আর রহমান এবং আর-রহিম আল্লাহর নামে

অধ্যায় ৭ঃ করণীয় আমল নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকা

ইসলামের বিধান অনুসারে প্রয়োজনীয় ‘আমল করতে গিয়ে মানুষ নানাভাবে বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হয়।

১। বৈধতা যাচাই না করেই মুস্তাহাব ‘আমল শুরু করাঃ

কিছু ছাত্রকে দেখা যায় কোন আমলের কথা শোনার সাথে সাথেই তা কতটুকু সহীহ তা যাচাই না করেই সেই ‘আমলটি করা শুরু করে দেয়। একবার আমি এক যুবককে মাথায় পাগড়ি জড়ানো অবস্থায় হেঁটে যেতে দেখলাম। আমাদের দেশে, অর্থাৎ সৌদি আরবে ঐ ধরণের পাগড়ি ছিল খুবই অদ্ভূত। ফলে তার পোশাকটিকে সন্দেহজনক ও উদ্ভট মনে হচ্ছিল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কেন আমাদের প্রচলিত প্রথা বহির্ভূত এই ধরণের পাগড়ি পরেছ?”

সে উত্তরে বলল, “কারণ নাবি ﷺ এমনটি করতেন”। এরপর সে পাগড়ির ফজিলত নিয়ে কিছু মনগড়া ও বানোয়াট হাদীস বলল যার একটি হল-“এটি ফেরেশতাদের পোশাক”। কিন্তু প্রকৃত সত্য এই যে একটি মাত্র সহীহ হাদিসও পাওয়া যায়নি যেখানে পাগড়ির ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে।

এমন আরেকটি ‘আমলের উদাহরণ হচ্ছে গোঁফ কেটে ফেলা। কোন কোন ছাত্র এটি করে থাকে কিছু হাদীস অধ্যয়নের ভিত্তিতে এবং এ ব্যাপারে ‘আলীমদের মতামত কি তার তোয়াক্কা তারা করেনা।

সামান্য ভিন্ন আরেকটি বিষয় দেখা যায় কিছু ছাত্রের মাঝে। সেটা হচ্ছে কোন ব্যক্তি রুমে প্রবেশ করলে দাঁড়িয়ে যাবার ব্যাপারটিকে তিরষ্কার করার একটি প্রবণতা তাদের মাঝে দেখা যায়। তারা অবশ্য এটি করে থাকে সেই হাদীসের ভিত্তিতে যেখানে এমনটি করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে আমি এখন এটি বলছি না যে এই ব্যাপারটিতে মতানৈক্যের কোন সুযোগ নেই। কিন্তু কোন ক্ষমতাবান ব্যাক্তির সম্মানে দাঁড়িয়ে যাওয়ার সাথে একজন ভাইয়ের সাথে হাত মিলানোর জন্যে দাঁড়ানোর মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।

শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বাজ(রাহিমাহুল্লাহ) এ বিষয়ে একজন প্রশ্নকারীকে খুব সুন্দর করে উত্তর দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “এটি সদাচারের একটি দিক। যে পর্যন্ত কাউকে অভিবাদন কিংবা হাত মিলানোর জন্যে দাঁড়ানো একটি দেশীয় বা সামাজিক প্রথা সে পর্যন্ত এটি নিষিদ্ধ নয় বরং সুন্দর আচরণের বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহই সর্বাধিক অবগত”। সুতরাং, কোন কিছুকে সুন্নাহ মনে করে পালন শুরু করার পূর্বেই নিশ্চিত হওয়া দরকার যে এটি আদৌ সুন্নাহ কিনা।

২. সুন্নাহ দ্বারা স্বীকৃত কোন আমলের বাস্তবায়নে বাড়াবাড়ি করাঃ 

 যখন কোন আমল সুন্নাহ দ্বারা স্বীকৃত বলে জানা যাবে তখন অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে তার উপর ‘আমল করতে হবে। বিশেষ করে যখন কোন আমলের সাথে অন্যান্য মানুষ জড়িত থাকে অর্থাৎ জামায়াতের (সামষ্টিক) ‘আমল।

যেমন, জামায়াতের নামাজের পূর্বে কাতার সোজা করার বিষয়টিই ধরুন। আমি লক্ষ্য করেছি যে কিছু যুবক কাতার সোজা করা বলতে মনে করে থাকে যে প্রত্যকেকেই তার উভয়পার্শ্বের ব্যাক্তিদ্বয়ের গোড়ালির সাথে তার গোড়ালি চেপে চেপে রাখতে হবে। এটা সুস্পষ্ট বাড়াবাড়ি এবং নামাজে অন্যান্য মুসুল্লিদের অস্বস্তির কারণ এবং এটা যে ব্যক্তি এমনটি করছে তার সালাতের বিঘ্ন ঘটাবার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমন আচরণ কি আসলেও সুন্নাহ দ্বারা স্বীকৃত? চলুন দলিল প্রমাণ দেখা যাক।

নাবি ﷺ বলেছেন, “তোমাদের উচিৎ কাতার সোজা করা নতুবা আল্লাহ তোমাদের মধ্যে বিভাজনের সৃষ্টি করবেন”।

এই হাদীসের বর্ণনাকারী নু’মান ইবনে বাশীর অতঃপর বলেন, “আমি দেখলাম যে আমাদের একজন তার পাশের জনের গোড়ালির সাথে গোড়ালি এবং কাধের সাথে কাঁধ চেপে দাঁড়াতো।” [সহীহ আল বুখারি(৬৭৬),মুসলিম (৬৫৯,৬৬০)]

আমরা যদি গভীরভাবে হাদীসটি পর্যবেক্ষণ করি তাহলে স্পষ্টই বুঝা যায় যে উপরোক্ত আমলের পদ্ধতিটি সঠিক নয়।

প্রথমত, নাবি ﷺ আমাদেরকে গোঁড়ালি স্পর্শ করার কোন আদেশ দেননি। তিনি শুধু সালাতে কাতার সোজা করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রত্যেকেই যেন অপরের সাথে একই রেখায় অবস্থান করে এবং কেউই যেন এগিয়ে বা পিছিয়ে না পড়ে।

তাছাড়া নুমান(রা) বলেন, ‘আমি দেখেছি যে আমাদের মধ্যে একজন তার পাশের জনের গোঁড়ালির সাথে নিজ গোঁড়ালি চেপে রাখত। বর্ণনাদৃষ্টে এটাই মাথায় আসে যে যার সম্পর্কে বলা হচ্ছে সে এমনটি সালাতের শুরুতে করত এটি নিশ্চিত করতে যে সে অন্যদের সাথে একই সরলরেখায় অবস্থান করে যেহেতু গোঁড়ালির মাধ্যমে ব্যাপারটি সহজেই নির্ধারণ করা সম্ভব। সুতরাং, যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যাক্তি নিশ্চিত যে সে অন্যদের সাথে একই রেখায় আছে তাহলে তার পার্শ্ববর্তী জনের সাথে গোঁড়ালি লাগিয়ে রাখার কোন প্রয়োজন নেই।

তৃতীয় একটি বিষয় হচ্ছে এটি প্রায় অসম্ভব যে পাশের জনের সাথে আপনার গোঁড়ালি সম্পূর্ণ চেপে রাখা। এজন্যে আপনার পা কে প্রসারিত করতে হবে। কাঁধের ক্ষেত্রেও একইরকম। প্রায়ই আপনাকে পাশের জনের দিকে ঝুঁকে পড়তে হতে পারে। আবার যদি আপনি ডানপাশে ঝুঁকে থাকেন তাহলে বামপাশের জনের সাথে আপনার কিছুটা দূরত্বের সৃষ্টি হবে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে হাদীসের আদেশ এ নয় যে আমরা নিজেদের স্থানচ্যুত হয়ে গোঁড়ালি মেশাতে যাব বরং এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কাতারের মাঝে ফাঁক দূর করা এবং যাতে সালাতের সময় আমরা একটি সরলরেখায় থাকি। কিছু লোক এ ব্যাপারে অত্যন্ত বাড়াবাড়ি করে এবং আশেপাশের মুসুল্লীদের বিরক্তি ও অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আরেকটি উদাহরণ হল অনেক ইমামকে দেখবেন যারা সুন্নাত অনুসরণ করার নামে সালাতকে দীর্ঘায়িত করে। তারা হয়ত মাগরিবের সালাতে সূরা আ’রাফ এবং সূরা তূর পড়ে কিছু হাদীসের ভিত্তিতে যেখানে বলা হয়েছে যে রাসূল ﷺ এমনটা করতেন। এর মাধ্যমে ঐ ইমাম মূলত মানুষের উপর বোঝা চাপিয়ে দিল এবং এর ফলে অনেকেই হয়ত আর সালাতে আসতে চাইবে না।

অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে, যেই কাজ নাবি ﷺ কালেভদ্রে করতেন তাকে তিনি নিজের কাজের সাফাই এর জন্যে ব্যাবহার করলেন অথচ নাবি ﷺ এর সেই কথা তার মাথায় আসল না যেখানে তিনি বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ যখন সালাতের ইমামতি করে তবে সে যেন একে দীর্ঘায়িত না করে কারণ মুসুল্লিদের মধ্যে শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ লোকজন থাকে।” আরেকটি বর্ণনায় তিনি আরও বলেন, “অনেকের প্রয়োজনীয় কাজ থাকতে পারে।” [সহিহ আল বুখারি (৮৮,৬৬২), সহিহ মুসলিম (৭১৪,৭১৫,৭১৬)]

আমরা এধরনের লোকদের বলতে চাই, “আপনারা কি রাসুলের ﷺ সুন্নাতের নামে এসব করেন?” মানুষের অবস্থা বিবেচনা করে কাজ করাও সুন্নাহর অন্তর্গত। সালাত দীর্ঘ করাই সুন্নাহর সামগ্রিক দিক নয়। বরং আমাদের অবশ্যই এসব ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা উচিৎ এবং মানুষের প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় রাখা উচিৎ।

৩. কোন কিছুর উপকারিতা এবং অপকারিতার মাত্রা নির্ণয়ে ব্যর্থতাঃ

প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে, “একজন নিজ প্রাসাদ বানায় যখন সে কিনা অপরের প্রাসাদ ধ্বংসে লিপ্ত।” একজন লোক হয়তো সুন্নাহ দ্বারা উৎসাহিত কোন আমল করছে কিন্তু এটি করতে গিয়ে এমনও হয় যে সে কোন একটি ফরজ/ওয়াজিব ইবাদাহকে উপেক্ষা করছে। এমনিভাবে কেউ যদি ইসলামে অপছন্দনীয় কিছু ত্যাগ করতে গিয়ে ইসলামে নিষিদ্ধ কিছু করে বসে তবে তা সুস্পষ্ট ভুল কাজ। ইসলাম বিভাজনকে নিরুৎসাহিত করে। হিংসা বিদ্বেষের লালন কোনক্রমেই এর লক্ষ্য নয়। কেউ হয়তো কোন মুস্তাহাব আমল করতে গিয়ে এমন বাড়াবাড়ি করছে যে লোকজন তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সে হয়তোবা নিজেদের মধ্যে বিদ্বেষের বিকাশ ঘটাচ্ছে। একারোনেই জ্ঞান সাধক গণ বলেন “মানুষের মাঝে ঐক্য জরুরি, হোক না তা কোন সুন্নাহ ত্যাগের মাধ্যমেই।” চলুন কিছু দৃষ্টান্ত দেখে নিই-

প্রথম দৃষ্টান্তঃ

 কোন ব্যক্তি যদি এমন কোন জনগোষ্ঠীর ইমামতির দায়িত্ব পায় যারা তাদের সালাতে তিলাওয়াতের সময় উচ্চস্বরে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” পড়ে তবে তারও উচিৎ সেভাবেই সালাত পড়ানো। তিনি যদি এমনটি না করেন তাহলে হয় তারা তাকে অবজ্ঞা করবে নয়তো তাদের মাঝে মতানৈক্যের সৃষ্টি হবে।  এমনকি এটি মসজিদে বিতর্কের উদ্ভব ঘটাতে পারে। আলেমগণ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে উচ্চস্বরে “বিসমিল্লাহ” তিলাওয়াতে কোন সমস্যা নেই যদি এর দরুণ মসজিদে মানুষের মাঝে ঐক্য বজায় থাকে। তেমনিভাবে কোন ব্যাক্তি যদি এমন জনগোষ্ঠীর কাছে আসে যারা সালাতে জোরে “আমিন” বলেনা তবে তারও একইরকম পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিৎ যদিও বা সে জোরে আমিন বলার পক্ষপাতী হয়ে থাকে।

দ্বিতীয় দৃষ্টান্তঃ

মাঝেমধ্যে রমাদানে তারাবীর সালাতে কত রাকাত পড়া হবে তা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এটা প্রায়ই সমাজে বিভাজন, লম্বা বিতর্ক এবং উত্তপ্ত বাকবিতন্ডার জন্ম দেয়। ব্যাপারটি আসলে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাত কি অনুমোদিত নাকি অগ্রাধিকারযোগ্য এ ছাড়া আর কিছুই না।

তৃতীয় দৃষ্টান্তঃ

কিছু লোক কাপড়ের দৈর্ঘ্য নিয়ে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়। কোন কোন যুবক তাদের কাপড় কে হাঁটু থেকে মাত্র ৪ আঙ্গুল নিচে নামতে দেয়। কেও আবার পায়ের অর্ধেক পর্যন্ত নামিয়ে রাখে। আমি বলছি না যে তারা যা করছে  ভুল করছে। তবে আমি এটা বলব যে তাদের পায়ের কাপড়ের দৈর্ঘ্য এমন হওয়া উচিৎ যে তা টাখনুর নিচেও নামে না আবার এত উপরেও থাকেনা যে মানুষের কাছে তা অদ্ভুত ঠেকে। আর এমনটিই মানুষের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য হবে এবং তাদের মাঝে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে।

৪. মুস্তাহাব আমল না করায় অন্যদের তিরষ্কার করাঃ 

কেউ কেউ মুস্তাহাব কাজগুলোকে এমন গুরুত্ব দেয় যেন তা ফরজ/ওয়াজিব। তারা যদি কাউকে মুস্তাহাব ‘আমল করতে না দেখে তবে তাকে ভর্ৎসনা করে। এমনও তো হতে পারে যে সেগুলো এমন কিছু আমল যার ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। এর সুন্দর একটি উদাহরণ হচ্ছে সজদা দিয়ে উঠে পরবর্তী রাকাত শুরু করার পূর্বে একটু বসে থাকার বিষয়টি। আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে মসজিদে ঢুকেই ২ রাকাত সালাত পড়ার অভ্যাস যখন স্বাভাবিক সালাতগুলোও ইসলামিক আইনানুসারে নিষিদ্ধ। মাঝেমধ্যে এসমস্ত লোকজনের মাঝে যারা তাদের মত করছে না তাদের কটাক্ষ করার একটা প্রবণতা দেখা যায়।

এটি সঠিক নয়। এগুলো কোনভাবেই ইসলামিক আচরণ হতে পারেনা। সময় নষ্টের সুযোগ এখানে নেই। যেসমস্ত বিষয়াদিতে একের অধিক গ্রহণযোগ্য মতামত রয়েছে সেগুলোর পূর্বে আমাদের মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদিতে মন দেওয়া উচিৎ। কোন ব্যক্তি যদি এসমস্ত দ্ব্যর্থক বিষয়ে কোন একটি মতকে গ্রহণ করে তবে সেটিকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবেনা। একগুঁয়েমী এবং অন্যের উপর নিজ মত চাপিয়ে না দিয়ে আমাদের উচিৎ এসব নিয়ে জ্ঞানের ভিত্তিতে আলোচনা করা।