সেদিন এক কলিগ বলছিলো: দোস্ত, অমুক ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পার্সেন্টেজ দিতে এসেছে, ফিরিয়ে দিয়েছি, বলছি: রোগীদেরকে কমিয়ে দেন, আমার লাগবেনা।

আরেক সিনিয়র কলিগ ডেকে বললেন: তোমার একটা poor fund আছেনা? এই টাকাটা ওখানে রাখো, পার্সেন্টেজ দিয়ে গেলো, ফিরিয়ে দিইনি, ওকে দিলে ওটা ঐ ব্যাটা নিজেই খাবে, তারচে তোমার ফান্ডে রাখো, গরীবের কাজে লাগবে।

গতকাল আমার কাছেও আসলো: আপা, এই প্যাকেটটা রাখেন, আপনার পার্সেন্টেজ।
বলে দিলাম: ফেরৎ দিয়ে দিন, আমি নেবোনা, আমাকে দিতেও আসবেন না আশা করি। (আমি জানি, টাকাটা ঐ লোক নিজেই খাবে, কখনোই সেন্টারে ফেরৎ দেবেনা, তারপরেও নিজের লিবাসে কলঙ্ক লাগাতে চাইনি, আমি যদি টাকাটা নিয়ে গরীবকেও দিই, তাও বাইরে গিয়ে ঠিকই বলবে: শালার হুজুররাও পার্সেন্টেজ খায়…. লিবাসের একটা মর্যাদা আছে, সেটুকু নষ্ট করার হক্ব আমার নেই।)

যাহোক, আমি মাঝে মাঝেই সুযোগ পেলে বিভিন্ন কোম্পানীর রিপ্রেজেন্টেটভ কিংবা ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের লোকদের সাথে মত বিনিময় করি, কোথায় ভালো টেস্ট হয়, কোন ডাক্তারেরা আসলেই সৎ, এসব নিয়ে। এর কারণ হচ্ছে, যারা অসৎ, তারা অসৎদের ঠিকই চেনে এবং যারা অসৎ তারা নিজেরাও ভেতরে ভেতরে অসৎদের ঘৃণা করে & সৎদের রেস্পেক্ট করে। MR রা যেহেতু ডাক্তারদেরকে ঘুষ দিয়ে বেড়ায়, তো এরাই ভালো জানে, কোন ডাক্তার কেমন ঘুষ খায় কে খায়না। এরা নিজেরাই যেসব ডাক্তারদের পিছে টাকা ঢালে, এরাই আবার সুযোগ পেলে সেইসব ডাক্তারদের বদনাম করে বেড়ায়, কারণ ওরা চেনে কে কেমন।

তো এই ডাক্তার সোসাইটিতে যোগ দেয়ার পর কিছু বিষয় ভেতর থেকে জানার সুযোগ হচ্ছে, আলহামদুলিল্লাহ।

শুনলাম, এই আমাদেরই কিছু কিছু ফ্রেন্ড নাকি রোগীদেরকে টেস্টে লেস করে দেয়না, যাতে টাকাটা নিজের পকেটে যায়, ইভেন ওরা নাকি ফোনেও কন্ট্যাক্ট করে তাদের সাথে, পার্সেন্টেজ কবে হাতে পাচ্ছে।
(উল্লেখ্য, আমরা নিতান্ত মনের বেখেয়াল ছাড়া সব রোগীকেই ৩০% লেস করে দেই, ঐটুকু আমাদের হাতে আছে। যারা দেয়না, ঐ টাকাটা তাদের পকেটে যায়।)

তবে যেসব স্যারেরা বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে প্র‍্যাক্টিস করেন, উনারা লেস করে দেন না মানে টাকাটা উনাদের পকেটে যায়না, বরং ঐ টাকাটা ঐ ক্লিনিকের মালিকেরা পায়, এটা ওদের চার্জ, ডাক্তারদের করার কিছু নেই।

কিন্তু যেসব ডাক্তার লিখে দেন যে অমুক ডায়াগনোস্টিক সেন্টার থেকে টেস্ট করিয়ে আনেন, কিন্তু লেস করে দেন না, ঐ টাকাটা তার পকেটেই আসে।

যতদিন আমি এই রাজ্যে ছিলাম না, এই বিষয়ে আমি কিছু বলার সাহস করিনি। কারণ ভেতর থেকে না জেনে লোকমুখে শুনেই কারো সম্পর্কে বলা উচিৎ না, ভুল হলে জবাবদিহি করতে হবে।

কিন্তু এখন এটা সত্যিই বুঝলাম বিভিন্ন মানুষের এক্সপেরিয়েন্স থেকে যে, সব সোসাইটির মত ডাক্তার সোসাইটিতেও অনেক অসৎ মানুষ আছেন। ঢালাওভাবে সবাইকে দোষারোপ করা ঠিক না অবশ্যই, তবে যাদের দোষ আছে, তাদেরও একটু ভেবে দেখা উচিৎ।

