আর-রহমান এবং আর-রহিম আল্লাহর নামে

অধ্যায় ৪ঃ কুরআন-সুন্নাহর ভাসাভাসা অধ্যয়ন

কুরআন-সুন্নাহর অধ্যয়নের জন্য প্রয়োজন মেধা, সততা, অভিজ্ঞতা এবং সর্বোপরি ইসলামিক আইনশাস্ত্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সুগভীর ধারণা। এর জন্য প্রয়োজন আরবি ভাষা এবং এর অনন্য প্রকাশভঙ্গী সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান। যাই হোক না কেন কিছু ছাত্রের এ সমস্ত গুনাবলীর কোনটিই নেই। অধিকন্তু তাদের কারো কারো ইসলামি আইন সম্পর্কে কোন আগ্রহই নেই। শরীয়তের অনিশ্চিত ও একাধিক সম্ভাব্যতার ক্ষেত্রগুলো তারা বুঝে উঠতে পারে না। তাছাড়া সঠিক উৎস থেকে ইসলামী বিধান বের করে আনার মত গভীর অন্তর্দৃষ্টিও তাদের থাকেনা। এই ধরনের লোকদের একটা সাধারণ প্রবণতা হল তারা একটা বই হাতে নিবে এবং তা থেকে মনমত ফতোয়া দেওয়া শুরু করবে। উপরন্তু সে অত্যন্ত একগুঁয়েমীর সাথে এই ফতোয়াগুলো বাস্তবায়ন করতে থাকবে এবং যারা তাদের সাথে একমত হবে না অত্যন্ত অরুচিকর ভাষায় তাদেরকে তিরষ্কার করবে।

এখানে অত্যন্ত গভীরভাবে সম্পর্কিত দুটি সমস্যা দেখা যাচ্ছে। যার একটি হচ্ছে উৎসসমূহের (Texts) মাত্রাতিরিক্ত শাব্দিক অধ্যয়ন। অন্যটি হচ্ছে কোন একটি বিষয়ে অধ্যয়নের পর তা থেকে অতি দ্রুত সিদ্ধান্তে আসার প্রবণতা। চলুন, এ সম্পর্কিত কিছু দৃষ্টান্ত দেখা যাকঃ

উৎসসমূহের মাত্রাতিরিক্ত শাব্দিক অধ্যয়ন

প্রথম দৃষ্টান্তঃ

 ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়ের কথাই চিন্তা করুন। নাবি ﷺ বলেছেনঃ “কারো মাঝে যদি ৪ টি বৈশিষ্ট দেখা যায় তবে সে একজন মুনাফিক্ব এবং যার মাঝে এ ৪ টির কোন একটি দেখা যায় তবে তার মাঝে মুনাফিক্বি রয়েছে যতক্ষণ না সে এটা ত্যাগ করছে। বৈশিষ্ট্য গুলো হচ্ছেঃ যদি তার কাছে আমানত রাখা হয়, সে তার খিয়ানত করে। যখন সে বলে, মিথ্যা বলে। যখন সে কোন ওয়াদা করে তবে তা ভঙ্গ করে। বাদানুবাদে লিপ্ত হলে সে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করে।” [৪.সহিহ বুখারি(৩৩,২২৭৯), সহিহ মুসলিম (৮৮)]

