খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ করতে বসেছেন, কিন্তু কাজটা আর হলোনা, অর্ধসমাপ্ত রেখেই উঠে আসতে হলো… এই সমস্যার মূল কারণ কী, বলুন তো?
– ডিস্ট্র‍্যাকশন।

আমাদের চারপাশে ডিসট্র‍্যাকশনের এত এত চোরাফাদ যে কোন কাজে মনোযোগ ধরে রাখা খুব কঠিন। এজন্য আমাদেরকে আগে এই ট্র‍্যাপ/ফাদগুলো খুজে বের করতে হবে এবং এরপর তার প্রতিকার। এরকম কিছু ট্র‍্যাপ নিয়েই এ পর্বের আলোচনা-

১. সোশ্যাল মিডিয়া ট্র‍্যাপ:

আধুনিক যুগে সময় নষ্ট করার মত এরচে বড় ফাদ আর নেই। মনে করুন, সক্কাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল হাতে নিয়ে ফেইসবুকে ঢুকেছেন, তো সারাদিনের প্রোডাক্টিভ সময়টুকু ওখানেই শেষ। কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজের মাঝে ইউটিউব ব্রাউজিং শুরু করেছেন, তো কখন যে কোথায় হারিয়ে গেছেন তার আর হিসেব নেই।

তো এই সমস্যার সমাধান কী? জরুরী কাজের সময় মেসেঞ্জার, ইমেইল, ফেইসবুক এসবের নোটিফিকেশন অফ করে রাখুন। তাতেও কাজ না হলে মোবাইলটিই হাতের নাগাল থেকে দূরে সরিয়ে রাখুন। কাজ শেষ করে তারপর মোবাইল হাতে নিন। অথবা মোবাইলেই কাজ করতে হলে সেটিংসে গিয়ে “Focus Mode” অন করে ডিস্ট্র‍্যাক্টিং app গুলো কিছু সময়ের জন্য ডিজ্যাবল করে নিন। সবচেয়ে ভালো সমাধান হচ্ছে- ব্যাচিং (পর্ব ৬)। মেসেঞ্জার, ইমেইল এসব কাজের ফাকে বার বার চেক না করে দিনের একটা কম গুরুত্বপূর্ণ সময় বেছে নিয়ে সবগুলো উত্তর একসাথে দিতে পারলে তাতেই সময় সবচেয়ে বেশি সেইভ করা সম্ভব।

২. ফোন ট্র‍্যাপ:

সময় অপচয় করার এটি আরেকটি পুরনো উপায়। অকারণে ফোন করে দুনিয়ার বস্তাপচা খাজুরে আলাপ করার মত মানুষের সংখ্যা জগতে কম নয়। এক শ্রেণীর আজব কিসিমের মানুষ তো এমনও আছে, যারা ‘নেই কাজ তাই খই ভাজ’ হিসেবে অপরিচিত নম্বরে কথা বলে সময় কাটায়। তবে হ্যা, দরকারেও কথা বলতে হয় আমাদের। সবচে ভালো উপায় হচ্ছে, আগের মত এই ক্ষেত্রেও ব্যাচিং করে ফেলা, দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ফোনালাপের কাজগুলো এক সাথে সেরে ফেলা।

আর হ্যা, জরুরী কোন কাজের সময় ফোন সাইলেন্ট করে রাখুন। প্রয়োজনে ঘণ্টায় ৫ মিনিট ফোন চেইক করবেন। যে সময়টুকু ফোন সাইলেন্ট রেখেছিলেন, আশা করা যায় মাত্র ৫৫ মিনিটে দুনিয়া ওলট-পালট হয়ে যাওয়ার মত কিছু হবেনা।

৩. মাল্টিটাস্কিং ট্র‍্যাপ:

এই ট্র‍্যাপে পড়েই কাজের গতি হারায় বেশিরভাগ মাল্টিটাস্কার। গ্যারি কেলার তার বেস্টসেলার বই ‘The One Thing’ এ দেখিয়েছেন, গবেষণায় প্রমাণিত একটি সত্য হচ্ছে, একটি কাজ ফোকাসডভাবে করতে যে সময় লাগে, কাজের ফাকে মাল্টিটাস্কিং করতে গেলে সেই কাজ করতে ২ গুণেরও বেশি সময় লাগে।

IMG_20191020_130514

তাই মনোযোগ দিতে হয়, এমন কাজে মাল্টিটাস্কিংকে ‘না’ বলুন। তবে মনোযোগ বেশি লাগেনা, এমন কাজে মাল্টিটাস্কিং করা যেতে পারে। যেমন- রাস্তায় জ্যামে বসে আছেন, একটি বই হাতে নিয়ে পড়তে পারেন অথবা কোন অডিওবুক শুনতে পারেন- বিরক্তি কমলো, সময়টুকুও কাজে লাগলো। কিংবা রান্নাঘরে রান্না করছেন, মোবাইলে একটা লেকচার ছেড়ে শুনতে থাকুন, অথবা তিলাওয়াত শুনে হিফজ করতে চাইলে তিলাওয়াত ছেড়ে দিয়ে মনে মনে রিপিট করুন- রান্নাও হবে, কাজও হবে। সালাফদের মধ্যে গুণে গুণে সময় খরচ করতেন, এমন একজন সফল মানুষ ছিলেন ইবন জাওযী রহিমাহুল্লাহ। উনাকেও মাঝে মাঝে মাল্টিটাস্কিং করতে হতো, তার নিজের মুখেই শুনুন:

“আল্লাহ তা’আলা আমাকে এই বুঝ দান করেছেন যে, পৃথিবীতে সময় হলো সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান সম্পদ। তাই তাকে কল্যাণ-কাজেই ব্যবহার করা আবশ্যক। আমি মানুষের সাথে বিনা প্রয়োজনে দেখা-সাক্ষাৎকে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি, কিন্তু একেবারে প্রত্যাখ্যান করলে তো তা হবে আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করা বা পরিচিতিদের দূরে ঠেলে দেয়ার নামান্তর। তাই যখন বাধ্য হয়েই দেখা করি, কথাকে খুব সংক্ষিপ্ত করি যেন তাড়াতাড়ি এ পর্ব শেষ হয়ে যায়। অথবা এমন কিছু কাজ সবসময় প্রস্তুত রাখি যা করলেও সাক্ষাতকালে কথাবার্তায় ব্যাঘাত ঘটেনা। যেমন: কাগজ কাটা, কলম ঠিক করা, পেন্সিল শার্প করা, লাইব্রেরি পরিস্কার করা, খাতা-পত্র বেধে রাখা ইত্যাদি। এগুলো তো আমাকে করতেই হবে- তবে এগুলোতে মনোযোগ তথা ‘হুযুরে ক্বালব’ দরকার হয়না।”

৪. কগনিটিভ লোড ট্র‍্যাপ:

আমরা যখন অনেকগুলো কাজের পরিকল্পনা করি কিন্তু সমাধা করতে না পারায় কাজগুলো জমতে থাকে, তখন আমাদের ব্রেইনের উপরও প্রেশার বাড়তে থাকে, এটাকেই বলে ‘Cognitive Load’। এই লোড কমানোর কিছু কার্যকরী উপায় আছে-

a. সব কাজকে হ্যা বলা যাবেনা, ‘না বলতে শিখুন’। (বিস্তারিত: পর্ব ১২)

b. কী কী কাজ আপনাকে করতে হবে তা লিস্ট করে ফেলুন (পর্ব ৪), গুরুত্ব অনুযায়ী ভাগ করুন (পর্ব ২)।

c. যে কাজটি কম সময়ে করে ফেলা সম্ভব, তা ফেলে না রেখে করে ফেলুন। (পর্ব ৫: 2-minute Theory)

d. বড় কাজগুলো ভেঙে ভেঙে chunking করে করুন (পর্ব ৫: Pomodoro) অথবা একটু করে শুরু করুন (পর্ব ১২: সুইস চীজ)।

৫. বার্নআউট ট্র‍্যাপ:

নিজের উপর সাধ্যাতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপিয়ে নিলে কিংবা বিরতিহীন একনাগাড়ে কাজ করতে থাকলে আমাদের ব্রেইন তখন আর মনোযোগ ধরে রাখতে পারেনা। এটিকেই বলা হচ্ছে ‘বার্নআউট ট্র‍্যাপ’। এর সমাধান হচ্ছে কাজের ফাকে ‘ব্রেক নেয়া’। ব্রেক অনেকরকম হতে পারে। যেমন-