ভাবছিলাম, এই আমি, একজন ছাপোষা ইন্টার্ন ডক্টর, বেতন ১৫,০০০ টাকা। আমার হাজব্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার, ওর ইনকাম আমার চেয়ে বেশি। যাই হোক, আমার তো মনে হয়েছে, এরচে বেশি আমাত দরকারই নেই। আমার আর কত খরচ? খেয়েপরে ভালোভাবে বাচতে একটা মানুষের আর কত টাকা লাগে? হ্যা, আমার হয়তো বাড়িভাড়া দিতে হয়না, ছেলেমেয়ে নেই এখনো, খরচ কম। কিন্তু যদি থাকতোও, কত আর লাগতো? ৬০ হাজার, ৭০ হাজার, ১ লাখ?? তার বেশি আর কত??

ভাবতে অবাক লাগে, কতটা ছোটলোক হতে পারে একটা মানুষ! ছি!! ছি!! এইসব হসপিটালে যেসব রোগী ভর্তি হয়, তাদের ফ্যামিলির মান্থলি ইনকাম অনেকের হয়তো ১০ হাজারও না, গরীব দেশ আমাদের, মানুষগুলোও তো গরীবই। একজন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার, যাদের মাসে চোখ বন্ধ করেও ৫/৭ লাখ টাকা ইনকাম, কিভাবে এইসব খেটে খাওয়া পেটে ভাতে চলা মানুষের পকেট থেকে পার্সেন্টেজ নিয়ে নিজের পকেটে রাখতে পারেন? আল্লাহর ভয় যদি বাদও দেই, বিবেক বলেও তো কিছু থাকে!!

না না, ডাক্তারদের বিরুদ্ধে তেড়ে আসবেন না। আমি নারী, তাই নারীদের ভুল নিয়ে লিখি, আমি মুসলিম তাই মুসলিমদের ভুল নিয়ে লিখি, আমি ডাক্তার তাই ডাক্তারদের ভুল নিয়েও লিখি। অসৎ সব সমাজেই আছে, ডাক্তাররা সাধারণ মানুষের ক্লোজ কন্ট্যাক্টে থাকেন, তাই বেশি ফোকাসে থাকেন। সমাজের উঁচু তবকার যারা পুকুর চুরি করেন, তাদের নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। তাই সবাইকে নিয়েই বলুন।
আপনার নিজ প্রোফেশনের ভুল নিয়ে আপনিও আওয়াজ তুলুন….

সবশেষে বলবো: এই ক্বদরের রাতে ডিউটি থেকে ফিরেও নামাজে না গিয়ে পোস্টটা লিখছি। একটু আগেও একটা পেশেন্টের ডেথ সার্টিফিকেট রেডি করে দিয়ে আসলাম, মনও ভালো নেই। এই আমরা হয়তো মানুষের জীবন না বাঁচাতে পারি, সেটার মালিক তো আল্লাহ। কিন্তু মানুষের হক্ব তো মেরে খেতে পারিনা। একটা গরীব না খেতে পাওয়া মানুষের পকেটের টাকা দিয়ে আমি যে বাড়ি গাড়ি করতে চাই, সেই বাড়ি গাড়িতে কি ‘সুখ’ থাকতে পারে? সারা রাত ইবাদাত করবেন, করেন। কিন্তু জানেন কি? ইবাদত কবুলের প্রধান শর্ত হচ্ছে: হালাল রুজি। আপনার ইনকামে যদি হারামের মিশ্রণ থাকে, কোন ইবাদাতই কবুল হবেনা, না’ঊযুবিল্লাহ। আসুন, আজকের রাতে রাতভর ইবাদাত করার আগে আমরা প্রত্যেকে নিজ অবস্থান থেকে একটু হিসেব মিলিয়ে নিই:

★ আমার ইনকাম কিংবা আমার কর্তার ইনকাম হালাল হচ্ছে তো? কোন হারাম মিলে যাচ্ছেনা তো?
★ আমার কিংবা আমার সন্তানদের অযাচিত চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে আমার স্বামী অসৎ উপায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে নাতো?
★ আমার জমাকৃত টাকা কোন সুদী ব্যাংকের ট্রাঞ্জ্যাকশনে ইউজ হয়ে আমাকেও সুদের অংশীদার বানাচ্ছে না তো?
★ আমি কিংবা আমার কর্তা কোন সুদী ব্যাংকে চাকরি করছি নাতো?
★ আমার সম্পদের যাকাতগুলো ঠিকমত আদায় করছি তো?

আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন।