই কুরবানী হয়ে যাবে। এই দাবীগুলি মূলত নামকাওয়াস্তে মুসলিমদের এবং হাতেগোণা কিছু উদারপন্থী সেক্যুলারদের।২। ইসলাম এতই বর্বর ধর্ম যে বন্যার মত দুর্যোগের মুহূর্তেও দান করাকে উৎসাহ না দিয়ে স্বার্থপরের মত কুরবানী করতে বলে। এই দাবীটা মূলত ঐ সকল সেক্যুলারদের যারা ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষে নিজেদের হাত কামড়ায়। (এদের দাবী যে কতটা ঠুনকো আর অযৌক্তিক তা একেবারেই সাধারণ মানের কোন মুসলিমও কমন সেন্স দিয়ে বুঝতে পারবেন। কুরআন এবং হাদীসে দানের ব্যাপারে উৎসাহ দিয়ে এবং দানের দুনিয়াবী ও আখিরাতি ফযীলতের বর্ণনা দিয়ে শত শত আয়াত ও হাদীস এসেছে যেগুলোর শুধুমাত্র রেফারেন্স নং উল্লেখ করলেই সুবিশাল একটা নোট হয়ে যাবে। সেদিকে যাওয়ার কোন প্রয়োজন দেখছি না। তাদের জন্য আল্লাহর কাছে হিদায়াত কামনা করি।)১ নং দাবীর খণ্ডনঃএই দাবীর সবচেয়ে বড় অসারতা হল নিজের মনমত ‘কুরবানী’ শব্দটির অর্থ- ‘ত্যাগ স্বীকার করা’ হিসেবে গ্রহণ করা। কুরবানী শব্দটি বোঝাতে কুরআনে বলা হয়েছে نحر ; কুরআনের সূরা আল কাওসার এর দ্বিতীয় আয়াতে এই শব্দটি এসেছে। আসুন তাহলে দেখি এই আয়াতে কী বলা হয়েছে এবং কুরবানী তথা نحر বলতে আসলেই ‘ত্যাগ স্বীকার করা’ বুঝায় কিনা !আল্লাহ বলেন-فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ (সূরা কাওসার; আয়াত নং-২)অর্থঃ কাজেই আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কুরবানী করুন।

এই আয়াতের বাখ্যায় বিশ্বখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ “মা’আরেফুল কুরআন” এ লিখা হয়েছে-  “نحر শব্দের অর্থ উট কুরবানী করা। এর প্রচলিত পদ্ধতি হচ্ছে হাত-পা বেঁধে কণ্ঠনালীতে বর্শা অথবা ছুরি দিয়ে আঘাত করা এবং রক্ত বের করে দেওয়া। গরু-ছাগল ইত্যাদির কুরবানীর পদ্ধতি হচ্ছে যবাই করা। অর্থাৎ জন্তুকে শুইয়ে কণ্ঠনালীতে ছুরিকাঘাত করা। আরবে সাধারণতঃ উট কুরবানি করা হত। তাই কুরবানী বুঝাবার জন্য এখানে نحر শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। মাঝে মাঝে এই শব্দটি যে কোন কুরবানীর অর্থেও ব্যবহৃত হয়।... ... ... নামায শারীরিক ইবাদাতসমূহের সর্ববৃহৎ এবং কুরবানী আর্থিক ইবাদাতসমূহের মধ্যে বিশেষ স্বাতন্ত্র্য ও গুরুত্বের অধিকারী। কেননা, আল্লাহ তাআলার নামে কুরবানী করা প্রতিমা পূজারীদের রীতিনীতির বিরুদ্ধে একটি জিহাদ বটে। তারা প্রতিমাদের নামে কুরবানী করত। ... ... ... আলোচ্য আয়াতে انْحَرْ এর অর্থ যে কুরবানী, একথা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), আতা, মুজাহিদ, হাসান বাসরি (রাহঃ) প্রমুখ থেকে বর্ণিত আছে”। [মাআরেফুল কুরআন; মদীনা পাবলিকেশন, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ১৪৭৮; সূরা কাওসার এর তাফসীর দ্রষ্টব্য]