a. প্রতি ১-২ ঘণ্টা কাজের পর অন্ততঃ ৫ মিনিট ব্রেক নেয়া।

b. দুপুরে খাওয়ার আগে বা পরে আধা ঘণ্টা-এক ঘণ্টা রেস্ট নেয়া। মেডিকেল সাইন্স এটিকে বলছে “Power Nap”, আর রাসূলুল্লাহ সা. আমাদের ঠিক এই সুন্নাতটিই শিখিয়ে গেছেন ১৪০০ বছর আগে, যাকে আমরা বলি ক্বাইলূলাহ (القيلولة)। এই অল্প সময়ের রেস্ট কাজে কী পরিমাণ উদ্যম নিয়ে আসে, তা নিউরোসায়েন্টিফিক রিসার্চ থেকেই প্রমাণিত হয়েছে।

c. সন্ধ্যায় ১-২ ঘণ্টা সময় হালাল বিনোদনে কাটানো।

d. সপ্তাহে একদিন ছুটি কাটানো (সম্ভব হলে)।

e. বছরে অন্তত ১-২ বার বড় ছুটি নিয়ে বেড়াতে অথবা ভ্রমণে যাওয়া।

৬. সামাজিকতা ট্র‍্যাপ:

জরুরী একটা কাজ নিয়ে বসেছেন, কেউ একজন এসে বেহুদা গল্প শুরু করে দিলো, ব্যস কাজটা পণ্ড হয়ে গেলো। এমন খাজুরে আলাপের আজাইরা লোকের অভাব নেই চারপাশে। এজন্য জরুরী কোন কাজে বসলে আশেপাশের কাউকে জানিয়ে রাখুন, এই সময়টুকুতে কেউ যেন ডিস্টার্ব  না করে।
অফিস কিংবা জনসমাগম আছে এমন জায়গা হলে আপনার ডেস্কে ‘ব্যস্ত আছেন’ এটি বোঝানোর মত কোন একটা সাইন দিয়ে রাখুন। তাও সম্ভব না হলে কানে ইয়ারফোন গুজে নিতে পারেন, বাইরের কথা কানে কম আসবে, আর ইয়ারফোন কানে কোন ব্যক্তিকে মানুষ সহজে বিরক্ত করতেও চায়না।

এই সামাজিকতার ধোকায় পড়ে যে আমাদের কত সময় নষ্ট হয়, তার ইয়ত্তা নেই৷ গেট টুগেদার, জিটুজি, হ্যাং আউট, কাজে-অকাজে রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া এই মুবাহ কাজগুলোও অজান্তেই আমাদের জীবনের প্রোডাক্টিভ সময়গুলোকে হাতিয়ে নিচ্ছে। ইবন জাওযী রহিমাহুল্লাহ এর খুব দরদওয়ালা কিছু কথা দিয়েই এই পর্ব শেষ করছি-

“আমি তো দেখি, প্রায় সব মানুষই সময়ের সাথে বড্ড অবহেলার আচরণ করে, ঘোর উন্মাদনার সাথে এর অপচয় করে৷ যখন রাত বড় থাকে, তখন তা কাটায় বেহুদা কথাবার্তা ও আলাপ-আড্ডায় কিংবা প্রেম-প্রণয় ও গল্পগুজবের বই পড়ে। আর যখন দিন বড় থাকে, তখন রাতটা তো ঘুমেই কাটিয়ে দেয়। আর দিনের এক বৃহৎ অংশ তারা দজলার পাড়ে বিনোদনে বা হাট-বাজারে অনর্থক কাটিয়ে দেয়। তাদের অবস্থা তী অকূল দরিয়ায় ভাসমান আরোহীদের মত, যারা বসে আড্ডায় মত্ত- তাদের না আছে গন্তব্যের চিন্তা, না আছে পাথেয়ের ভাবনা।

জীবনকে মূল্যায়ন করে শেষ সফরের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করে প্রস্তুত থাকে, এমন মানুষের সংখ্যা আজ অতি অল্প, প্রায় দুষ্প্রাপ্য।

আল্লাহর ওয়াস্তে তোমরা সময়ের পরিচয় অর্জন ও উপলব্ধি করো, হাতছাড়া হওয়ার আগে তার যথার্থ মূল্যায়ন করো। আমি তো বলতে চাই, তোমরা এর সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে পড়ো। আর আল্লাহর সাহায্য প্রার্থণা করো, ইনশাআল্লাহ সফলতা আসবেই।”

সূত্র:
১. গুগল
২. Time Management: Ismail Kamdar
৩. সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা: আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ.