এই সমস্যাটি মেজরিটির: ‘অনেক কাজই উদ্যোগ নিয়ে শুরু করি, কিন্তু ধরে রাখতে পারিনা।’
এই সমস্যাটি দুনিয়াবি কাজের জন্য তো ক্ষতিকর বটেই, দ্বীনি কাজে আরো বেশি। হিসেব মিলিয়ে দেখুন তো, এই আমাদের মধ্যেই দ্বীনি ইল্ম অর্জনের পথে হাটতে শুরু করেছেন কতজন, আর শেষতক পৌছতে পেরেছেন কতজন? অনুপাতটির দুর্দশা কল্পনারও বাইরে। কাজের শুরুটা সবাই আবেগ নিয়ে করলেও মাঝপথে গিয়ে আর মোটিভেশান পান না। আমি বলি- কেউ আপনাকে মোটিভেশান দিয়ে এগিয়ে নেবে, এ চিন্তা করা বোকামি। জগতের সফল মানুষেরা ‘সেল্ফ-মোটিভেইটেড’ ছিলেন, নিজেরাই নিজেদের তাড়িয়ে নিয়েছেন- এরচে সত্য আর নেই।

তো এই কাজটুকু আপনাকেই করতে হবে, তবে মোটিভেইশান ধরে রাখার জন্য আপনাকে কিছু আইডিয়া দিতে পারি, ইনশাআল্লাহ। আজকের লেখায় তেমন দুইটি থিওরি নিয়ে আলোচনা করবো। থিওরি তো থিওরিই, তা কি আর বাস্তবে কাজে লাগানো যায়? উহু, ভুল ধরেছেন। আসলে এগুলো শুরুতে থিওরিও ছিলো, কিন্তু তা বাস্তবে প্রয়োগ করে যখন অসংখ্য মানুষ ইতিবাচক ফল পেতে লাগলো, থিওরিগুলো তখনই সাড়া ফেলতে শুরু করে। তার বদৌলতেই তা আজকে অনেক হাত, অনেক মুখ, অনেক কান হয়ে আমাদের কাছে এসে পৌছেছে। বলা যায়না, হয়তো আপনারও কাজে লেগে যেতে পারে (ইনশাআল্লাহ)।

“Don’t Break the Chain” :

জেরি সীনফেল্ড ছিলেন একজন বিখ্যাত কমেডিয়ান। উনাকে প্রচুর কমেডি লিখতে হতো। কখনো এই লেখায় গ্যাপ পড়ে গেলে উনি ঝামেলায় পড়ে যেতেন। তো উনি একটা বুদ্ধি করলে- টেবিলের উপর রাখা ডেস্ক ক্যালেন্ডার আর একটা মোটা দাগের লাল মার্কার পেন নিয়ে বসলেন। প্রতিদিন অন্তত একটা কমেডি তাকে লিখতেই হবে। আর তা লেখা হলে ক্যালেন্ডারের সেই তারিখের উপর বড় করে লাল মার্কার দিয়ে একটা ক্রস চিহ্ন “✘” দেবেন। যা ভাবা তাই কাজ, এভাবে প্রতিদিন কমেডি লিখছেন আর একটা করে ক্রস দিচ্ছেন। এক সপ্তাহ পর দেখলেন, সুন্দর একটা চেইনের মত হয়ে গেছে। এই চেইনটাই তার জন্য একটা মোটিভেশান হয়ে দাড়ালো- কাজে একদিন গ্যাপ হয়ে গেলেই চেইনটা ভেঙে যাবে, দেখতে অসুন্দর দেখাবে। এই আনন্দে প্রতিদিন কমেডি লেখা চলতে লাগলো, বাড়তে লাগলো চেইনের দৈর্ঘ্য। উনার এই পরিকল্পনাটিই পরবর্তীতে ‘Don’t Break the Chain Method’ নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

IMG_20191016_082429

এই কাজটি আপনিও করতে পারেন যেকোন কাজের ব্যাপারেই। খুব সহজে মাত্র কয়েকটি ধাপে-

১. একটি বড় কাজ হাতে নিন (যেমন: ৩০০ পৃষ্ঠার একটি বই পড়ে শেষ করা, প্রতিদিন ফজরের পর কুরআন তিলাওয়াত করা, সকালে হাটতে বের হওয়া)।

২. বড় কাজটিকে অনেকগুলো ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নিন (প্রতিদিন ১০ পৃষ্ঠা করে পড়া)।

৩. একটি সাদা রঙের ক্যালেন্ডার ও মোটা লাল দাগের মার্কার পেন নিন। ক্যালেন্ডারটি অবশ্যই এমন জায়গায় রাখতে হবে যেন সবসময় আপনার চোখের সামনে থাকে।

৪. আজকের কাজটুকু শেষ করে ক্যালেন্ডারে আজকের তারিখের উপর বড় করে ক্রস চিহ্ন “✘” দিয়ে রাখুন।

৫. প্রতিদিনের কাজ শেষ করে এভাবে ✘ দিতে থাকুন। পুরো চেইন শেষ না করে থামবেন না, মনে মনে এমন প্রতিজ্ঞা করুন।

৬. মাঝে মাঝেই চেইনের সৌন্দর্য দেখে মোটিভেশান নিন- ✘✘✘✘✘✘✘

গত ৭ দিন যদি পেরেছেন, আগামী ৭ দিন কেন পারবেন না? অবশ্যই পারবেন, ইনশাআল্লাহ। (বিশেষ কারণে ব্রেক হয়ে গেলে আবারও চেইন শুরু করুন)।

➤ আচ্ছা, এবার নতুন একটা চেইনের আইডিয়া দিই, হ্যা? যাদের ৫ ওয়াক্ত সালাত পড়া অনিয়মিত হচ্ছে, দুই এক ওয়াক্ত বাদ চলে যাচ্ছে কিংবা কাযা হয়ে যাচ্ছে, তারা চাইলে প্রতি সারিতে ৫ ওয়াক্ত হিসেবে ৩১ দিনের মোট ১৫৫ ঘরের একটি ‘সালাহ চেইন/ ক্যালেন্ডার’ বানাতে পারেন। প্রতি ওয়াক্ত সালাত শেষে  / ✘ চিহ্ন দিয়ে একটি Unbroken Chain বানানোর প্ল্যান করুন। মাস শেষে মিলিয়ে দেখুন, কত ওয়াক্ত সালাত কাযা/বাদ গেলো, সেই ঘাটতি পূরণে আর কী কী উদ্যোগ নিতে পারেন…..

Kanban Board:

এইবার আরেকটি মেথড আলোচনা করবো, যেটা আবিস্কার করেছিলেন জাপানিজ ইঞ্জিনিয়ার ও বিজনেসম্যান তাইকি ওহনো তাদের ফ্যাক্টরির কাজের প্ল্যানিং মেথড হিসেবে। এটি আমাদের ডেইলি/ উইকলি/ লাইফ প্ল্যানিং এর ক্ষেত্রেও ইউজ করতে পারি।

1-70vux4dbpq_k2fy2kvcp1q-e1570978091265.jpeg

➤ এর জন্য আমাদের একটি হোয়াইট বোর্ড/ ব্ল্যাক বোর্ড/ নোটিশ বোর্ড এই টাইপ একটা বোর্ড লাগবে, যেটি আমাদের চোখের সামনেই টাঙানো থাকবে।

➤ বোর্ডের উপর দুইটি দাগ টেনে পাশাপাশি ৩ টি কলাম করতে হবে। প্রথম কলামের নাম ‘To Do’, দ্বিতীয় কলামের নাম ‘Doing’ বা ‘In Progress’ এবং তৃতীয় কলামের নাম ‘Done’।

➤ অনেকগুলো বিভিন্ন রঙের স্টিকি নোট নিতে হবে। এবার আপনার এই সপ্তাহে বা এই মাসে কী কী কাজ করতে চান, সেগুলো একেকটা এক একটি স্টিকি নোটে লিখে সেগুলো ‘To Do’ কলামের নিচে লাগিয়ে দিন।

➤ যে কাজটি করতে শুরু করবেন, সেই স্টিকি নোটটি প্রথম কলাম থেকে তুলে ‘In Progress’ কলামে লাগিয়ে দিন।

➤ যে কাজটি শেষ হয়ে যাবে, সেই নোটটি ‘Done’ কলামে লাগিয়ে দিন।

এভাবে বোর্ড ও স্টিকি নোট হিসেবে কেন করবেন? এই কাজ তো খাতায়ও করা যায়। কিন্তু কারণটা হচ্ছে- মোটিভেশান। চোখের সামনে এভাবে দেখলে এটা একটা ভিজুয়াল মোটিভেশান হিসেবে কাজ করে। তবে যারা মোটিভেশান ধরে রাখতে মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে গেছেন, তারা মোবাইল এপ ইউজ করেও এই কাজ করতে পারবেন।

তাহলে নেমে পড়ুন আজই। মেথড নিয়ে তো অনেক আলোচনা হলো, আপনার জন্য কোনটা উপযোগী হয় সেটি নিয়েই আপনি কাজ শুরু করে দিন। সময়ের সদ্ব্যবহারই আমাদের উদ্দেশ্য, তা যে মেথডেই করা হোক না কেন। ইয়াহইয়া ইবন হুবাইরা রহ. এর একটি উক্তি দিয়ে শেষ করছি-

“যা কিছু সংরক্ষণে তুমি সচেষ্ট হতে পারো, তন্মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান হচ্ছে সময়; অথচ আমিতো দেখছি তা-ই সবচে’ সহজে তোমার কাছে বরবাদ হচ্ছে।”