আর-রহমান এবং আর-রহিম আল্লাহর নামে

অধ্যায় ২ঃ মানুষের সাথে আচরণ

পিতামাতার সাথে আচরনঃ                                                                

মাঝেমধ্যে আপনি ইসলামী জ্ঞানের এমন কিছু ছাত্র খুঁজে পাবেন যারা তাদের জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করে আলেমদের সংস্পর্শে থেকে। তারা ভক্তি, শ্রদ্ধা ও মনোযোগের সাথে আলেমদের কথা শোনে। তবে দুঃখজনক হল নিজ পিতামাতার সাথে তাদের আচরণ যদি আপনি দেখেন তবে তা আপনাকে বিস্মিত করবে। সেখানে আপনি তাকে দেখতে পাবেন একজন রুক্ষ ও কঠোর স্বভাবের মানুষ হিসেবে। যখন তার পিতামাতা তাকে কিছু করতে বলে তখন সে উচ্চস্বরে অসন্তুষ্টির কথা জানান দেয় এবং নিজেকে অতি ব্যস্ত বলে জাহির করে। কী তাকে ব্যস্ত রেখেছে? ধর্মীয় বই পাঠ, জ্ঞান অর্জন, আলেমদের সাথে উঠাবসা এবং অনেক ভাল ভাল কাজ !!

এগুলো অবশ্যই ভাল কাজ। কিন্তু তার কি উচিত নয় তার পিতামাতার দেখাশোনা করা? আল্লাহ কি আমাদের আদেশ করেন নি যে আমরা পিতামাতার সাথে সদাচরণ করি এমনকি যদি তারা মুশরিকও হয়ে থাকে? আল্লাহ আমাদের পিতামাতার সাথে সদাচরন করার নির্দেশ দিয়েছেন এমন অবস্থায়ও যখন তারা আমাদের স্বীয় ধর্ম ত্যাগ করতে বলে এবং মুর্তিপূজার দিকে আহবান জানায়!! আল্লাহ বলেন, “যদি পিতামাতা তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয়কে ইবাদাতে শরীক করতে পীড়াপীড়ি করে তবে তাদের কথা অমান্য কর তবুও তাদের সাথে সুন্দরভাবে সহাবস্থান কর”। (সুরা লোকমানঃ১৫)

তাহলে মুসলিম পিতামাতা আমাদের কাছ থেকে কত বেশী সম্মান পাবার অধিকার রাখে এমনকি তারা যদি বড় গুনাহগার মুসলিমও হয়ে থাকে? পিতামাতাকে অমান্য করে, তাদের সাথে রুঢ় আচরন করে এবং নিজ আচরনের দ্বারা পিতা-মাতার চোখে পানি নিয়ে এসে কেউ কীভাবে নিজেকে ইসলামী জ্ঞানের ছাত্র কিংবা ধার্মিক ব্যক্তি দাবী করতে পারে ?

একজন জ্ঞান অন্বেষণকারীর ক্ষেত্রে এটা খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে, পিতামাতার অধিকার খর্ব করে দেয় এমন কোন ফতোয়া শুনে সে উৎফুল্ল হয়ে উঠে। যদি সে শুনে যে পরিস্থিতির দরুন কোন নির্দিষ্ট দেশে জিহাদের জন্যে গমন সবার জন্য অবশ্য কর্তব্য হয়ে পড়েছে এবং এর জন্য পিতামাতার অনুমতির কোন প্রয়োজন নেই তবে সে খুবই খুশি হয়।  এমনকি সে নিজের পিতামাতাকে কান্নারত অবস্থায় রেখে জিহাদে চলেও যেতে পারে। কেন? কারন কয়েকজন স্কলার বলেছেন এক্ষেত্রে পিতামাতার অনুমতির প্রয়োজন নেই। এখন যদি সে অন্য কোন স্কলারকে বলতে শোনে যে পিতামাতার অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক এবং আবশ্যিক; সে উক্ত মত কে ছুড়ে ফেলে দেয় এবং সেই স্কলারের সততা নিয়ে নানান প্রশ্ন দাঁড় করায়। কারন তার কাছে পিতামাতার আদেশ মেনে চলা কঠিন। তার চেয়ে বরং সে বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ানোতেই মজা পায়।

বাড়ি থেকে দূরে এবং পিতামাতার নাগালের বাইরে বন্ধুমহলে সে একজন ভদ্র ও সদাচারি ব্যাক্তি। সদা হাস্যোজ্জ্বল ব্যাক্তি হিসেবে সে তার দ্বীনি ভাই এবং সহপাঠিদের সাহায্য করে যায়। কিন্তু বাড়িতে আসামাত্রই তার এ রুপ হঠাৎ করেই পরিবর্তন হয়ে যায়। সে রুক্ষ এবং কর্তৃত্বশীল হয়ে সবার মতের উপর প্রভাব বিস্তার করতে চেষ্টা করে এবং সে আশা করে যে সকলে তার মত গ্রহন করে নিবে।