প্রখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ “আদওয়াউল বায়ান” এর রেফারেন্স দিয়ে উপরোক্ত আয়াতের এই একই তাফসীর উল্লেখ করেছেন শায়খ আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া তাঁর সংকলিত তাফসীর গ্রন্থে।এবার দেখা যাক, উপরোক্ত আয়াতের বাখ্যায় সর্বকালের সকল ‘আলিমগণের কাছে সমাদৃত তাফসীর গ্রন্থ “তাফসীর ইবনে কাসীর” এ কী বলা হয়েছে। ইবনে কাসীর লিখেছেন-

“কুরবানী দ্বারা এখানে উট বা অন্য পশু কুরবানীর কথা বলা হয়েছে। মুশরিকরা সিজদা এবং কুরবানী আল্লাহ ছাড়া অন্যদের নামে করত। এখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলা নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তোমরা শুধু আল্লাহরই ইবাদত করো।... ... ... نحر শব্দের অর্থ কুরবানীর পশু জবাহ করা এই উক্তিটিই হল সঠিক উক্তি। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ঈদের নামায শেষ করার পরপরই নিজের কুরবানীর পশু জবাহ করতেন এবং বলতেনঃ “যে আমাদের মত নামায পড়েছে এবং আমাদের কুরবানীর মত কুরবানী করেছে সে শরীয়তসম্মতভাবে কুরবানী করেছে আর যে ব্যক্তি ঈদের নামাযের পূর্বেই কুরবানী করেছে তার কুরবানী আদায় হয়নি...।” ” [তাফসীর ইবনে কাসীর; ডঃ মুহাম্মাদ মুজীবুর রহমান অনূদিত; ১৮ তম খণ্ড; দ্বাদশ সংস্করণ; পৃষ্ঠা- ২৯৬, ২৯৭]

সুতরাং এই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেল যে, কুরবানী তথা نحر অর্থ কিছুতেই ‘ত্যাগ স্বীকার করা’ কিংবা ‘প্রিয় বস্তু দান করে দেওয়া’ নয়। এর অর্থ সত্যিকার অর্থেই জীবন্ত পশু জবাই করা। একে আবার ‘মনের পশু তথা কুপ্রবৃত্তি জবাই করা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার কোন রাস্তা নেই যা উপরোক্ত তাফসীর গ্রন্থগুলির আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট। এছাড়াও “…এবং আমাদের কুরবানীর মত কুরবানী করেছে সে শরীয়তসম্মতভাবে কুরবানী করেছে…” রাসূলুল্লাহ (সা) এর এই উক্তিটি দ্বারা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত হয় যে পশু জবাই করেই কুরবানী করতে হবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা) ছিলেন সকলের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল অথচ তিনি কখনও টাকা পয়সা দান করে কুরবানি সম্পন্ন করার শিক্ষা দেননি। দ্বীন ইসলাম এমন একটি দ্বীন যার প্রত্যেকটি বিষয়ে রয়েছে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে নির্দেশনা। এই বিষয়টি আরও এক্সক্লুসিভ ইবাদাতের ক্ষেত্রে। ইবাদাত অবশ্যই অবশ্যই হতে হবে রাসূলুল্লাহ (সা) এর শেখানো পন্থায়। নিজের মনমত পন্থায় নয়।এরপরও যদি আপনাদের মন প্রশান্ত না হয় তবে আপনাদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন-১) ‘সালাত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘দূয়া’। তাই এখন থেকে কেউ যদি বলে কিয়াম-রুকূ-সিজদাহ ইত্যাদির মাধ্যমে সালাত আদায় করার দরকার নেই বরং মনে মনে দূয়া করলেই সালাত আদায় হয়ে যাবে তাহলে কি আসলেই ‘সালাত’ আদায় হবে ? আপনার কী মনে হয় ?২) ‘যাকাত’ শব্দের একটি অর্থ ‘পবিত্র হওয়া’। সুতরাং আপনি হালাল পন্থায় উপার্জন করে আপনার সম্পদ ‘পবিত্র’ রাখলেই কি যাকাত আদায় হয়ে যাবে ?৩) ‘সাওম’ শব্দের অর্থ ‘বিরত থাকা’। সুতরাং আপনি আপনার মনমত সিলেক্টেড কিছু কাজ থেকে বিরত থাকলেই কি সাওম হয়ে যাবে ? নাকি আল্লাহ যেসব কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন সেসব থেকে বিরত থাকতে হবে ?৪) শুধুমাত্র পশু কুরবানীর টাকা বাঁচিয়েই কেন ত্রাণের জন্য দিতে বলছেন ? অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজ ক্যান্সেল করে সেই আয়োজনের টাকাটাও দিতে বলুন। পপকর্ণ খেতে খেতে খেলা দেখবেন বলে ? অথবা সকল সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তাদের মাসের ১ দিনের বেতনের টাকা ত্রাণের জন্য দান করতে দাবী তুলুন।৫) আপনার আগামী এক মাসের বুফে আর ফাস্ট ফুড বন্ধ করে সেই টাকা ত্রাণের জন্য বরাদ্দ রাখুন। পারবেন ?এমন আরও অনেক অনেক প্রশ্ন করা যায়।এছাড়াও পশু কুরবানীর প্রকৃত তাৎপর্য এবং এর পেছনের ইতিহাস এখানে আলোচনা করলাম না কলেবর ছোট রাখার খাতিরে। আপনি সত্য গ্রহণে আগ্রহী হলে এই বিষয়ে পড়াশোনা করবেন এবং কোন ভাল ‘আলিমের সাথে যোগাযোগ করবেন আর সাথে সাথে আল্লাহর কাছে সত্য বোঝার তাওফীক চাইবেন।সবশেষে আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি কিছু তথ্য-* বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহে থেমে নেই দ্বীনি ভাই-বোনেরা। আমার দেখা অনেক অনেক দ্বীনি ভাই-বোন অনলাইন-অফলাইনে ক্যাম্পেইন করে অর্থ সংগ্রহ করছেন, ভাইয়েরা দূর্গম বন্যার্ত এলাকায় স্বশরীরে গিয়ে পৌঁছে দিচ্ছেন সেই ত্রাণ।* অনেক দ্বীনি ভাই-বোনদের আত্মীয় স্বজন আছেন বন্যা কবলিত এলাকাগুলোর তুলনামূলক নিরাপদ জায়গায়। ত্রাণ সংগ্রহ করে দ্বীনি ভাই-বোনেরা পৌঁছে দিচ্ছেন ঐসব এলাকায় নিজেদের আত্মীয়দের কাছে। তারা সেখানকার চেয়ারম্যান এবং অন্যদের সহায়তায় ত্রাণ বিতরণ করছেন নিরলসভাবে।* অনেক মাদ্রাসা থেকেও ইতিমধ্যে ত্রাণ সংগ্রহের কাজ শুরু হয়ে গেছে। পুরান ঢাকার সুবিখ্যাত লালবাগ মাদ্রাসা থেকে আগামী বুধবার ত্রাণবাহী গাড়ি রওনা দেবে বন্যাদূর্গত এলাকায়। সেখানকার ছাত্র ভাইয়েরা এখন ত্রাণ সংগ্রহে ব্যস্ত। অন্যান্য অনেক ত্বলিবুল ‘ইলমও (ইসলামী জ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করছেন যিনি) এই ব্যাপারে উদ্যোগ নিচ্ছেন।এমন আরও বহু বহু উদাহরণ দিতে পারি। আর যাদের কথা বললাম তারা কেউই কিন্তু ত্রাণ দেওয়ার অজুহাতে পশু কুরবানী দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন না। নিজের সাধ্যের সবটুকু দিয়েই তারা পশু কুরবানী করবেন ইনশাআল্লাহ। সুতরাং একজন আদর্শ মুসলিম যেমন পশু কুরবানীও করবেন তেমনি বন্যার্তদের জন্য সাধ্যমত দান এবং অন্যান্য সকল উপায়ে সাহায্য করারও চেষ্টা করবেন। আর এই দুটি কাজের উদ্দেশ্য একটিই- মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুসন্ধান।আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। শান্তি বর্ষিত হোক হিদায়াতের অনুসারীদের উপর।