কিছু ব্যক্তি শুধু এই হাদিসের কথাগুলো হুবহু গ্রহণ করে এবং মুনাফিক্বি সম্পর্কিত অন্যান্য যাবতীয় বর্ণনা কে উপেক্ষা করে। ফলস্বরুপ তারা বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হয়। কোন একবার একজন এতদূর গিয়েছিল যে সে এমনকি এই হাদীসে বর্ণিত নিফাক্বকে “কুফর” হিসেবে আখ্যা দেয়। এবং এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে যে ব্যাক্তিই খিয়ানত করবে, ওয়াদা ভাঙ্গবে, মিথ্যা বলবে এবং পারস্পরিক বাদানুবাদে গর্হিত আচরণ করবে সে কাফির হয়ে গেল !!! এ ঘোষণার মাধ্যমে এ ব্যক্তি কুরআন সুন্নাহ’র শতশত বর্ণনা কে অস্বীকার করল যেখান থেকে আমরা জানি যে শুধুমাত্র একটি গুনাহের কারনেই একজন বান্দা কাফির হয়ে যায় না। এটি ইসলামে বিশ্বাসের একটি মূলনীতি। আত-তাহাওয়ি ইসলামি বিশ্বাস সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ এক আলোচনায় বলেন, “মুহাম্মাদ ﷺ এর অনুসারীর মধ্যে যারা গর্হিত অপরাধ করেছে এবং তাওবাহ করা ছাড়াই মৃত্যুবরণ করেছে তারাও জাহান্নামের আগুনে চিরকাল থাকবে না যদি তারা তাওহীদের(একত্ববাদ) উপর মৃত্যুবরণ করে এবং আল্লাহকে জেনে থাকে।” মূলধারার মুসলমানদের সবাই এ ব্যাপারটিতে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। এ ব্যাপারটি আমাদের আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিচ্ছে যে কোন নির্দিষ্ট উৎসের ভাসাভাসা অধ্যয়ন ও অন্যান্য উৎসকে উপেক্ষা করার মধ্যে কী বিপদ নিহিত আছে।

দ্বিতীয় দৃষ্টান্তঃ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ “বায়ু নিঃসরণের শব্দ না শুনলে বা নিঃসরণের ব্যাপারটি অনুভূত না হলে কোন অযু করার দরকার নেই।” [মুসনাদ আহমাদ(৯৭১২).সুনান আত-তিরমিযি(৬৯),সুনান ইবন মাজাহ(৫০৮)]

 আমরা যদি কেবলমাত্র এই হাদিসটির কথাটিই গ্রহণ করতাম তবে কাওকেই এই হাদীসে বর্ণিত বিশেষ অবস্থার উদ্রেক ব্যতীত অযু করতে হতনা। এটি শুধুমাত্র হাদিসের শাব্দিক অর্থ। কিন্তু আসলেও কি এই অর্থই করা হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়ঃ অবশ্যই না! যে ব্যক্তি সালাত আদায় করতে চায় তাকে অবশ্যই বাথরুমে গমনের পর, ঘুম থেকে জাগরণের পর এবং অযু ভংগ সংক্রান্ত অন্যান্য কারনের জন্যে নতুন করে অযু করতে হবে। এভাবেই কোন ব্যাক্তি যদি উপরে বর্ণিত হাদিসটির শুধুমাত্র শাব্দিক অর্থকে তার জ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে নিত তবে সে ঐ ধরনের ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হত।

একারনেই জ্ঞানীগন কোন বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবার আগে সে সংক্রান্ত যাবতীয় আয়াত ও হাদীসকে একত্রিত করবার উপর জোর দিয়েছেন। ইমাম আহমাদ বলেনঃ “আমরা যদি একটি স্বতন্ত্র হাদীসকে সত্তরটি ভিন্ন উপায়ে না পেতাম তবে কখনোই আমরা তা বুঝতে পারতাম না।” তিনি এখানে শুধুমাত্র একটি হাদীসের বর্ণনার পরম্পরার ক্ষেত্রে ভিন্নতার কথাই বলেন নি বরং একটি স্বতন্ত্র বিষয়ে বিদ্যমান অসংখ্য হাদীসের কথাও বলেছেন।

তৃতীয় দৃষ্টান্তঃ

 রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন; “স্থির পানিতে কারোর মূত্রত্যাগ করা এবং তাতে গোসল করা ঠিক নয়।” [সহিহ আল বুখারি(২৩২),সহইহ আল মুসলিম (৪২৪)] পূর্বেকার স্কলারদের মধ্যে যারা শাব্দিক অর্থকে প্রাধান্য দিতেন তাদের কেউ কেউ বাখ্যা দিয়েছেন যে, যদি কেউ কোন পাত্রে মুত্রত্যাগ করে তা পানিতে ফেলে দেয় তাহলে সেই পানিতে গোসল করতে কোন সমস্যা নেই, যেহেতু হাদীসের নিষেধাজ্ঞা শুধু সরাসরি মুত্রত্যাগ এর ব্যাপারে। [এই মত এবং এর বিরোধিতা সম্পর্কে ইবনু হাজমের বাখ্যা পড়তে পারেন, আল মুহাল্লা(১/১৬৬) এবং আল-নাওয়াউই, আল মাজমু’(১/১১৮)]

চরম একগুঁয়ে আক্ষরিকতার এ এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অথচ উপরোক্ত হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর উদ্দেশ্য একদম পরিষ্কার।

দ্রুত সিদ্ধান্তে আসার প্রবণতাঃ

মূল উৎসসমূহ ঘেঁটে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ার প্রবণতা যেসব সমস্যা সৃষ্টি করে এবার আমরা সেগুলো দেখব। সত্যি বলতে এ পর্যায়ে আমরা এমন কিছু বিষয়ে আলোচনা করব যা নিয়ে স্কলারদের মাঝে ইখতিলাফ (মতভেদ) রয়েছে। কোন নির্দিষ্ট মতকে সমর্থন দেওয়া এখানে আমাদের উদ্দেশ্য নয় বরং আমরা চাই ইসলামি জ্ঞানের মৌলিক পবিত্র উৎসগুলো নিয়ে কাজ করার সময় নিয়মানুবর্তিতা এবং সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা যেন সকলের বুঝে আসে।

প্রথম দৃষ্টান্তঃ

অসংখ্য হাদীস রয়েছে যেখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ “যার অযু নাই তার জন্যে কোন সালাত নাই এবং তার কোন অযু নেই যে এটি করার সময় আল্লাহর নাম নেয়নি। [৮.মুসনাদ আহমাদ(৯০৫০,১৬০৫৪,২২১৫২,২৫৮৯৪,২৫৮৯৬),সুনান আবি দাউদ(৯২),ইবন মাজাহ(৩৯২,৩৯৩,৩৯৪)]অসংখ্য স্কলার এই হাদীসকে সহীহ হিসেবে সত্যায়ন করেছেন। কিছু স্কলার এথেকে এ সিদ্ধান্তে এসেছেন যে অযু তখনই গ্রহণযোগ্য যখন এর পূর্বে আল্লাহর নাম নেয়া হবে। এটি হচ্ছে ইসহাক বিন রাহাওয়াইহ, ইমাম আহমাদ এর একটি মত এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হাদীস স্কলারের মতামত।

এখন, এই মতের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়ে আলোচনার কোন ইচ্ছা আমার নেই কিন্তু আমি এই মতকে প্রমাণ করতে ব্যাবহৃত সহায়ক মতামত গুলো দেখিয়ে দিতে চাই।

ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী সহ অধিকাংশ স্কলারদের মত হচ্ছে অযু করার পূর্বে আল্লাহর নাম নেয়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ; আবশ্যিক নয়। এটি ইমাম আহমদ এর অপর একটি মত এবং ইবনে তাইমিয়া সহ পরবর্তী স্কলারদের অনেকেরই মত এটি। তাছাড়া সমসাময়িক ইসলামি আইনজ্ঞদেরও একই মত।

তাহলে কি আমরা এই ধারণা করব যে এই সমস্ত প্রখ্যাত স্কলারগণ হাদীসটিকে দেয়ালে ছুড়ে মেরেছেন যেমনটি কিছু উদ্ধত ছাত্র কটাক্ষের সুরে বলতে চায়?

