গ্রামের সফরে এবার বেড়াতে গিয়েছিলাম নানাবাড়ির প্রতিবেশী আরেক নানুর বাসায়। ছোট্টবেলা থেকে এ বাড়ির কাঞ্চিতে দাড়ালেই ও বাড়ির দেউড়ি দেখা যেতো- ঐ নানা হয়তো যাচ্ছেন মসজিদে নামাজ পড়াতে (ইমাম), নানু হয়তো রান্না করছেন, কখনো উঠোন ঝাড়ু দিচ্ছেন। পরবর্তীতে উনারা একটু দূরে গিয়ে পাকা বাড়ি করেছেন, সেই অবধি গ্রামে গেলে আর দেখা হয়না এই পরিচিত মুখগুলোর সাথে। এবারে আম্মুর সাথে দেখা করতে যাওয়া হলো। সেই প্রৌঢ়বয়সী নানুর চেহারা এখন ভাজ পড়ে পুরো বৃদ্ধা। নানা মারা গেছেন কয়েক বছর হয়ে গেলো। নানুর চোখে কি যেন রোগ হয়েছিলো (উনারা মেডিকেল টার্ম বলতে পারেন না হেতু জানা হয়নি), ইন্ডিয়া দৌড়েও কাজ হয়নি। দুটো চোখে পুরো অন্ধ হয়ে গেছে। জলজ্যান্ত একজন দৃষ্টিওয়ালা মানুষকে হঠাত অন্ধ অবস্থায় দেখতে পেলাম, কোনদিন ধারনাতেও ছিলোনা। বার্ধক্য, এ যে সবার দুয়ারেই আসবে, ভাবতে গেলেও দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে যায়।

যেই নানুকে ছোটবেলায় ফজরের পর কুরআন পড়তে দেখেছি, সারাদিন একাজ ওকাজে ব্যস্ত দেখেছি, সেই মানুষ আজ অন্ধ, একটা ঘরে বন্ধী! আমাদের নাম বলার পর হাতড়ে হাতড়ে হাতটা ধরে অনুভব করার চেষ্টা করছেন, আমার মেয়ে হয়েছে শুনে মেয়ের হাত ধরে দু’আ করে দিলেন! নানুর চোখে পানি আর পানি… বহুদিন পর আপন মানুষকে দেখলে যা হয়! দেখতেও পাননি, হয়তো অনুমানেই ছোটবেলার সেই চেনামুখ মনে করে নিয়েছেন। আহহা! আল্লাহর এক অসীম নিয়ামত চোখ, তা হারানোর কি কষ্ট! নানু কাঁদছেন, আম্মু কাঁদছে, আমিও কাঁদছি। উনার চোখের পানি আমরা দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু উনি আমাদেরটা দেখছেন না…

আম্মু স্বান্ত্বনা দেয়া শুরু করলেন হাদীস-কুরআন দিয়ে। ঐ হাদিসটা উল্লেখ করলেন-

আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ‘আমি যার প্রিয় দু’টি বস্তু (চোখ) নিয়ে নিই, অতঃপর সে ধৈর্য ধারণ করে এবং নেকির আশা করে; তার বিনিময় জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়।’ (বুখারী- হাদিস নং ৫৬৫৩, তিরমিজি- হাদিস নং ১৯৫৯)

হাদীসটা শুনে নানু এত্ত খুশি হলেন, চোখ হারানোর কষ্টের বদলে তার চোখে এবার নেমে এলো আনন্দাশ্রু- এ অশ্রু আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার, এ অশ্রু জান্নাত প্রত্যাশার! আমার কখনও কল্পনাতেও ছিলোনা, ছোট্ট এই হাদিসটিও কোন মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন হতে পারে, সুবহানাল্লাহ! নানুর দু”চোখ পানিতে ভেসে একাকার, বার বার আম্মুর হাত ধরে জানতে চাইছেন-

মাড়ে, সত্যিই তুই এই হাদিস পড়ছিস? সত্যিই আল্লাহ এই কথা বলসেন? তুই আমাকে কত সুন্দর কথা শুনালি! আমি বাকি জীবন এই কথা বুকে নিয়েই বেচে থাকবোরে মা!!

জানতে চেয়েছিলাম, নানু অযু করেন কিভাবে? নানু বললেন, রুমের সাথে এটাচড যে বাথরুম আছে ওটাতেই অযু করেন। হাতড়ে হাতড়ে একাই যান, তায়াম্মুম করে সালাতে মন শান্তি পায়না তাই। এই অন্ধ চোখ নিয়ে ফজরের আগে তাহাজ্জুদ সালাতটাও মিস হয়না কোনদিন। কথা বলছিলেন নানু, আর কষ্টে -আনন্দে কাঁদছিলেন। এই গুনাহগারের তখন চোখেও অশ্রুর বাণ, ভেতরের অশ্রু তারও চেয়ে বেশি-
দুটো জীবন্ত চোখ নিয়েও আপনার প্রাপ্য শোকরগুজার পারিনা, ইয়া আল্লাহ। সেইটুকু ইবাদত করার সাধ্য হয়নাগো রাব্ব, যেটুকু এই দৃষ্টিহীণ মানুষটা করে যাচ্ছেন! মাগফিরাতের আশা করতেও যে বড্ড লজ্জা হয়!

আল্লাহুম্মাগফিরলী, আল্লাহুম্মাগফিরলানা!