ব্যস্ততার এই সময়ে যে বিষয়টি নিয়ে মানুষের সবচে বেশি টানাপোড়েন, তা হলো সময়। আবার যে জিনিসটি নিয়ে অধিকাংশ মানুষ অসচেতন, তা হলো ‘সময় সচেতনতা’ কিংবা ‘সময় ব্যবস্থাপনা’ বা ‘টাইম ম্যানেজমেন্ট’।
সেই কথা স্বয়ং আল্লাহই বলে দিচ্ছেন:

اقْتَرَبَ لِلنَّاسِ حِسَابُهُمْ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ مُعْرِضُونَ-

“মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন, অথচ তারা গাফেল হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।” [সূরা আম্বিয়া: আয়াত ১]

 পৃথিবীতে সবচেয়ে ভালো টাইম ম্যানেজার কে ছিলেন, বলেন তো? চোখ বন্ধ করে বলা যায়, যেই মানুষটা পৃথিবীর ইতিহাসে ও আখিরাতের হিসেবে দুই দিক দিয়ে সবচেয়ে সফল, তাই নয় কি? তিনি মুহাম্মাহুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সময়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যবহার না করলে তিনি একইসাথে এত বড় একটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়ক, ধর্মপ্রচারক, যোদ্ধা, বিজেতা, গোটা দুনিয়ার মানুষের উত্তম আদর্শ, একই সাথে ৯ জন স্ত্রী ও তাদের সন্তানদের সামাল দিয়েছেন এবং যারা কিনা কেউ তার নামে এতটুকু অভিযোগও করেনি, সেই মানুষ আবার শিশুদের সাথেও হাস্যরস করতেন, নাতি-নাতনিদেরও সময় দিতেন…. ২৪/৭ সময়সীমার মাঝেই এত্তগুলো দায়িত্ব কিভাবে পালন করেছেন? সেই মহামানবের বলা একটি বিখ্যাত হাদীস (Five before Five) তা প্রমাণ করে:

اغتنمْ خمسًا قبل خمسٍ شبابَك قبل هرمكَ وصحتَك قبل سَقمِكَ وغناكَ قبل فقرِك وفراغَك قبل شغلِك وحياتَكَ قبل موتِكَ

পাঁচটি জিনিসের পূর্বে পাঁচটি জিনিসকে মূল্যায়ন করো-
১. যৌবনের মূল্যায়ন করো বার্ধক্যের আগে।
২. সুস্থতার মূল্যায়ন করো অসুস্থতা আসার আগে।
৩. সচ্ছলতার মূল্যায়ন করো দারিদ্র্য আসার আগে।
৪. অবসরের মূল্যায়ন করো ব্যস্ততা আসার আগে।
৫. জীবনের মূল্যায়ন করো মৃত্যু আসার আগে।

 এ বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আরেকটি হাদীস:
“দুইটি নেয়ামত অধিকাংশ লোকেই (অবহেলায়) হারায়; স্বাস্থ্য এবং অবসর সময়।” [বুখারী]

সময় সচেতন ছিলেন আমাদের উত্তরসুরীরাও- সাহাবায়ে আজমা’ঈন, তাবেঈন, আতবা-তাবে’ঈন ও তাদের পরবর্তী আকাবিরগণও। তাদের এক একজনের এক জীবনে লিখে যাওয়া বই আমরা এক জীবনে পড়েই শেষ করতে পারিনা, চিন্তা করা যায়? তেমনই একজন অক্লান্ত পরিশ্রমী টাইম ম্যানেজার ছিলেন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহিমাহুল্লাহ। তার পুত্র একবার জিজ্ঞেস করেছিলো: বাবা, আমরা বিশ্রাম কখন নেবো?
তিনি উত্তরে বলেছিলেন:
The day we step first on Jannah.
“যেদিন জান্নাতে আমরা প্রথম পা রাখবো।”

 ইমাম শাফেয়ী রহ. এর একটি উক্তি আমার খুবই পছন্দের- ‘সময় হচ্ছে তরবারির মত, তুমি যদি একে না কাটো, সে-ই তোমাকে কেটে ফেলবে।’ অর্থাৎ সময়কে যদি তুমি সঠিক কাজে ব্যবহার না করো, সময়গুলো নিজে নিজেই অকাজে ব্যয়িত হয়ে তোমাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে।

 তো এই সময়ের ম্যানেজমেন্ট কিভাবে করা যায়? আমাদের উলামায়ে আকাবিরীনদের এর জন্য কোন থিওরি কপচাতে হয়নি, আসলে তারা পরকালের চিন্তায় এতটা মগ্ন ছিলেন, নিজের কাজে এতটা ডেডিকেইটেড ছিলেন যে ‘সেল্ফ-মোটিভেশান’ই তাদের মঞ্জিলে মাকসাদে পৌছে দিয়েছে। এক বুজুর্গানে দ্বীন এভাবে বলছিলেন- দুনিয়াতে কাটানো ৬০-৭০ বছরের জিন্দেগীর কামাই দিয়ে আখিরাতে কোটি কোটি বিলিয়ন বছর কাটাতে হবে। বৃদ্ধ বয়সে ৮-১০ বছর অবসর কাটানোর টাকা জোগাড় করতে যদি আমাদের ৫০-৬০ বছর চাকুরি করা লাগে, তাহলে এই জীবনের কামাই দিয়ে কোটি কোটি বছর চলার জন্য প্রতিটি মুহুর্ত কি রকম গুণে গুণে ব্যবহার করা উচিৎ? হাশরের ময়দানে বিনা আমলে কাটানো প্রতিটি মুহুর্তের জন্য আমাদের আফসোস হবে।

এবার মূল আলোচনায় আসি। আকাবিরদের টাইম ম্যানেজমেন্টের জন্য থিওরির প্রয়োজন না হলেও আমাদের লাগে, কারণ আমরা ঐ পরিমাণে ‘সেল্ফ-মোটিভেইটেড’ হতে পারিনি। থিওরিগুলো বেশিরভাগই পশ্চিমা বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের, যারা দুনিয়ার জীবনে সফল মানুষ ছিলেন। তবে সেগুলোকে আল্লাহর নির্ধারিত উপায়ে কাজে লাগাতে পারলে আমাদের জন্য দুনিয়া-আখিরাত উভয় জগতেই সফলকাম হওয়া সম্ভব, ইনশাআল্লাহ।

‘ইসলামিক ম্যানেজমেন্ট’ পড়ার সময় নিজ আগ্রহেই ‘টাইম ম্যানেজমেন্ট’ নিয়ে অনেকগুলো বিখ্যাত বই ও বই এর সামারি পড়েছিলাম, বেশ কিছু থিওরি ও টিপস আমার পছন্দ হয়েছিলো, সেগুলোই একটু একটু করে পরবর্তী পর্বগুলোতে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ। আগ্রহীরা সাথেই থাকুন….. (চলবে)