সত্য ঘটনা হচ্ছে অল্প কিছু প্রাচীন স্কলার হাদীসটিকে নির্ভরযোগ্য বলে বিশ্বাস করতেন না। তবে তাদের অধিকাংশ যদিও একে সহীহ বলেই বিশ্বাস করতেন, কিন্তু তাদের কাছে শব্দাবলীর (যার অযু নাই তার জন্যে কোন সালাত নাই এবং তার কোন অযু নেই যে এটি করার সময় আল্লাহর নাম নেয়নি) কিছু ভিন্ন ব্যাখ্যা ছিল। তারা হাদীসটির শব্দাবলিকে এভাবে নেয়নি যে এর অর্থ দাড়ায় আল্লাহর নাম গ্রহণ ব্যাতীত অযু সম্পূর্ণরুপে বাতিল বরং তাদের মত হচ্ছে এই ধরনের অযু উত্তম উপায়ে করা হলনা। তাদের মতের সপক্ষে প্রচুর দলিল রয়েছে।

প্রথমত, সুনান আবু দাউদ এ শক্তিশালি সনদে বর্ণিত একটি হাদীস রয়েছে যেখানে একজন লোক নাবি ﷺ এর কাছে আসলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন যে কিভাবে পবিত্রতা অর্জন করতে হয়। তাই নাবি ﷺ পানি নিয়ে আসতে বললেন এবং নিজেই অযু করে দেখিয়ে দিলেন। তিনি তাঁর হাতগুলো ৩ বার ধৌত করলেন,একবার মুখমন্ডল ধৌত করলেন, মাথা মাসেহ করলেন, এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে কান মাসেহ করলেন এবং পরিশেষে ৩ বার পা ধৌত করলেন। তারপর তিনি বললেনঃ “এভাবেই অযু করতে হয়। যে এরসাথে নতুন কিছু যোগ করল বা এ থেকে কিছু ছেড়ে দিল সে ভুল পন্থা অনুসরণ করল।” [৯.সুনান আবি দাউদ(১১৬)]

 যে লোকটি প্রশ্ন করেছিল সে ছিল একজন বেদুইন আরব যার অযু সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিলনা। সুতরাং, যেহেতু নাবি তাঁকে আল্লাহর নাম নেয়ার ব্যাপারটি সম্পর্কে শিক্ষা দেননি সেহেতু আমরা ধরে নিতে পারি যে এটা সবসময় করা বাধ্যতামূলক নয়।

এ ব্যাপারে দ্বিতীয় আরেকটি প্রমাণ এই যে কমপক্ষে ২২ জন সাহাবি রাসূলুল্লাহ  এর অযু সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন এবং তাদের কেউই আল্লাহর নাম নেওয়ার ব্যাপারটি বলেন নি।

স্কলারদের পক্ষে থেকে আরকটি যুক্তি হচ্ছে অযুর পরিবর্তে তাহারাতের গোসলও করা যায় এবং কোথাও বলা নেই যে এ ধরনের গোসল এর আগে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে হবে। ফলে স্কলাররা আসলে ধরে নেন যে তাহারাতের গোসল এর পূর্বে আল্লাহর নাম নেয়াকেই জোর দেয়া উচিৎ যেহেতু সাধারণ অযু এই ধরনের গোসলের একটা অংশ।

চতুর্থ আরেকটি প্রমাণ এই যে পবিত্র আল কুরআনে যেখানে অযুর ব্যাপারে বলা হয়েছে সেখানে আল্লাহর নাম নেবার ব্যাপারটি বলা হয়নি। আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা সালাতের জন্যে প্রস্তুতি নাও, তোমাদের মুখমন্ডল এবং কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর। পানি দ্বারা তোমাদের মাথা মাসেহ কর এবং গোড়ালি পর্যন্ত পা ধৌত কর।” (সুরা আল মায়িদাহঃ ৬)

এ যুক্তিসমূহ আমাদের দেখিয়ে দেয় যে অধিকাংশ স্কলারদের মতামত শুধুমাত্র ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে একটি হাদিস উপেক্ষার প্রমাণ হতে পারেনা যেমনটি কিছু তাড়াহুড়াপ্রবণ শিক্ষানবীশদের অভ্যাসগত ধারণায় পরিণত হয়েছে। বরং সত্য হচ্ছে এই যে এ মতামতের ভিত্তি হচ্ছে বিশুদ্ধ আইনগত নীতিমালা এবং ধর্মীয় জ্ঞানের মূল উৎসের ব্যাপারে গভীর ধারনা যা অন্য উৎসসমুহ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

দ্বিতীয় দৃষ্টান্তঃ

 নাবি  বলেনঃ “যখন তোমদের মধ্য হতে কেউ ঘুম থেকে জাগ্রত হয় তবে তার উচিৎ নয় পাত্রে রাখা পানিতে হাত দেয়া যতক্ষণ না সে সেগুলো ৩ বার ধৌত করে নেয়। কারন সে জানেনা ঘুমের ঘোরে তার হাত কি কি স্পর্শ করে থাকতে পারে।” [সহিহ আল বুখারি,সহিহ মুসলিম (৪১৬)]

 পূর্বেকার কিছু স্কলার এ হাদীস থেকে এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে ঘুম থেকে উঠে কোন পানির গামলায় হাত দেবার আগে সেগুলো ধৌত করে নেয়া আবশ্যিক এবং এর অন্যথা করা নিষেধ। এই ব্যাপারটিতে এটি ইমাম আহমাদ এরও অন্যতম একটি মত। সমসাময়িক কিছু স্কলারগণও এই মত ব্যাক্ত করেছেন।

পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানিফা, মালিক, শাফেয়ি ও আহমাদ (তার অন্য একটি মতে) সহ অধিকাংশ স্কলার এর মতে এমনটি করা উত্তম ও অগ্রাধিকারযোগ্য। তাহলে আমরা কি ধারণা করব যে এ সমস্ত বিখ্যাত আলেমগণ হাদীসটিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন অথবা তাঁরা নাবি ﷺ এর আদেশের ব্যাপারে পরোয়া করেননি? অথচ কিছু অতি উৎসাহী তলিবুল ‘ইলম আজকাল তাদের ব্যাপারে এ সমস্ত মন্তব্য করছে।

এই স্কলারগণ এসমস্ত অভিযোগের অনেক উর্ধ্বে। তাঁরা শুধুমাত্র কিছু সংখ্যক ভিন্ন বর্ণনার আশ্রয় নিয়েছেন যেগুলো আমাদের দেখিয়ে দেয় যে উপরোক্ত হাদীসের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কাজটিকে অগ্রাধিকারযোগ্য করা; ফরজ নয়। চলুন দেখা যাকঃ

প্রথমত, রাসুলের  আদেশের পেছনে একটি কারণ আছে যেথায় তিনি বলেন, “……কারন সে জানেনা ঘুমের ঘোরে তার হাত কি কি স্পর্শ করে থাকতে পারে”। এখন, অপবিত্রতার ব্যাপারে ইসলামি আইনের অবস্থান হচ্ছে যদি না আপনি নিশ্চিত থাকেন যে কোন কিছুর মধ্যে অপবিত্রতা আছে, আপনি তা ধৌত করার জন্যে বাধ্য নন। সন্দেহ কখনোই অযু ফরজ হবার জন্যে যথেষ্ট নয়। সুতরাং শুধুমাত্র নাবি  এর হাদীসে বর্ণিত কারনে কোন ব্যাক্তির ঘুম থেকে জাগরণের পর তার হাত ধৌত করা তার জন্যে বাধ্যতামূলক নয়। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে উপরোক্ত হাদীসে বর্ণিত হাত ধৌতকরণের আদেশটির মাধ্যমে কেবলমাত্র একটি অগ্রাধিকারযোগ্য কাজকে উৎসাহিত করা হয়েছে।

তাছাড়া এখানে যে বাধ্যবাধকতার বিষয়টি আসেনি তার অন্যতম নির্দেশক হচ্ছে নাবি  এখানে ৩ বার হাত ধৌত করার কথা বলেছেন। ইসলামি আইন অনুসারে, একবারেই যদি অপবিত্রতা দূর করা যায় তবে একবার ধৌত করাই যথেষ্ট।

তৃতীয় একটি দলীল হচ্ছে একটি সহীহ হাদীস যেখানে বলা হয়েছে, “যখন তোমাদের মধ্যে কেউ ঘুম থেকে জাগ্রত হয় তবে সে যেন পানি দিয়ে তার তার নাক ৩ বার ধৌত করে নেয় কেননা শয়তান তার নাসিকারন্ধ্রে রাত্রিযাপন করে থাকে।” [সহিহ আল বুখারি(৩০৫২)] ইবনে হাজম লিপিবদ্ধ করেন যে এ ব্যাপারে সকল আলিমের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে নাসিকা ধৌত করা বাধ্যতামূলক নয়।

সুতরাং প্রত্যেকটি বিষয়ই এ কথাতেই সহমত পোষণ করছে যে আলোচ্য হাদীসটিতে “ঘুম থেকে জাগরণের পর হাত ধৌত করা” সংক্রান্ত বিষয়টিকে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং এটি বাধ্যতামূলক নয়।

একটি কথা আবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে এসমস্ত কথা আমি একটি মতকে অন্য মতের উপর প্রতিষ্ঠার জন্যে বলছি না। এসমস্ত মতামতের সাথে সহমত বা দ্বিমত করার পূর্ণাংঙ্গ অধিকার আপনার আছে। কেউ এটা বলতেই পারে যে, অযু করার পূর্বে আল্লাহর নাম নেয়া বাধ্যতামূলক বা ঘুম থেকে জাগরণের পর হাত ধোয়াও বাধ্যতামূলক। এতে কোন সমস্যা নেই । এ সমস্ত বিষয়ের অবতারণা করার পেছনে আমার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা দেখিয়ে দেয়া যে জ্ঞানের উৎসসমূহ নিয়ে নাড়াচাড়ার সময় অসংখ্য যুক্তি প্রমাণ এবং দৃষ্টিকোণ নিয়ে কাজ করতে কতটা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রয়োজন। কোন নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে গবেষণার সময় সে বিষয়ে পূর্বেকার স্কলারদের পর্যালোচনাগুলো নিয়ে আসার গুরুত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করাও আমার উদ্দেশ্য ছিল। কারণ এটি একজন ছাত্রকে এ সুযোগ টা করে দেয় যে সে নিজ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে কোন একটি মতের অনুসারি হবে এবং তাড়াহুড়ো করে একটি উৎস অধ্যয়ন করে কোন সিদ্ধান্তে আসবে না। অতঃপর, এসমস্ত বিষয়ে আপনার অবস্থান যাই হোক না কেন তা গ্রহনযোগ্য হবে কেননা পূর্ববর্তী ‘আলীমগনের মাঝে সবগুলো মতামত গ্রহণকারীর দৃষ্টান্তই বিদ্যমান।

যাহিরি (আক্ষরিক) মতবাদের পর্যালোচনা

এ পর্যায়ে বিখ্যাত যাহিরি ‘আলীম ইবন হাজমের* উপর আলোচনা করা যেতে পারে। কোন সন্দেহ নেই যে তিনি একজন বিখ্যাত আইনজ্ঞ এবং তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কাজ আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন হচ্ছে তাঁর বিখ্যাত আইনকোষ যা ‘আল মুহাল্লা’ নামে খ্যাত। অসংখ্য সূক্ষ্য ও তাত্ত্বিক আলোচনা সমৃদ্ধ এ গ্রন্থটি আইনের উপর এক সারগর্ভ আলোচনা। তবে যাই হোক না কেন এ বিখ্যাত কর্মটিও নিজস্ব ভুল ও দোষে দুষ্ট। এ ধরনের সব গ্রন্থই এ থেকে মুক্ত নয়।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এ জায়গায় যে কিছু ছাত্র ‘আল মুহাল্লা’ পড়ে ইবন হাজমের অন্ধভক্ত হয়ে যায়। ইবনে হাজমের লেখালেখির একটা ইতিবাচক স্টাইল আছে; বিশেষত কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে তাঁর বিরোধীদের বিরোধীতা করার বেলায় উনি খুবই সিদ্ধহস্ত। তাঁর বিশেষত্ব হচ্ছে তিনি এটি দেখিয়ে দেন যে তাঁর বিরোধীরা কিভাবে স্ববিরোধীতায় লিপ্ত। কিছু ছাত্র এ বিশেষ স্টাইল দ্বারা অতিমাত্রায় প্রভাবিত হয়ে যায় এবং এতটাই বিমোহিত হয় যে সকল বিষয়ে তাঁর মতামতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেয় এবং তারা এটা বিবেচনা করার প্রয়োজন বোধ করেনা যে তাঁর মতামত অধিকাংশ স্কলার এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা। তাঁর সবচেয়ে উদ্ভট মতামতকেও তারা মেনে নেয়।

কিন্তু এ ধরনের আচরন সুস্পষ্ট বিভ্রান্তি। একারণে আমি মনে করি যে একজন নতুন ছাত্রের ‘আল মুহাল্লা’ পড়া উচিৎ নয়। বরং তাদের সেসমস্ত বই দিয়ে শুরু করা উচিৎ যেগুলো সমস্যাবলীর সমাধানে অধিক ভারসাম্যপূর্ণ এবং অপেক্ষাকৃত কম বিতর্কিত। এ পদ্ধতিতে একজন ছাত্রের মাঝে একটি উদার দৃষ্টিভঙ্গী বিকশিত হবে এবং তারা সমস্যাবলী নিয়ে আলোচনার সঠিক পন্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হবে। এক্ষেত্রে আমার সুপারিশ হচ্ছে ইবনে আব্দিল বার, ইবন আল মুনযির, ইবনে কুদামা, ইবনে তাইমিয়াহ প্রমুখ স্কলারদের কাজগুলো অধ্যয়ন করা। এভাবে ছাত্রটি পরবর্তীতে তার পছন্দের যেকোন বই পড়ার জন্য প্রস্তুত হবে।

*তিনি চারটি সুন্নত জামাত ত্যাগ করেন এবং দাউদ আল যাহেরী প্রতিষ্ঠিত মাযহাবের অনুসরণ করেন। এই মাযহাব অনুসারে শাব্দিক অর্থের প্রেক্ষিতে কোরআনের ব্যাখ্যা করা উচিত। ইবনে হাজমের মতে অন্যের ব্যাখ্যা অনুসরণ না করে প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজের সাধ্যানুসারে কোরানের মর্মার্থ বাহির করা।তিনি আশারিয়াদের মুখালাফা মতবাদ গ্রহণ করেন। যেখানে বলা হয় মানবীয় গুণাবলী খোদার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। খোদার গুণাবলী মানবীয় গুণ হতে সম্পূর্ণ পৃথকভাবে গ্রহণ করতে হবে। নীতিবোধের ক্ষেত্রে ইবনে হাজম মনে করেন সত্যমিথ্যান্যায়অন্যায়ের বিচারের জন্য কোন বস্তুনিষ্ট আদর্শ নেই। এটি আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। এর একমাত্র মানদণ্ড হলো ওহি।