আর-রহমান এবং আর-রহিম আল্লাহর নামে

অধ্যায় ৫: নতুনত্বের আকাঙ্ক্ষা

যে কোন কিছুতে নতুনত্ব মানুষকে উদ্দীপ্ত করে তোলে। যখন কেউ স্বাভাবিক এবং নীরস কিছু শোনে তখন সে স্বাভাবিকভাবেই কম গুরুত্ব দিয়ে থাকে কিন্তু কোন নতুন এবং অদ্ভুত জিনিষ শোনার পর সে তাতে অখন্ড মনোনিবেশ করে। একটি ব্যাস্ত রাস্তার পাশে হেঁটে যাওয়া কোন পথচারি নিরন্তর গতিশীল যানবাহনগুলো নিয়ে কখনোই এতটা মাথা ঘামায় না। কিন্তু যদি কোন বিদঘুটে গাড়ি তার পাশ দিয়ে চলে যায় বা কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনা যদি ঘটেই যায় তবে অন্য দশজনের সাথে তাল মিলিয়ে সেও দেখতে চায়।

পড়াশোনা এবং জ্ঞানঅন্বেষণেও এরকমটা হয়ে থাকে। প্রচুর ছাত্রকে দেখা যায় যে তারা উদ্ভট কিছু বিষয়ে জ্ঞান রাখে এবং এমন সব বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করে যেগুলো অধিক বিভ্রান্তিময়। আমরা ইতোমধ্যেই আলোচনা করেছি কিভাবে কিছু ছাত্র গুটিকয়েক নির্দিষ্ট বিষয়েই বিতর্কে পারদর্শীতা অর্জন করেছে এবং কিভাবে তারা কথায় কথায় অমুক অমুক স্কলারের উদ্ধৃতি দেয়। অথচ এই একই ছাত্রকে দেখা যায় যে সে ঐ সমস্ত বিষয়ে কোন জ্ঞানই রাখেনা যেসবের ব্যাপারে সকল স্কলার একমত।

একই ভাবে নতুন এবং উদ্ভট কিছু বিষয়ে কিছু ছাত্রের মাঝে নিদারুণ আগ্রহ দেখা যায়। এরকম কোন ছাত্র যদি এমন কোন মতামত পায় যেটি গতানুগতিকের বাহিরে তবে সে এটি শক্তভাবে গ্রহণ করে এবং এরপক্ষে সাফাই গাওয়া শুরু করে। নতুনত্বের প্রতি আগ্রহ এবং সবার থেকে ভিন্ন থাকার প্রবৃত্তি থেকেই সে এমনটি করে থাকে।

একারণে এ ব্যাপারে জোর দিয়ে বলা গুরুত্বপূর্ণ যে অধিকাংশ স্কলারের মতামত সচরাচর সঠিক হলেও সর্বদা তা সবচেয়ে সঠিক নাও হতে পারে। কেননা যখন স্কলারগণ কোন বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন এবং দুই একজন ভিন্নমত পোষণকারী থাকে সেক্ষেত্রে ঐক্যমতের পেছনে অবশ্যই কিছু কারণ থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা সঠিকতার মাপকাঠি না হলেও কোন নতুন এবং ভিন্নমত পোষণ করার পূর্বে আমাদের যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করার অভ্যাস থাকা উচিৎ।

নতুন আনীত মতামতের এমনি একটি হচ্ছে এই যে নারীদের স্বর্ণের রিং পরিধান নিষেধ। এরকম আরেকটি প্রচলিত ধারা বর্জিত মত হচ্ছে একজন হাজী শুধুমাত্র “তামাত্তু” পদ্ধতিতে হাজ্জ্ব করতে পারবে। আমরা যদি খুঁজতে চাই যে ইসলামের শুরু থেকে এ যাবত কতসংখ্যক ব্যাক্তি এমন মতামত দিয়েছেন তবে আমরা তা এক হাতের আঙ্গুলে গুনেই শেষ করতে পারব। অনেকসময় আবার আমরা এ ব্যাপারেও নিশ্চিত নই যে এসমস্ত মতামতকে যাদের মত হিসেবে সাব্যস্ত করা হচ্ছে আদৌ সেগুলো তাদের মতামত কিনা।

তাহলে কেন আমরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন ছাত্রদের এমন মতামত গ্রহণ করতে দেখি? একটি কারণ এ হতে পারে যে তাদের নিবিড় তত্ত্বানুসন্ধানের ক্ষুধা এখনো গড়ে উঠেনি এবং তারা ঐসমস্ত মতামতের যুক্তিগুলো দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। আবার মাঝেমধ্যে এটি শুধুই নতুনত্ব ও গতানুগতিকের বাইরে হওয়ার কারণেই হয়ে থাকে। অধিকাংশ স্কলারের মতের বাইরে যাবার আগে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকা উচিৎ। আর এমনটি তখনই করা উচিৎ যখন আমাদের নিকট দ্ব্যর্থহীন এবং সুস্পষ্ট প্রমাণাদি থাকবে।

অধ্যায় ৬ঃ কোন বিশেষ আলেমের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হওয়া

যেসব ছাত্র কোন শায়খের অধীনে পড়াশোনা করে তাদের মাঝে সাধারণত এই ধরণের পক্ষপাতদুষ্টতা দেখা যায়। যদি সেই শায়খ হাদীস বিশেষজ্ঞ হয়ে থাকেন তবে ছাত্রটিকে কোন নির্দিষ্ট হাদীসের ক্ষেত্রে তার মতামতকেই প্রাধান্য দিতে দেখা যায়। যদি শায়খ ইসলামি আইনজ্ঞ হয়ে থাকেন তবে তার সিদ্ধান্তসমূহকেই ছাত্রটি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ছাত্রটি তার শায়খের মতামতকে জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠাকল্পে প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালায়।

এইধরণের পক্ষপাতদুষ্টতা একটি পুরনো রোগ। এটি অজ্ঞতাকে তার শিকার বানায়। সত্যিকার ‘আলীমগণ এই ধরনের পক্ষপাতের নিন্দা করেন এবং এর বিরুদ্ধে সতর্ক করে দেন। যে ব্যাক্তির জ্ঞানে গভীর গাঁথুনি রয়েছে পক্ষপাতদুষ্টতা তাকে গ্রাস করতে পারেনা। যখন তার শায়খের মতামত সুস্পষ্ট প্রমাণাদির বিপক্ষে চলে যায় তখন এ মতের প্রচার প্রসারকে সে শায়খের প্রতি অকল্যাণ হিসেবে দেখে থাকে।

একজন প্রকৃত ত্বলিবুল ইলম কখনও নিজেকে একজন শায়খের অধীনে সীমাবদ্ধ রাখেনা এবং এমনটি মনে করে বসে থাকেনা যে তিনিই সর্বেসর্বা। কারণ এটিই হচ্ছে পক্ষাপাতিত্বের মুল কারণ। এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ যে একজন ছাত্র বহু মতামত সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকবে। কেননা প্রত্যেক শায়খেরই নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও কিছু শক্ত দলীল রয়েছে। সুতরাং ছাত্রদের উচিৎ শুধুমাত্র একজন শায়খের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অনেকের কাছ থেকে যত উত্তম রয়েছে সব হাসিলের চেষ্টা করা।

এটি খুবই অদ্ভুত লাগে যে একজন ছাত্র যে কিনা বর্তমানের কোন ‘আলীমের মতামতের প্রতি দুর্বল সে এমন একজন ব্যাক্তিকে দেখে বিরক্তিবোধ করে যে পূর্ববর্তী কোন ‘আলীমের মতের প্রতি দূর্বল। সে নিজেই যেখানে সমসাময়িক ‘আলীমের প্রতি পুরোপুরি আসক্ত সেখানে সে অন্যদের এ বলে উপহাস করে “গোঁড়া হানাফি”, “পক্ষপাতদুষ্ট হাম্বালি”।

কিন্তু সত্য হচ্ছে এই যে আপনি যদি কোন নির্দিষ্ট ‘আলীমের পক্ষ নিতে চানই বা তার অনুরক্ত থাকতে চানই তবে পূর্ববর্তী কোন ‘আলীমের প্রতি অনুরক্ত থাকাই অধিকতর উত্তম। কেননা পূর্ব্বর্তী প্রজন্মের ‘আলীমগণ হচ্ছে এমন সম্প্রদায় যাদের জ্ঞান  সত্যায়িত। তাদের মতামত সুস্পষ্ট, স্বীকৃত এবং গ্রহণযোগ্য।  কিন্তু যারা জীবিত রয়েছেন তারা এখনোও প্রবৃত্তি ও প্রলোভনের শিকার হতে পারেন।

তবে যেকোন বিষয়েই পক্ষপাতিত্ব এমন এক বিষয় যার অনুমোদন আমরা দিয়ে থাকিনা। অন্ধ অনুকরণও সঠিক পন্থা নয়, হোক তা মৃত বা জীবিত ব্যাক্তির। কুরআন ও সুন্নাহ’র অনুসরণে একজনের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো উচিৎ। এই দুই উৎসের অনুসরণ করে এমন ‘আলীমগণের কাছ থেকে তার ইলম গ্রহণ করা উচিৎ। যখন সে তাদের কাছ থেকে কোন মতামত গ্রহণ করে তখন তাকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট প্রমাণাদিও নিয়ে নেওয়া উচিৎ।