অথচ এই যুবকের পরিবারে তার কোন উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক ভুমিকার খোজ নিলে আমাদের হতাশ হতে হয়। সে না পারে অর্জিত জ্ঞান কে পরিবারের সদস্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে আর না পারে পারিবারিক পরিমন্ডলে বিদ্যমান সকল নীতিবর্জিত কাজের বিরুদ্ধে তাদের সতর্ক করতে। তার পরিবারের সদস্যদের উপকারে আসতে পারে এমন ইসলামিক বই, ক্যাসেট বা ম্যাগাজিন সরবরাহের কোন উদ্যোগ নিতেও সে ব্যার্থ হয়। পূর্বের খারাপ আচরনের ফলস্বরুপ সে তাদের কোন উপকারেই আসতে পারে না। স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের সদস্যগন তার কথা শুনবে না কারন ইতোমধ্যেই তার এবং তার পরিবারের মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেছে।

মাঝেমধ্যে এই ধরনের কোন ছাত্র সাহাবিগনের উদাহরন টেনে তার আচরণকে ঠিক প্রমান করতে চায়। সে উদাহরন দেয় সেসমস্ত সাহাবিগনের যারা দ্বীনের খাতিরে তাদের পিতামাতার বিরুদ্ধে গিয়েছিল। সে উল্লেখ করবে উবাইদা ইবনুল জাররাহ এর কথা যে তার পিতাকে হত্যা করেছিল। কিন্তু সে উল্লেখ করতে ভুলে যায় যে সেসমস্ত লোকেরা শুধুমাত্র কাফেরই ছিলনা বরং তৎকালীন মুসলমানদের নির্মম নির্যাতন করছিল।

হতে পারে এই ছাত্রের পিতা-মাতা গুনাহগার মুসলিম। এমনকি তারা ভাল মুসলিমও হতে পারে। কিন্তু শুধুমাত্র এই স্বল্পবয়সী তরুন তার যৌবনের তেজ, ব্যাক্তিত্ব ইত্যাদি কারনে তার পিতামাতার সাথে মন্দ আচরণ করে। ফলস্বরূপ পিতামাতাও তার সাথে দ্বিমত পোষণ করে যা তাকে তার পিতা-মাতার সম্বন্ধে আরো খারাপ ধারনা করতে সাহায্য করে। এটা অবশ্যই জ্ঞানের পথে এক ভয়াবহ চোরাফাঁদ ।

সহপাঠী ও সহকর্মীদের সঙ্গে আচরণঃ

কখনও দেখবেন কেউ নিজেকে ইসলামী জ্ঞানের ছাত্র দাবী করলেও তার প্রতিবেশী এবং সহপাঠীদের কোন উপকারে আসে না। তাদের উপর তার কোন প্রভাবই কাজ করতে দেখা যায় না;  যদি সে ছাত্র হয় তবে বিদ্যাপিঠে আর যদি কর্মচারী হয় তবে কর্মক্ষেত্রে তার কোন ভূমিকা থাকে না। সে যে সমাজে বাস করে সেখানেও তাকে সমানভাবে নিষ্ক্রিয় থাকতে দেখা যায়। যাই হোক না কেন, সে যখন তার ইসলামি জ্ঞানের সহপাঠীদের সাথে থাকে তখন তাকে খুবই প্রাণোচ্ছল দেখা যায়। কিন্তু সে ব্যর্থ হয় তার মূল উদ্দেশ্য পূরণে আর যা হচ্ছে অন্যদের ইসলামের দিকে ডাকা। সে বুঝতে পারে না যে এই দাওয়াহর কাজ ই হচ্ছে তার মূল লক্ষ্য; সে যেখানেই থাকুন না কেন। হতে পারে তা কর্মক্ষেত্র, মার্কেট বা তার নিজ বাড়ি। ফলে যেরুপ আচরণ একজন স্কলার বা জ্ঞান অন্বেষণকারীর করা উচিৎ সেরুপ আচরণ করতে সে ব্যর্থ হয় । তার উচিৎ মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকা, সৎকাজের আদেশ করা এবং অসৎকাজের নিষেধ করা।

উমার ইবনে আবি সালামাহ থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমি ছিলাম খুবই ছোট যখন আমি রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে ছিলাম। খাদ্যগ্রহনের সময় আমি থালার চারদিক থেকে খেতাম। তাই আল্লাহর রাসুল(সা) আমাকে বললেন, “তুমি আল্লাহর নাম স্মরণ কর, ডানহাত দ্বারা খাবার গ্রহণ কর এবং তোমার সম্মুখে যা আছে সেখান থেকে খাও”।

উপরোক্ত ঘটনা থেকে আমরা দেখি কীভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাবার গ্রহনের সময়ও নিয়মকানুন সম্পর্কে সচেতন ছিলেন।

তাঁর সাহাবীরাও এবং পরবর্তী প্রজন্মের ‘আলিমগণ যারা তাঁদের রেখে যাওয়া আদর্শের অনুসরণ এবং অনুকরন করতেন ছিলেন একই রকম । তারা মানুষকে উত্তম কিছু শিক্ষা দেবার সুযোগ কখনও হাতছাড়া করতেন না। তাদেরকে আল্লাহর পথে ডাকতেন। সুন্দর ও মনোরম আচরণের মাধ্যমে তারা মানুষের হৃদয় কে জয় করে নিতেন। এরপর তাদেরকে দিতেন উত্তম দিকনির্দেশনা।

কোন এক কবি যথার্থই বলেছেন,

“উত্তম আচরণ কর এবং লোকে তোমার বশীভুত হবে,

প্রায়শই সদাচার বশে এনে থাকে”

১. সহিহ আল বুখারি(৪৯৫৭)।সহিহ মুস্লিম(৩৭৬৭)

কিন্তু মানুষের হৃদয়কে বশে আনা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং তাদের হৃদয় তো শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে বশীভূত হওয়া উচিৎ। যাই হোক না কেন, আমরা এটাই চাই যে ইসলামের কর্মী ও জ্ঞানপিপাসুদের এই বিষয়টা জানা থাকুক দয়ার্দ্রতা এবং সদাচারের মাধ্যমে কিভাবে মানুষের অন্তঃকরনকে স্পর্শ করতে হয়। যাতে করে তারা মানুষের মাঝে সততার বিস্তার ঘটাতে পারে এবং অর্জিত জ্ঞানের উপর আমল করতে পারে। ধর্মীয় জ্ঞানের কিছু হক আছে যা জ্ঞান অন্বেষণকারীর আদায় করতে হয়। যদি সে তা করতে ব্যার্থ হয় তবে তার জ্ঞান বারাকাহ থেকে বঞ্চিত হবে।

জীবনসংগীর/জীবনসংগীনির সাথে আচরণঃ

পিতামাতার পর আপনার সবচেয়ে কাছের ব্যাক্তি হচ্ছে আপনার স্বামী/স্ত্রী। এতদসত্তেও আমরা প্রায়ই ইসলামী জ্ঞানের ছাত্রদের স্ত্রীকে অভিযোগ করতে শুনি যে তার স্বামীর জ্ঞান তার কোন কাজে আসছে না। সে কখনোই তার জীবনসঙ্গীনির সাথে অর্জিত জ্ঞান ভাগাভাগি করে নেয় না। প্রায়শই ছাত্রটির স্ত্রী ধর্মীয় জ্ঞান সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞই থেকে যায়। এমনকি তার স্ত্রী উগ্র পোষাক পরিধান, বেপর্দা হয়ে ঘুরে বেড়ানো কিংবা গানবাজনা শোনার মত নিষিদ্ধ কাজেও লিপ্ত হয়ে থাকে।

বাস্তবতা হল এসমস্ত ছাত্ররা তাদের স্ত্রীর উপর খবরদারি করা ছাড়া চলতেই পারেনা। তারা শুধু খবরদারি করবে, কি করা উচিৎ, কি না করা উচিৎ এসব নিয়ে শাসাতে থাকবে, বিদ্রুপাত্মক স্বরে কথা বলবে। এমনকি স্ত্রীদের তারা মারধোর করতেও দ্বিধাবোধ করেনা এ মনে করে যে, এটাই হচ্ছে শাসনের সঠিক উপায়।

জ্ঞানের এই ছাত্রটি কি কখনও তার স্ত্রীর সাথে বসেছে আল্লাহ ও তার রাসুল কি বলেছেন তা জানাতে? স্ত্রীর অন্তরকে শান্ত করার জন্যে কখনও কি সে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে ? ইসলামে কী বৈধ আর কী অবৈধ তার শিক্ষা কি সে কখনও দিয়েছে? সে কি তার সাথে ভাল ব্যাবহার করে? অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে অধিকাংশ ছাত্রই এসব করতে ব্যর্থ হয়।

নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “অনেক নারী আমার কাছে আসে তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে। সেসমস্ত লোকেরা উত্তম নয়”।২ আর কি করেই বা তারা উত্তম হতে পারে যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বোত্তম যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। এবং তোমাদের সবার চেয়ে আমি আমার পরিবারের কাছে উত্তম”।

তাহলে কেনইবা ধর্মীয় জ্ঞানের একজন ছাত্র তার বন্ধুবান্ধবদের সাথে সহানুভুতিশীল অথচ তার পিতামাতা, ভাইবোন এবং স্ত্রীর সাথে কঠোর এবং রুক্ষ? এটা এমন এক অসামঞ্জস্যতা যা কোনভাবেই সহনীয় বা যুক্তিযুক্ত নয়।