মূল রচনাঃ সালমান বিন ফাহাদ আল আওদাহ

অনুবাদঃ শেখ আসিফ

সম্পাদনাঃ কবির আনোয়ার

আর-রহমান এবং আর-রহিম আল্লাহর নামে  

লেখক পরিচিতিঃ

শায়খ সালমান আল আওদাহ ১৫ ডিসেম্বর ১৯৫৫ সালে সৌদি আরবের আল কাসিমে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বুরায়দা ইন্সটিটিউটে স্থানীয় আলেমগণের নিকট আরবি ব্যাকরণ, হাম্বলি আইনশাস্ত্র এবং হাদীস অধ্যয়ন করেন। ইসলামি আইনশাস্ত্রে তিনি M.A এবং Ph.D লাভ করেন ইমাম মুহাম্মদ বিন সৌদ ইউনিভার্সিটি থেকে। তিনি আব্দুল আজিজ ইবনে আব্দুল্লাহ বিন বাজ, মুহাম্মদ ইবনে আল উসাইমিন, আব্দুর রহমান জিব্রিন প্রমুখ শায়খের ছাত্র ছিলেন। তার বহু কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে  “আল উসুল আস ছালাছাহ,  আল কাওয়াইদ আল আরবায়া, কিতাব আত তাওহিদ, আল আকিদাহ আল ওয়াসিতিয়্যাহ, নুখবাহ আল ফিখর।  তিনি বর্তমানে জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ইসলাম টুডে (www.islamtoday.com) এর তত্ত্বাবধান করছেন। এছাড়াও তিনি ফোন এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে লেকচার এবং ক্লাস নিয়ে থাকেন।

ভুমিকা

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। শুরুতেই তাঁর শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং অনুতপ্ত হৃদয়ে তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করছি, আমাদের নিজেদের অনিষ্ট থেকে এবং আমাদের কর্মের অনিষ্ট থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি। আল্লাহ যাকে হেদায়াত দান করেন কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারেনা এবং আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন কেউ তাকে হেদায়াত দান করতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তাঁর কোন শরীক নেই। এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসুল।

বর্তমান ইসলামি পুনর্জাগরণের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে যে, তরুণ সমাজের এক বিরাট অংশ ইসলামি জ্ঞান অন্বেষণে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এর মাধ্যমে তারা এই পুনর্জাগরণকে সঠিক ইসলামি জ্ঞান এর মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় এবং সঠিক দিক নির্দেশনার মাধ্যমে এর স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে চায়।

সুতরাং মুসলিম উম্মাহর ‘আলিমগণের দায়িত্ব হচ্ছে এই তরুণ ছাত্রদেরকে স্বাগত জানানো, তাদের শিক্ষাদান করা, সঠিক পথনির্দেশনা দেওয়া এবং তাদের প্রাপ্য মর্যাদাটুকু দেওয়া। কারণ আজকের শিক্ষানবীশ-ই আগামি দিনের জ্ঞানের বাহক এবং জাতির নেতৃত্বদানকারী।

ইসলামী জ্ঞান অন্বেষণকারিদেরকে যেসব বিষয় জানতেই হবে তার উল্লেখযোগ্য একটি হচ্ছে জ্ঞান অর্জনের যাত্রায় সে কোন পথে এগোবে। তাই তাকে শুরুতেই পুঙ্খানুপুঙ্খরুপে দেখিয়ে দিতে হবে ইসলামি জ্ঞান অন্বেষণের সঠিক পন্থা কী ও এই যাত্রায় বিদ্যমান বিপদসংকুল চোরাফাঁদগুলোকে কিভাবে এড়িয়ে যেতে হবে।

এই চোরাফাঁদগুলো সম্পর্কে অসচেতনতা একজন ইসলামী জ্ঞান অন্বেষণকারিকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে যেখান থেকে ফিরে আসা আর সম্ভব নাও হতে পারে। এমনকি এ সমস্ত চোরাফাঁদ একজন জ্ঞান সাধককে তার সাধনার পথ থেকে সম্পুর্ণরুপে বিচ্যুত করে নিরেট গোমরাহির পথেও নিয়ে যেতে পারে।

জ্ঞান অন্বেষণের ইচ্ছা এমন এক উদগ্র বাসনা যা জ্ঞান অর্জনকারীকে তাড়াহুড়োপ্রবণ বানিয়ে ফেলতে পারে। অন্য কথায় বলতে গেলে এটা জ্ঞান অর্জনকারীর মাঝে এমন প্রবণতা নিয়ে আসতে পারে যা কিনা তাকে প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জনের আগেই তার উচিত নয় এমনসব বিষয়ে কথা বলায় প্ররোচিত করে।

