80-20 Principle/ Pareto Principle:

১৯০৬ সালে ইতালিয়ান অর্থনীতিবিদ ভিলফ্রেডো প্যারেটো একটা বিষয় খেয়াল করেন যে, সেই সময় ইতালীর ৮০% ভূমি মাত্র ২০% মানুষের দখলে। অর্থাৎ, সমাজের ৮০% সম্পদ মাত্র কুক্ষিগত করে রেখেছে মাত্র ২০% মানুষ। ৮০/২০ এর এই অনুপাতটি তাকে বেশ চিন্তায় ফেলে দেয়। এরপর তিনি আরও খেয়াল করে দেখেন যে-
তার বাগানের ৮০% মটর ফলছে মাত্র ২০% মটরগাছ থেকে।
কোন কাজের পেছনে ২০% ইনপুট সেই কাজের ৮০% ফলাফল তৈরি করে।
একটি প্রতিষ্ঠানের ৮০% উৎপাদন হয় ২০% কর্মচারী থেকে।
আবার কোন প্রতিষ্ঠানের ৮০% ক্ষতিও হয় ২০% অসৎ কর্মচারী থেকে।

এসব উদাহরণ থেকে তিনি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে পৌছেন-
কোন কাজের সফলতার ৮০ ভাগ আসে কাজের শতকরা ২০ ভাগ থেকে”। এই ২০ ভাগ চিহ্নিত করতে পারলেই ৮০ ভাগ সাফল্যের সোপান খুজে পাওয়া সম্ভব। এই মূলনীতিটিই ‘প্যারেটো প্রিন্সিপল’ বা ‘৮০-২০ প্রিন্সিপল’ নামে পরিচিত। স্টিভেন রিচার্ডস কোভে তার “Seven Habits of Highly Effective People” বইয়ের ‘First Things First’ পয়েন্টের ভেতরেও এই মূলনীতিটি আলোচনা করেছেন। আমরা চাইলে জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রায়োরিটি নির্ধারণে এই মূলনীতিটির ব্যবহার করতে পারি। তা কীভাবে?

7c-Pareto-Principle

৬ নং পর্বে আমরা আমাদের ২৪ ঘণ্টার ‘টাইম ব্লকিং’ করেছিলাম, মনে আছে? আবার সেই টাইম লগ বা ব্লকে চোখ বুলান। এবার খুজে দেখুন তো, আপনার আজকের সবগুলো করণীয় কাজের মধ্যে কোন ১/২ টি কাজ করতে পারলেও আজকের দিনটি সফল মনে হবে? সেই কাজটিই আপনার আজকের দিনের সবচেয়ে প্রায়োরিটি পাবার যোগ্য। আপনাকে সেই কাজটিই আগে শেষ করার টার্গেট নিতে হবে।
আবার খেয়াল করলে দেখবেন, এমন কিছু কাজ আছে যেগুলো আপনার দিনের ৮০% সময় নিয়ে নিচ্ছে, কিন্তু ফল হচ্ছে মাত্র ২০% বা তারও কম। এগুলো বাদ দিতে হবে যতখানি সম্ভব।
তেমনি আপনার জীবনের লক্ষ্যের দিকে চিন্তা করে দেখুন, কোন কাজটি আপনি মৃত্যুর আগে করে যেতে যান যেটি করলে আপনার নিজের জীবনটা স্বার্থক মনে হবে? তাহলে সেই কাজটিই ২০%, যা আপনার জীবনে সফলতার ৮০% কে নিয়ন্ত্রণ করে। সফল হতে হলে আপনাকে সেই লক্ষ্য পূরণের জন্যই প্রতিদিন একটু একটু করে কাজ করে যেতে হবে।
উদাহরণটি পরীক্ষার ক্ষেত্রেও দেখা যায়, পরীক্ষায় সবচে ভালো ফলাফল করে কারা, বলুন তো? যারা ২০ ঘণ্টা পড়াশোনা করে, তারা? উহু, বরং যারা পরীক্ষার পড়ার ক্রমও ঐ ৮০-২০ হিসেবে করে, সবচে গুরুত্বপূর্ণ সেকশন আগে পড়ে, ভালোভাবে আয়ত্ত্ব করে, এরপর ক্রমান্বয়ে অগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এরা তাই অনেকের চেয়ে কম পড়েও ফলাফল ভালো করে থাকে।

