আচ্ছা, আপনার কি এমন হয় ?

➤ দিনের শুরুতে যতগুলো কাজ করবেন বলে চিন্তা করেন, দিনের শেষে তার বেশিরভাগই বাকি থেকে যায়?

➤ দরকারি কাজগুলোর ‘টু ডু লিস্ট’ বানাতে চেষ্টা করেন কিন্তু তা আর ফলো করা হয়না?

➤ আপনার কি মনে হয় যে আমনি সময়কে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ‘হা’বোধক হয়, তবে বুঝতে হবে- টাইম ম্যানেজার হিসেবে আপনি খুব একটা সফল নন। আপনার প্রোডাক্টিভ সময়গুলো অবশ্যই কেউ না কেউ নিয়ে নিচ্ছে। এই ‘সময়-চোর’ নিয়ন্ত্রণ করার একটি কার্যকর উপায় হচ্ছে- র‍্যাক মেথড। চলুন দেখি জানা যাক, RAC মেথডের আদ্যোপান্ত…RAC মেথডটি ৩ টি ধাপে সম্পন্ন করতে হবে-১. R- Record:দিনের শুরুতে একটি কাগজ-কলম নিয়ে বসুন। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে সারাদিনের অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টার প্রতিটি কাজ, কোনটা কত সময় নিয়ে করছেন, তা গুণে গুণে লিখে রাখুন। কত ঘণ্টা ফেইসবুক ব্রাউজ করেছেন, কত ঘণ্টা গেইমস খেলা কিংবা অকারণ আড্ডায় চলে গেছে, কতটা সময় খাওয়া-দাওয়া কিংবা পড়াশোনায় কেটেছে কোনটিই বাদ যাবেনা। এর আগেও এক পর্বে আমরা এটা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম, যেটাকে বলেছিলাম ‘টাইম লগ’। মনে পড়ে?২. A- Analyse:
দিনশেষে আপনার ২৪ ঘণ্টার রেকর্ড নিয়ে বসুন। অনেকেই আবিষ্কার করবেন যে দিনের বিশাল একটি সময় কেটে গেছে একদম আনপ্রোডাক্টিভ সব কাজে। যে পড়াটুকু আধ ঘণ্টায় শেষ করা যেত সেটাতে লেগেছে দেড় ঘণ্টা। কারণ পড়ার ফাঁকে বারবার বিভিন্ন রকম কাজে ব্যস্ত ছিলেন- মেসেজের রিপ্লাই দেওয়া, নোটিফিকেশন চেক করা, প্রতি দশ মিনিট পরপর ফেবুতে একটু ঢুঁ মেরে আসা। যদিও এগুলো করার সময় আমাদের মনে হয়, “জাস্ট দুই মিনিট ঘুরে আসলে কিচ্ছু হবে না!” কিন্তু এই দুই মিনিটের Distraction এ হারানো মনোযোগ ফিরে পেতে যে দশ মিনিট নষ্ট হয় সেটা কিন্তু খেয়াল করি না। যাহোক, আপনার রেকর্ড থেকে এবার খুজে বের করুন, কোন কোন কাজে আপনার সময় সবচেয়ে বেশি অপচয় হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৫ টি বড় সময় চোর (5 Biggest Time Thieves) চিহ্নিত করুন। (এই ডিস্ট্রাকশন/ ট্র্যাপ নিয়ে পরের পর্বে বিস্তারিত আলোচনা থাকবে ইনশাআল্লাহ)।৩. C- Change:
এবার শুরু করুন দিন বদলের গল্প। এই নতুন গল্পের জন্য আপনাকে ৩ টি কাজ করতে হবে–

i) Prioritize:

আপনার রুটিনের কাজগুলোকে প্রায়োরিটি অনুযায়ী ভাগ করে ফেলুন। প্রায়োরিটি অনুযায়ী কাজ ভাগ করার পদ্ধতি আমরা ‘আর্জেন্ট-ইম্পর্ট্যান্ট ম্যাট্রিক্স’ ও ‘ইফোর্ট-ইম্প্যাক্ট ম্যাট্রিক্স’ এ দেখে এসেছি। দিনের শুরুতে ঐ দিনে কোন ৫ টি কাজ করা আপনার জন্য সবচেয়ে জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ, তা বাছাই করে লিস্ট করে ফেলুন। এটি আপনার To-Do list. এই লিস্টটি সারাদিন চোখের সামনে রাখুন।

ii) Declutter:

ডিক্লাটার অর্থ হচ্ছে, ঘিঞ্জি এলাকা থেকে অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে জায়গা ফাকা করা। আপনার ডেইলি রুটিনে যে কাজগুলো প্রতিদিন এরকম ঘিঞ্জি তৈরি করছে সেগুলো ঝেটিয়ে বিদেয় করুন। যে ৫ টি বড় সময়-চোর খুজে বের করেছিলেন, সেগুলো পুরো বাদ দিয়ে দিন অথবা অন্তত একটু একটু করে কমিয়ে ফেলুন।

iii) Schedule:

‘মাল্টিটাস্কিং’ কাজের মান নষ্ট করে, তাই সব কাজ একসাথে শুরু করে খিচুড়ি বানানোর দরকার নেই, একেকটা কাজের জন্য একেকটা সময় নির্ধারিত করাই সঠিক উপায়। আপনার টু-ডু লিস্টের সেই দরকারি কাজগুলো দিনের কোন সময় কোনটা করবেন তা ফিক্স করুন। কাজের শুরু ও শেষ করার আনুমানিক সময় হিসেব করে টাইমসহ লিখে রাখুন। যেটাকে বলা হয় ‘টাইম ব্লকিং’।

 এবার কোমর বেধে নেমে পড়ুন- শিডিউল অনুযায়ী প্রতিদিনের ৫ টি লিস্টেড কাজ শেষ করুন, টানা এক সপ্তাহ এভাবে করতে থাকুন।

 সপ্তাহান্তে হিসেব মিলিয়ে দেখুন- এই এক সপ্তায় আপনি কতটা সময় বাচাতে পেরেছেন? এই এক সপ্তায় আপনার সময়গুলো কতখানি নিয়ন্ত্রণে এসেছে?

যদি আগের সপ্তার চেয়ে বেটার হয়, তাহলে টাইম ম্যানেজার হিসেবে এই মুহুর্তে আপনি কিছুটা হলেও সফল। এই সফলতা থেকে উৎসাহ নিয়ে নতুন সপ্তাহে আরও বেশি টার্গেট নিয়ে কাজ শুরু করুন। সফল আপনাকে হতেই হবে, ইনশাআল্লাহ। আমাদের দিনগুলো তো ২৪ ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে ৪৮ ঘণ্টা করে ফেলা যাবেনা, পৃথিবীতে সফল মানুষগুলোর দিনও ২৪ ঘণ্টাই ছিলো। অথচ হিসেব করে দেখুন তো, তারা এক জীবনে কত কিছু করে গেছেন, আর আমি-আপনি সেই আফসোসের দুষ্টচক্রেই বন্দি হয়ে আছি!

বর্তমান সময়ের খুব সফল একজন টাইম ম্যানেজার, যিনি একাধারে লেখক, গবেষক, আলেম ও শিক্ষক, উস্তাদ আবু তাহের মিসবাহ হাফিজাহুল্লাহ এর খুব দামী একটি নসীহত উল্লেখ করে শেষ করছি-“বর্তমানকে যারা যাপন করে ভবিষ্যতকে স্মরণ রেখে, জীবনের সফলতা শুধু তাদের জন্য। বর্তমান চিরকালের জন্য নয়, কিছু সময়ের জন্য। ভবিষ্যৎ অনেক দীর্ঘ। আবার ভবিষ্যতের রয়েছে ভবিষ্যৎ, এবং তা অনন্ত।তোমার যৌবনের প্রতিটি দিনের হিসেব চাইবে তোমার আগামী বার্ধক্য। বার্ধক্যকে হিসেব দিতে হবে মৃত্যুর কাছে। তোমার বাবার তুমি কেমন সন্তান, তা একদিন বুঝিয়ে বলতে হবে তোমাকে তোমার সন্তানের কাছে। বর্তমানের তরঙ্গদোলায় দোল খেয়ে খেয়ে যাদের সকাল-সন্ধ্যা হারিয়ে যায়, তাদের জীবনে নেমে আসে অনেক দুর্গতি।”