নাস্তিকতার যুক্তিখণ্ডনমূলক সদ্যপ্রকাশিত একটি বই হাতে নিয়ে বসেছি, প্রথম গল্পের এক পর্যায়ে গ্রামের প্রচলিত কুসংস্কার নিয়ে একটি উদাহরণ টানা হয়েছে, “গর্ভবতী মহিলা যদি বাকা হয়ে দাড়ায়, তার গর্ভের সন্তান বিকলাঙ্গ হয়।” এটুকু পড়েই নিজের কিছু গল্প মনে পড়ে গেলো-

ফাতিমা পেটে তখন, ডিউটি থেকে ফিরে হোস্টেলের বেডে শুয়ে বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছি। বেদানার দানা ছাড়িয়ে রেখেছিলাম, ফাকে ফাকে একটা দুটো মুখে পুরছি। এইসময় বাসা থেকে আম্মুর ফোন:

“বাবা, তোমার নানু এইমাত্র ফোন দিলো আমাকে, তোমাকে নাকি ফোন দিয়ে বিজি পাচ্ছে তাই। এখন তো চন্দ্রগ্রহণ চলছে, তোমার নানু বললো চুপচাপ শুয়ে থাকতে, যিকির আযকার করতে, কোনকিছু কাটাকুটি কোরোনা। আমি যদিও এসব বিশ্বাস করিনা, তাও মুরুব্বিরা বলে যেহেতু, একটু মেনে চলতেও তো সমস্যা দেখিনা৷ তুমি তো ভালো জানো…..

– আম্মা, তুমি তো ভালো করেই জানো, এসবে বিশ্বাস করা শিরক। আমি তরকারি কাটলে আমার বাচ্চার হাতকাটা হবে, ফলের বিচি উপড়ালে সন্তানের চোখ উপড়ে যাবে(অন্ধ হবে), জোড়া কলা খেলে জময বাচ্চা হবে, এসবের পেছনে যুক্তি কী? মেডিক্যাল সাইন্সে তো যুক্তি নাই-ই, ইসলামিক দিক দিয়ে এটা আরও শিরকের পর্যায়ভুক্ত। আমি একটা ফল কাটলাম, একটা হালাল কাজ করলাম আর বিনিময়ে আল্লাহ আমার সন্তানের হাত কেটে ফেলবেন, আল্লাহর ঠ্যাকা পড়ছে? সন্তান পূর্ণাঙ্গ হবে না বিকলাঙ্গ হবে, সেই সিদ্ধান্ত তো আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত, গ্রহণের সময় আমার কাটাকুটির সাথে সম্পৃক্ত না, যদি হতোই তবে তো কুরআনে বা হাদীসে অবশ্যই আল্লাহ তা বলে দিতেন। তাইনা?

– তা তো আমিও জানি, বাবা। কিন্তু মুরুব্বিরা বলে তো, তাই ভয় লাগে৷ সাবধান থাকতে দোষ কী? তোমার নানীও নামাজ, কালাম, কুরআন, তাফসীর পড়েন নিয়মিত, তাও এসব বলায় একটু ভয় লাগলো। আচ্ছা, তুমি যেটা ভালো মনে করো….

– ভয়টা সেখানেই, মা! আমার নানীর মত শিক্ষিত, ধার্মিক মানুষও যেখানে এই কুসংস্কার ছেড়ে উঠে আসতে পারেননি, তাইলে গ্রামের সাধারণ মানুষের অবস্থা কী, ভাবতেই পারছিনা। নানীকে বলে দিও, আমি একটু আগেই বেদানার দানা উঠিয়ে খেয়েছি, এখন আর কিছু করার নেই, বাবুর জন্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারপর উত্তর দিই, ইনশাআল্লাহ। 

এই ধকল সামলে ওঠা গেলো, ঐ পাড়া থেকে আর ফোন আসেনি, আলহামদুলিল্লাহ। আর আমার আম্মু, নানু এবং এই শ্রেণীর সবাই সত্যান্বেষী মানুষ, আলহামদুলিল্লাহ, নিজে সত্যটা না জানলেও সত্য জানার পর বিবেকের সাথে বোঝাপড়া করেন, এরপর সত্যটা মেনে নেন, প্রশংসা আল্লাহর।

ঢাকায় ফিরলাম, মেয়ে তখনও দুনিয়ার আলো দেখেনি, সুতরাং গ্রহণের ঝামেলা তখনও মুক্ত হয়নি। বাসায় বেড়াতে এসেছেন এক চাচী, উনিও দ্বীন মেনে চলেন, পূর্ণ শর’ঈ পর্দা করেন। কথায় কথায় গ্রহণের প্রসঙ্গ চলে আসলো, আবারও একই সাবধানবাণীর পুনরাবৃত্তি: বাবা, এইসব বিশ্বাস করা ঠিক না, তা আমরাও জানি। কিন্তু গ্রামে অনেক সত্য ঘটনা ঘটে কিন্তু, মুরুব্বিরা তো এমনি এম্নিই বলেনা৷ এইতো গত বছরের ঘটনা, ঐযে অমুক বাড়ির তমুকের খালাতো বোনের চাচতো ভাইয়ের শালীর মেয়ে, চন্দ্রগ্রহণের সময় তরকারি কাটছিলো, পরে বাচ্চাটার সবগুলো আঙ্গুল কাটা হইছে। বুঝলি মা, মেনে চলা ভালো, পরে এরকম কিছু হইলে বিপদ….

– কাকী, যেটার ভিত্তি নাই, যেটা বিশ্বাস করাই শিরক, সেটা কেন মেনে চলবো? বরং আমাদেরই তো মানুষকে বোঝাতে হবে যে এটা ভুল। যে উদাহরণ দিলেন, ঐ বাচ্চার হাতকাটা এম্নিতেই হতো, কোন কঞ্জেনিটাল ডিফেক্ট ছিলো, তারচে বড় কথা আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়েছে। কিন্তু দোষ হয়েছে গ্রহণের। একটা উদাহরণ দিই, কত কবরপুজারী- মাজারপুজারী নিঃসন্তান সম্পতি দেখবেন মাজারে গিয়ে সন্তান চেয়ে মরা মানুষের কাছে দু’আ করছে, সত্যি সত্যিই অনেকের বাচ্চাও হচ্ছে। তার মানে কি ঐ মরা মানুষটাই দুয়া কবুল করলো? ওর কি সেই ক্ষমতা আছে? আসলে অনেক ঘটনাই এমন কো-ইন্সিডেন্টলি মিলে যায়, তাতে মানুষের ভুল ধারণাগুলো আরও পোক্ত হয়, আর আল্লাহও তাতে বাধা দেন না, কারণ হক্ব-বাতিলের পার্থক্য কীভাবে করতে হবে সে গাইডলাইন তো তিনি দিয়েই দিয়েছেন, এখন সেটা চিনে নেয়ার দায়িত্ব তাদের, এজন্যই এটা পরীক্ষাগার। পরীক্ষায় একটি প্রশ্নের সঠিক উত্তরের পাশাপাশি সঠিকের কাছাকাছি কিছু ভুল উত্তরও দেয়া থাকে, কেউ বিভ্রান্ত হয়ে ভুল উত্তরে টিক দিলে সে তো আর নাম্বার পাবেনা। দুইয়ে দুইয়ে চার হয়ে গেলেই সবসময় উত্তর মিলে যায়না, মেলানোর পন্থায় গলৎ থাকতে পারে।

– নে বাবা, তুই যা বললি সব সত্য। কিন্তু তাও তুই একটু সাবধানে থাকিস, বাচ্চাটা পেটে…

– আমিতো তাওয়াক্কুল করে কাটাকুটি সবই করেছি, এখন চ্যালেঞ্জটা আমি করি দেখি, গ্রহণ ঠিক না আল্লাহ ঠিক?  (মনে মনে আল্লাহর কাছে মিনতির সুরে দু’আ করেছিলাম: ও আল্লাহ! আমার মেয়েটার কোন অঙ্গে খুত দিয়েন না, আমার বিশ্বাস অটল থাকবে ইনশাআল্লাহ, কিন্তু ওদের বিশ্বাসের ফাটল আরেকটু জোরদার হবে। বিপরীতটা হলে উনাদের সেই ফাটলটুকু বন্ধ হবে, ইনশাআল্লাহ।)

আলহামদুলিল্লাহ, তিনি মিনতি রেখেছেন। এখন বোধহয় সেই চ্যালেঞ্জের উত্তরটা আমি দিতেই পারি: হ্যা, হ্যা, আমি কাটাকুটি সব করেছি গ্রহণের সময়, আমার মেয়ের কিছুই কাটা হয়নি, আলহামদুলিল্লাহ। গ্রহণের হাতে ক্ষমতা নেই, ক্ষমতা কেবলই আল্লাহর।

“সূর্য এবং চন্দ্র আল্লাহর অগণিত নিদর্শন সমুহের মধ্যে দুটি নিদর্শন, কারোর মৃত্যু কিংবা জন্মগ্রহণের ফলে চন্দ্রগ্রহণ বা সুর্যগ্রহণ হয়না”। (বুখারী: ১০৪৩, মুসলিম: ৯১৫)

বি:দ্র: চন্দ্র বা সূর্য আল্লাহর দুটি নিদর্শন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আসহাবে রাসূলেরা এসময় কিয়ামতের স্মরণে ভীত হতেন, লম্বা সালাতে দাড়াতেন(সালাতুল ক্বুসূফ), তাওবা ইস্তিগফার করতেন, আযকার করতেন, দান-সাদাক্বাহ করতেন। আমাদের জন্যেও উত্তম পন্থা উনাদেরই অনুসরণ করা।