যাহোক, আপনার কাজের লিস্টে প্রায়োরিটি সিলেকশানকে আরেকটু সহজ করে দেয়ার জন্য আরেকটি ম্যাট্রিক্স রয়েছে, সেটি নিয়ে আলোচনা করা যাক।

Effort-Impact Matrix:

এই ম্যাট্রিক্সটি কাজের প্রায়োরিটি নির্ধারণে ব্যবহার করা হয়। এখানে ‘X’ অক্ষের দিকে থাকে ‘Impact’ তথা কাজের ফলাফল, আর ‘Y’ অক্ষের দিকে থাকে ‘Effort’ তথা কাজের শ্রম।

IMG_20191008_173739

এটি ৪ ঘরবিশিষ্ট একটি ম্যাট্রিক্স, কাজের শ্রম ও ফলাফল অনুযায়ী ৪ টি ঘরে আপনার কাজগুলোকে সাজাতে হবে। এর জন্য আপনি আবার আপনাকে ‘টাইম লগ’ এ চোখ বুলাতে হবে।
 Leverage:
খুজে দেখুন, যে কাজগুলো করতে আপনার সময় ও শ্রম সবচেয়ে কম লাগছে কিন্তু ফলাফল সবচেয়ে বেশি, সেই ভাগের নাম ‘Leverage’। যেমন: সালাত, এটি পড়তে সবচেয়ে কম সময় লাগে, কিন্তু এটিই একজন মুসলিমের সমস্ত দিনের সফলতা নির্ধারণ করে। কাজের বিবেচনায় এটি আপনার ফার্স্ট প্রায়োরিটি, এই কাজগুলোই হলো সেই ২০%, যা আপনার ৮০% ফলাফল বয়ে আনে।

➤ Hard Work:
এবার খুজে দেখুন, কোন কাজগুলো করতে আপনার সময় ও শ্রম বেশি লাগে, আবার ফলাফলও সবচে বেশি। এই ধরণের কাজ হলো ‘Hard Work’। যেমন: পিএইচডি করা। প্রায়োরিটির বিবেচনায় এর অবস্থান দ্বিতীয়, তবে সফল হতে হলে এটিও আপনাকে করতেই হবে।

➤ Unimportant:
এবার আরও কিছু কাজ পাবেন, যেগুলো করতেও সময় কম লাগে, ফলাফলও তেমন বেশি নয়। এই কাজগুলো আসলে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। প্রায়োরিটি লিস্টে এর অবস্থান তৃতীয়, এগুলো দরকার হলে করুন। আর সম্ভব হলে অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নিন।

➤ Waste:
যে কাজগুলো করতে সময় লাগছে সবচে বেশি কিন্তু ফল হচ্ছে সবচে কম, এগুলো আসলে ‘অকাজ’ তথা সময়ের অপচয়। যেমন: উদ্দেশ্যহীন ফেইসবুকিং। এগুলো কাজের লিস্ট একদম ঝেটিয়ে বিদেয় করতে হবে।

প্রায়োরিটি সিলেকশান নিয়ে অনেক কথা হলো, তাইনা? তবে সবচে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি, তা হচ্ছে- অর্থনীতিতে ‘সফলতা’ কিংবা ‘ফলাফল’ বলতে দুনিয়াবি সফলতা বোঝালেও আমাদের জন্য এই হিসেবটা অন্যরকম। মুমিনের জন্য দুনিয়াবি সফলতার আগে পরকালীন সফলতা; দুনিয়াবি সমৃদ্ধির আগে আল্লাহর সন্তুষ্টি- কারণ সফলকাম তো সে-ই, যে জান্নাত পেয়ে গেলো। তবে আল্লাহ যদি সেই সাথে দুনিয়াবি সমৃদ্ধিও আমাদের দেন, তাতেও ক্ষতি নেই, আমরা সফল হতে চাই দুই জগতেই। সুন্দরতম সফলতার সেই দু’য়াটি আল্লাহ রব্বুল ইয্যাহ ভালোবেসেই আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন-

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
“হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের কল্যাণ ও সমৃদ্ধি দিন দুনিয়ায়, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি দিন আখিরাতে। আর জাহান্নামের আগুন থেকে আমাদেরকে রক্ষা করুন”। (সূরা বাক্বারাহ, ২: ২০১)