এসব কারণে আমি কলম ধরেছি যাতে আগামি প্রজন্মের সম্ভাবনাময় তরুণ ছাত্রদেরকে তাদের কিছু সাধারণ ভুল দেখিয়ে দিতে পারি। এ সবগুলো বিষয়ই আমি বলছি আমার নিজের জ্ঞান সাধনার কালে অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে এবং আমার জ্ঞানযাত্রার সহকর্মী ও সহযাত্রীদের অভিজ্ঞতার আলোকে। আজকে আমরা যে সমাজে বাস করছি সেখান থেকেও আমি বাস্তব উদাহরণ টেনে বুঝিয়ে দেব।

এটা আমাদের অজানা নয় যে সময় পরিবর্তনশীল। প্রত্যেক প্রজন্মেরই নিজ নিজ পারিপার্শ্বিকতা ও সমস্যা থাকে। তাই আমাদের এধরনের বিষয়ের উপর প্রতিনিয়ত আলোকপাত করা জরুরি যেন এ সম্পর্কিত ধারণাগুলো নতুনরূপে আত্মপ্রকাশ করে। সম্ভবত একারনেই প্রত্যেক যুগের ‘আলিমগণ এ বিষয়ে লিখে গেছেন। ইবন আব্দুল বার এবং আল খাতিব আল বাগদাদির সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে লেখা হচ্ছে। এ সমস্ত ‘আলিমগণের প্রত্যেককেই তাঁদের সমসাময়িক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে এবং পৃথক পৃথক বাধা ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়ে এসব থেকে পরিত্রাণের উপায় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

আমি আশা করি এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধ একজন জ্ঞান অন্বেষণকারিকে তার জ্ঞানার্জনের যাত্রায় সঠিক পথনির্দেশ করবে। আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করেন এবং আমাদের কার্যাবলিকে সহজ করে দেন। আমি আরো প্রার্থনা করছি তিনি যেন সত্যকে চেনার এবং তা অনুসরন করার তৌফিক দেন এবং মিথ্যাকে চেনার এবং তা পরিহার করারও তৌফিক দান করেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি ও বারাকাহ বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর পরিবারবর্গ ও তাঁর সাহাবাগনের উপর।

 অধ্যায় ১ঃ জ্ঞানের খাতিরে জ্ঞান অন্বেষণ

মাঝেমধ্যে আপনি কোন কোন ছাত্রকে বলতে শুনবেন, “আমি শুধু জ্ঞানের জন্যেই জ্ঞান অন্বেষণ করছি’’। মানে সে বোঝাতে চাচ্ছে যে সে কোন ডিপ্লোমা বা ডিগ্রি বা এধরনের কিছুর পেছনে ছূটছে না। তবে যাই হোক না কেন, সে যা করছে তাও ঠিক নয়।

কারন একজন ছাত্রের জ্ঞান অন্বেষণের পথে একটি উল্লেখযোগ্য চোরাফাঁদ হচ্ছে শুধুমাত্র জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য জ্ঞান অর্জন করা। অন্যান্য মানব প্রবৃত্তির মতই জ্ঞান অর্জন করা এক ধরনের নেশা। এটা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে না হয়ে নিখাদ আনন্দের জন্যেও হতে পারে। এটা স্বাভাবিক মানব প্রবৃত্তি যে মানুষ নতুন নতুন জিনিষ আবিষ্কার করতে পছন্দ করে। যখন কোন ছাত্র নতুন কোন প্রশ্নের জবাব পাওয়ার জন্য প্রচুর পড়াশোনা ও পরিশ্রম করে এবং একসময় জবাবটা পেয়ে যায় তখন সে এক ধরনের তৃপ্তিবোধ করে। এটা তাকে নতুন উদ্যমে উত্তরোত্তর পড়াশোনা করতে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু ইসলাম এটা চায় না যে আমরা শুধু জ্ঞান বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে জ্ঞান সাধনা করি বরং ইসলাম চায় আমরা তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগও করি। একারণেই পূর্ববর্তী ‘আলিমগণ বলতেন, “জ্ঞান আমাদের কাছ থেকে আমল প্রত্যাশা করে এবং আমল দ্বারা এ প্রত্যাশা পূরণ করা না হলে জ্ঞান হারিয়ে যায়” ।

আল্লাহ তা’লা পবিত্র কুরআনে জ্ঞানীদের সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলেন,“পুর্বেকার যারা ইলমপ্রাপ্ত হয়েছে, যখন তাদের কাছে (আল্লাহর আয়াত) তিলাওয়াত করা হয় তখন তারা নতমস্তকে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। এবং বলে, “আমাদের পালনকর্তা পবিত্র, মহান। এবং আমাদের পালনকর্তার ওয়াদা অবশ্যই পূরণ হবে। তারা ক্রন্দন করতে করতে নতমস্তকে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয়ভাব আরো বৃদ্ধি পায়”। (সুরা ইসরা-১০৭-১০৯)

এখানে আমরা দেখি কিভাবে প্রজ্ঞা সেসমস্ত লোকেদের বিনম্র করে দিয়েছিল এবং আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হতে সাহায্য করেছিল।

আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই শুধুমাত্র তারাই আল্লাহকে ভয় করে যারা ইলমের অধিকারি’’(সুরা ফাতিরঃ২৮)।

এই আয়াতের ভিত্তিতে অনেক জ্ঞানীরাই এ কথা বলেন যে ‘আলিমগণই হচ্ছেন সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ- “যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তারাই হচ্ছে সৃষ্টির সেরা।তাদের প্রতিদান আল্লাহর কাছে।(আর তা হচ্ছে) জান্নাত যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় স্রোতস্বিনী। তারা সেথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট থাকবেন এবং তারা আল্লাহর উপর এবং এটা তাদের জন্যে যারা তাদের রবকে ভয় করে (সুরা বায়্যিনাহঃ ৭,৮)

এবং জ্ঞানীগণ এই মতের পিছনে যুক্তি পেশ করে বলেন, যেহেতু ‘সৃষ্টির সেরা’ হচ্ছে তারা ‘যারা তাদের রবকে ভয় করে এবং আল্লাহকে সঠিক অর্থে শুধুমাত্র তারাই ভয় করে যারা ইলমের অধিকারি(সুরা ফাতিরঃ২৮ অনুসারে) সুতরাং সৃষ্টির সেরা হচ্ছে ইলমের অধিকারিগণ অর্থাৎ ‘আলিমগণ।

আর এর অন্যথাই বা কি করে হতে পারে যখন সুন্নাহ নিজেই ঘোষনা করছে যে ‘আলিমগণ নবীদের উত্তরসুরি? সুতরাং এটাই প্রতীয়মান হয় যে ‘আলিমগণ উম্মাহর শ্রেষ্ঠ মানুষ যদি তাঁরা সত্যিকারার্থেই ‘আলিম হয়ে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে লোকজন এই ‘আলিম’ শব্দের সঠিক অর্থসম্মন্ধে ব্যাপক দ্বিধাদন্দ্বে আছেন। কারো কারো ধারনা যে মেডিসিন, ইঞ্জিনিয়ারিং, কেমিস্ট্রি বা এ জাতীয় যেকোন ক্ষেত্রে যারা বিশেষজ্ঞ তারাই হচ্ছেন ‘আলিম। কিন্তু আমাদের আলোচনার প্রেক্ষিতে ‘আলিম বলতে তাদেরকেই বোঝানো হচ্ছে যাদের আল্লাহ, তাঁর মনোনীত দ্বীন এবং তাঁর দেওয়া বিধিবিধান সম্পর্কে সম্যক ধারনা আছে। শুধুমাত্র ধর্মীয় বা বিমুর্ত অর্থে যেই জ্ঞান(তত্ত্বীয়) আমরা বুঝিয়ে থাকি তা যথেষ্ট নয়। বরং তা তখনই জ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে যখন তা অন্তরাত্মাকে আলোড়িত করতে পারবে।

কেউ পাহাড় পরিমান জ্ঞান সঞ্চয় করলেই আমাদের সৎকর্মশীল পূর্বসূরীগণ তাকে আলেম হবার সার্টিফিকেট দিয়ে যাননি। বরং এর জন্যে বেশী জরুরি ছিল এই যে তার অর্জিত জ্ঞান তার আখলাকে ফুটে উঠবে। সে হবে বিনয়ী, ধার্মিক এবং পরিমিতিবোধসম্পন্ন। সালফে সালিহিনদের কেউ কেউ বলতেন, “’আলিম হচ্ছে সে ব্যাক্তি যে আল্লাহকে এই পরিমাণে ভয় করে যে এ ভীতি তার আচার আচরণ এবং স্বয়ং জ্ঞানকেই প্রভাবিত করে”।