‘সময়ই অর্থ’ এই কথা আমরা সবাই-ই শুনেছি। তবে সময়ের আর্থিক মূল্য কি আমরা হিসেব করতে পারি? আজকে এটাই শিখবো আমরা, ইনশাআল্লাহ।

➤ প্রাইভেট ক্লিনিকে ডিউটি করা একজন ইন্টার্ন-কমপ্লিট ডক্টরের মাসিক বেতন মোটামুটি ২৫-৩০ হাজার টাকা। আমি যদি সপ্তাহে ৬ দিন ৮ ঘণ্টা করে ডিউটি করি, তবে মাসে ২৫ দিনে মোট ডিউটি-আওয়ার হয় ৬ × ২৫ = ১৫০ ঘণ্টা।

তাহলে আমার প্রতি ঘণ্টার আর্থিক মূল্য,
৩০,০০০ ÷ ১৫০ = ২০০ টাকা।

একইভাবে হিসেব করলে একজন ইঞ্জিনিয়ার, যার মাসিও বেতন ৫০,০০০ এরাউন্ড ও ডিউটি আওয়ার ৮-৯ ঘণ্টা, তার প্রতি ঘণ্টার আর্থিক মূল্য দাড়ায় ৩০০-৪০০ টাকা।

📌 তাহলে সূত্রটা হচ্ছে,

আপনার প্রতি ঘণ্টার আর্থিক মূল্য= (আপনার মাসিক আয় ÷ মাসে মোট ডিউটি- ঘণ্টা) টাকা

তাহলে দেখতে পাচ্ছি, আমার প্রতিটি ঘণ্টার দুনিয়াবি মূল্য মোটামুটি ২০০ টাকা। আমি যদি এখন ২ ঘণ্টা অকারণে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিই, তাহলে আমার ৪০০ টাকা খোয়া গেলো। কিংবা কারও সাথে বিনা প্রয়োজনে দেড় ঘণ্টা আড্ডায় কাটিয়ে দিলাম, মানে ৩০০ টাকা নষ্ট করে ফেললাম। কখনো কি আমরা এইভাবে হিসেব করে দেখেছি, জীবনে দুনিয়াবি হিসেবেই কত টাকা নষ্ট করেছি, আর কত করে চলছি?

এই হিসেবটুকু বুঝতে পারলে আমার কাছে ৫০ টাকার একটা ফ্রি ‘সিম’ নেয়ার জন্য আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা সময়ের অপচয় মনে হবে, কারণ আমার আধঘণ্টার মূল্য ১০০ টাকা কিংবা তারও বেশি। ঘরের কাজের সময় বাচানোর জন্য টাকা দিয়ে যে খাদেমা রেখেছি, সেই খাদেমার কাজের ভুল ধরার জন্য কিংবা কাজের ফাকে এক টুকরো মাছ চুরি করে খেয়ে ফেললো কিনা তা দেখার জন্য জোঁকের মত পিছে লেগে থাকার ইচ্ছে হবেনা, কারণ তাতে আমার অর্থ ও সময় দুটোই নষ্ট হচ্ছে। এক টুকরো মাছের মূল্য যদি ১৫ টাকা হয়, আমার ১ ঘণ্টা সময়ের মূল্য তার চেয়ে ১৩ গুণ বেশি। তাই এই সময়টুকু যদি আমি অর্থোপার্জন করতে না-ও পারি, তবে অবশ্যই এমন কিছু ্করা উচিৎ যার আর্থিক মূল্য সমমানের বা বেশি হয়।

তবে টাকার এই হিসেবটা কিন্তু কেবল সময়ের মূল্য বোঝার জন্যই, টাকার পিছে ছোটার জন্য না। টাকার হিসেবে সবকিছু চিন্তা করলে আবার সেই চিন্তাটা হয়ে যাবে বস্তুবাদীদের মত- যাদের কাছে কোনভাবে টাকা ও বস্তুগত সুখ অর্জনই জীবনের উদ্দেশ্য- একজন মুমিনের উদ্দেশ্য কখনোই তা নয়।

যেমন, আমি যদি এখন ২ ঘণ্টা দুনিয়াবি আড্ডায় না কাটিয়ে একজন মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার কাজে ব্যয় করি, তাহলে আমার কি আমার ৪০০ টাকা জলে গেলো? না, বরং ৪০০ টাকার চেয়েও বহু মূল্যবান কিছু অর্জিত হলো। কেননা, কোন একজন মানুষকে হিদায়াতের পথে উঠিয়ে দেয়া আরবের একটি লাল উটের চেয়ে উত্তম (হাদীস)। সে যুগে আরবের লাল উট মানে এ যুগের মার্সিডিজ বেঞ্জ প্রাইভেট কার, তার মূল্য ৪০০ টাকার কত গুণ??

কিংবা মনে করুন, কেউ ফজরের সালাত পড়ে সালাতের স্থানে দুহার সময় পর্যন্ত ১ ঘণ্টা বসে থেকে দুহার সালাত পড়লো। এই ১ ঘণ্টায় কি ২০০ টাকা নষ্ট হলো? বস্তুবাদীরা তা ভাবতেই পারে, কিন্তু আমাদের হিসেব উল্টো। হাদীসে বলা হচ্ছে, এই কাজটি সাওয়াবের আশায় করা হলে একটি পূর্ণ হজ্জ ও উমরার সমপরিমাণ সাওয়াব হবে। এখন বলুন তো, একটি হজ্জ ও একটি উমরা করতে কত লাখ টাকা প্রয়োজন?

➤ এবার আমরা আরেকটা হিসেবে দেখি। দুনিয়ার জীবনের ৬০-৭০ বছরের কামাই (আমল) দিয়ে আখিরাতে আপনাকে অনন্তকাল চলতে হবে। অনন্তকাল দিয়ে তো আর হিসেব করা যায়না, ধরে নিই তা এক কোটি বছর। আমার হায়াত যদি হয় ৬০ বছর, তাহলে ৬০ বছরে কত ঘণ্টা?
৩৬৫ × ২৪ × ৬০ = ৫২৫,৬০০ ঘণ্টা

দুনিয়াবি জীবনের ১ ঘণ্টা =

(১০০০০০০০ ÷ ৫২৫,৬০০)= ১৯ বছর (পরকালীন জীবনের)

অর্থাৎ, আমার দুনিয়াবি জিন্দেগী যদি হয় ৬০ বছর, আর আখিরাতের জিন্দেগী হয় ১ কোটি বছর, তাহলে দুনিয়ার ১ ঘণ্টার সঞ্চয় দিয়ে আমাকে আখিরাতে ১৯ বছর চলতে হবে। ১ দিনের সঞ্চয় দিয়ে চলতে হবে ৪৫৬ বছর। আর সেই জীবন তো ১ কোটি বছরের সীমায় সীমাবদ্ধ নয়, তার শুরু আছে শেষ নেই। তাহলে আমার এই জীবনের প্রতি ঘণ্টা, প্রতি মিনিট কতটা হিসেব করে ব্যয় করা দরকার?? আল্লাহু আকবার!

সময়ের মূল্য এখন কেমন মনে হচ্ছে? আগের হিসেবের চেয়েও অনেক কঠিন না? সময় শুধু সম্পদই নয়, সম্পদের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এ কারণে আল্লাহ তা’আলা ‘সময়ের শপথ’ দিয়ে একটি সূরা শুরু করেছেন। সাহাবায়ে আজমাঈনরা একত্রিত হলেও নাকি এই সূরাটিই একে অপরকে স্মরণ করিয়ে দিতেন। সময়ের এই হিসেব খুব কঠিন, খুব কঠিন! তবে আল্লাহ তা’আলা কিন্তু তা সহজ করার পথ বাতলেও দিয়েছেন। ইখলাসের সাথে করা প্রতিটি আমলের প্রতিদান ১০ থেকে ৭০০ গুণ বাড়িয়ে দেয়ার ওয়াদা, কুরআনের একটি হরফ তিলাওয়াতে দশটি নেকি, রমাদানে লাইলাতুল ক্বদরে ইবাদাতের বিনিময়ে হাজার মাস ইবাদাতের চেয়েও বেশি সাওয়াবের ওয়াদা…. এরকম ভুরি ভুরি অফার আল্লাহ তা’আলা আমাদের দিয়ে রেখেছেন। আমরা তো ছুটছি ইন্টারনেট আর মিনিট অফারের পিছে, আল্লাহর দেয়া অফার লুফে নেয়ার সময় কই!

➤ বেলা বাড়ছে, বরফওয়ালাদের বরফ গলে চলছে, আর বরফওয়ালারা বিভোর হয়ে ঘুমোচ্ছে। কেনাবেচার হাটে কী সওদা নিয়ে দাড়াবে, সে খবর আছে?

f08553938699933e0a9041cabd5abcde

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

“যখনই কোন দিনের সূর্য উদিত হয়, তখন সে মানুষকে সম্বোধন করে বলে- হে আদম সন্তান! আমি এক নতুন সৃষ্টি ও তোমার কর্মের সাক্ষী। সুতরাং তুমি আমার থেকে পাথেয় সংগ্রহ করো। কেননা কিয়ামত দিবস পর্যন্ত আমি আর ফিরে আসবো না।”

তাবেয়ী হাসান আল-বসরী রহ. বলেন:

“হে আদম সন্তান! তুমি তো কতক দিনের সমষ্টি মাত্র। সুতরাং যখনই একটি দিন অতিবাহিত হলো, তখন তোমার জীবনের একাংশ হারিয়ে গেল।”