আর রহমান ও আর রহিম আল্লাহর নামে

এই নোটে আমি মূলত তাওহীদ এর জন্য ক্ষতিকর এমন ১০ টি খুঁটিনাটি বাক্য/কথা/আকীদা লিখেছি যার কয়েকটি দেখে মনে হতে পারে যে আমিতো আল্লাহ-র উপরেই ভরসা করছি, এটাতো শুধু মুখের কথা। আসলে এসব কথা যেমন পরিপূর্ণ তাওহীদের পথে বাধা তেমনি ক্ষেত্রবিশেষে শির্ক(কখনো শির্কে আকবার, কখনো শির্কে আসগার); আর তাই আপাত দৃষ্টিতে তুচ্ছ এই ব্যাপারগুলি আমাদের ইসলাম থেকে বহিষ্কারের কারণ হতে পারে।

১) আল্লাহ-র হুকুমে সব হয়” :

এটি আমাদের মাঝে খুব বেশি  প্রচলিত একটা কথা, কিন্তু এই কথা আসলে কুফরী । কেন ? আল্লাহ কুরআনে এবং রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীসে অসংখ্যবার আমাদেরকে শির্ক করতে নিষেধ করেছেন এবং এর ভয়াবহতা সম্পর্কে জানিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ মাজার পূজা সহ যাবতীয় শির্কে লিপ্ত তা কি তাহলে আল্লাহ-র হুকুমে ? আল্লাহ কি তাদেরকে বাধ্য করছেন ? তাহলেতো এজন্য তাদেরকে শাস্তি দেয়া যুলুম হয়ে যাবে যা থেকে কিনা আল্লাহ সম্পূর্ন পবিত্র। তাই  সবকিছুই আল্লাহ-র হুকুমে হয় একথা না বলে বলতে হবে সবকিছুই আল্লাহ-র ইচ্ছায় হয়। কুরআনে এর দলীল এসেছে (বুরূজঃ১৬,তাকভীরঃ২৯ ); এখন প্রশ্ন আসে, তাহলে কি আল্লাহ সব খারাপ কাজও ইচ্ছা করেন? উত্তর হল- হ্যাঁ তবে কিছু শর্ত আছে। এই ব্যাপারে ইমাম ত্বাহাবী (রহিমাহুল্লাহ) এর আকীদা বিষয়ক গ্রন্থ ‘আকীদাতুত ত্বাহাবীয়া’ এর বাখ্যাকার শাইখ ইবনু আল ইজ্জ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘শরহে আকীদাতুত ত্বাহাবীয়া’ তে আল্লাহ-র ইচ্ছার ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকীদা বাখ্যা করেছেন। এর মধ্যে ২ টি মূলনীতি হল-

* আল্লাহ খারাপ/অপকারী কিছু ইচ্ছা করলেও সেগুলো তিনি অপছন্দ করেন, অসন্তুষ্ট হন, পালন করতে নির্দেশ দেননা, সেগুলো খারাপ জানেন ও সেগুলো থেকে নিষেধ করেছেন।

* আমাদের জন্য যা সহজ আল্লাহ তাই ইচ্ছা করেন আর যা কঠিন তা ইচ্ছা করেন না।

(বিস্তারিত জানতে বইটি পড়ুন)

২) এ সম্পদ আমি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি”:  

এই ধরণের কথা মূলত শির্কে আসগার তবে কেউ সম্পত্তি প্রাপ্তির পিছনে আল্লাহ-র নিয়ামতকে অস্বীকার করে সরাসরি গায়রুল্লাহ-র নিয়ামত মনে করলে তা শির্কে আকবার হবে।

আল্লাহ বলেন- ‘তারা আল্লাহ-র নিয়ামত চিনে, এরপর অস্বীকার করে এবং তাদের অধিকাংশই কাফির’। –(নাহলঃ৮৩)–

এ আয়াতের বাখ্যায় মুজাহিদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,  এর অর্থ হচ্ছে কোন মানুষের এ কথা বলা- এ সম্পদ আমার যা আমার পূর্বপুরুষ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি।

সম্পদ প্রাপ্তি এক বিরাট নিয়ামত যা একমাত্র আল্লাহই দান করে থাকেন আর তা মানুষের হস্তগত করেন। এই নিয়ামতকে গায়রুল্লাহ-র সাথে সম্পৃক্ত করা শির্কে আসগার এবং গায়রুল্লাহকেই একমাত্র সম্পদ দাতা হিসেবে স্বীকার করলে তা শির্কে আকবার।

৩) নামকরণ:

আমাদের সমাজে শির্কে আসগারের সবথেকে বেশি লক্ষণ দেখা যায় নামকরনের ক্ষেত্রে। আমরা অজ্ঞতা বা অসাবধানতাবশত এক্ষেত্রে শির্কে আসগারে পতিত হই। যেমন-

* কাউকে কুদ্দুস ভাই, রাজ্জাক সাহেব এসব নামে ডাকা শির্কে আসগার ও তাওহীদ উল আসমা ওয়াস সিফাত এর পরিপন্থী। বলতে হবে আব্দুল কুদ্দুস, আব্দুর রাজ্জাক ইত্যাদি। অনেকে রসিকতা করে অনেক সময় কুদ্দুইস্যা বলে থাকে যা একেতো শির্ক আবার আল্লাহ-র নাম নিয়ে বিকৃত করার কারণে কঠিন গুনাহ।

* যাকের আলী(আলীর যিকিরকারী), যাকের হোসেন(হোসেনের যিকিরকারী ), আবেদ আলী(আলীর ইবাদাতকারী), আবেদ হোসেন(হোসেনের ইবাদাতকারী ), শাহজাহান [শাহ(বাদশাহ)+জাহান(দুনিয়া); এর অর্থ দুনিয়ার বাদশাহ, কিছু আলেম অবশ্য ইহজগতের দিকে ইঙ্গিত করে একে বৈধ বলেছেন তবে এরূপ নাম রাখা ঠিক নয়], জাহাঙ্গীর [জাহান(দুনিয়া)+গীর(ধারণকারী); দুনিয়া ধারণকারী একমাত্র আল্লাহ], আলমগীর(ফার্সি ভাষায় যা জাহান আরবীতে তাই দুনিয়া), আব্দুল মুত্তালিব(মুত্তালিব আল্লাহ-র কোন নাম নয় তাই আব্দুল মুত্তালিব রাখা না জায়েজ), আবুল হাকিম(হাকিম আল্লাহ-র নাম আর আল্লাহ-র কোন জন্মদাতা নেই) এসব নাম রাখা শির্ক।

* আমাদের দেশে বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে ‘দোজাহানের বাদশাহ’ বলা হয় যা শির্ক। দোজাহানের বাদশাহ একমাত্র আল্লাহ।

৪) উপরে আল্লাহ নিচে অমুক”:

এই ধরণের কথা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বহুল প্রচলিত হলেও না জায়েজ এবং শির্কের অন্তর্গত। মুলত বান্দার সকল কাজ আল্লাহ-র ইচ্ছায় হয়ে থাকে, এতে গায়রুল্লাহ-র কোন অংশ নেই অথচ উক্ত কথা দিয়ে বুঝান হয় যে নিচে অমুক ব্যাক্তি আল্লাহকে ওই কাজে সাহায্য করবে বা আল্লাহ-র অংশীদার হবে।

৫) প্রকৃতির খামখেয়ালীপনাপ্রাকৃতিক দুর্যোগ”:

আমাদের দেশে সাধারণত বন্যা, ঝড়, অতিবৃষ্টি, খরা ইত্যাদি অস্বাভাবিক অবস্থায় অনেকে একে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রকৃতির খামখেয়ালীপনা ইত্যাদি বলে থাকে যা শির্কে আসগার। বরং বলতে হবে- এগুলো আল্লাহ-র আযাব। আল্লাহ-র ইচ্ছা ছাড়া প্রকৃতির কোন ক্ষমতা নাই দুর্যোগ সৃষ্টি করার এবং সকল কিছুই পূর্ব নির্ধারিত। তাই এই অস্বাভাবিক অবস্থাকে প্রকৃতির দিকে নয় বরং আল্লাহ-র দিকে সম্পর্কিত করতে হবে এবং সম্পূর্ণভাবে তাকদীর কে স্বীকার করতে হবে ।

৬) হে আল্লাহ!যার হাতখানা তোমার ভাল লাগে তার হাতের ওসীলায় দুয়া কবুল কর”:

ইসলামী শরীয়াহ ওসীলার যে সীমারেখা বেঁধে দিয়েছে এই কথা তার স্পষ্ট পরিপন্থী যদিও আমাদের দেশে অনেক মাসজিদে অনেক ইমাম সাহেবদেরকে এই কথা বলে দুয়া করতে দেখা যায়। ওসীলার বৈধ সীমারেখা হল ৪ টি জিনিষের ওসীলায় দুয়া প্রার্থনা করাঃ

ঈমান (আলে ইমরানঃ৫৩), নেক আমল (বুখারী শরীফে ৩ জন সৎ ব্যাক্তির গুহায় আটকে পড়া ও প্রত্যেকের সৎ আমলের ওসীলায় দুয়া কবুল হওয়ার সুদীর্ঘ হাদিসটি এর প্রমাণ), আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম ও গুণাবলী (আরাফঃ ১৮০) এবং জীবিত সৎ মুসলিম ব্যাক্তির দুয়া (রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে অনেকে দুয়া চাইতেন) ; এর বাইরে অন্য কিছুর ওসীলা দিয়ে দুয়া চাওয়া বৈধ নয়। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে ঐ জীবিত সৎ মুসলিম ব্যাক্তিকে অবশ্যই দোয়াপ্রার্থীর সামনে উপস্থিত হতে হবে। দূর থেকে  ইয়া বাবা, ইয়া অমুক ইত্যাদি বলে দুয়া করা শির্ক কারণ এক্ষেত্রে ওই ব্যাক্তিকে গায়েবের খবর জানার দাবী করা হয়। তবে দূর থেকে টেলিফোনে দুয়া চাওয়া বৈধ। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল, কোন ব্যাক্তির কাছে সাহায্য চাইতে হলে ঐ ব্যক্তিকে ৩ টি শর্ত পূরণ করতে হবে- উপস্থিত, জীবিত ও সক্ষম । অনুপস্থিৎ বা মৃত ব্যাক্তিকে ডাকা শির্কে আকবার এবং কুফরী (কেন? দেখুন-রূমঃ ৫২)  আর ওই ব্যাক্তিকে উক্ত চাহিদা পূরণে সক্ষম হতে হবে যেমন- বৃষ্টির সময় কারো বাড়িতে আশ্রয় চাওয়া যা দেয়ার ক্ষমতা ঐ বাড়ির মালিকের আছে, কিন্তু উপস্থিত, জীবিত ব্যাক্তির কাছে সন্তান চাওয়া নাজায়েজ ও শির্কে আকবর কারণ এক্ষেত্রে তা দেয়ার ক্ষমতা ঐ ব্যাক্তির নাই।

৭) অমুক রোগ সংক্রামক”:

আবু হুরাইরা (রদিইয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল(সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন-  ‘দ্বীন ইসলামে সংক্রামক ব্যাধি, অশুভ আলামত বা দুর্ভাগ্য, পেঁচার ডাক ও সফর মাসের কোন রহস্য নেই’। –(বুখারী; মুসলিম শরীফে এ অতিরিক্ত কথাটুকু আছে- ‘নক্ষত্রের প্রভাবে বৃষ্টিপাত, রাক্ষস বা দৈত্য বলতে কিছুই নেই’)

বস্তুত কোন রোগের নিজে নিজে সংক্রমিত হওয়ার ক্ষমতা নাই বরং আল্লাহ-র ইচ্ছায় কখনও কখনও সংক্রমিত হয়ে থাকে। জাহেলী যুগে মানুষ ধারণা করত যে ব্যাধি নিজে নিজেই সংক্রমিত হয় যার ফলে আল্লাহ তাদের সে আকীদাকে বাতিল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ।

৮) হে আল্লাহ! তোমার মর্জি হলে আমাকে মাফ কর”:

আবু হুরায়রা বলেন, রাসূল ইরশাদ করেছেন-

‘তোমাদের মধ্যে কেউ যেন এ কথা না বলে। হে আল্লাহ! তোমার ইচ্ছা হলে আমাকে মাফ করে দাও, হে আল্লাহ, তোমার ইচ্ছা হলে আমাকে করুণা কর। বরং দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে। কেননা আল্লাহ-র উপর জবরদস্তি করার মত কেউ নেই’। –(বুখারী, মুসলিম)

উক্ত প্রকার বাক্য দ্বারা বুঝায় আল্লাহ-র কাছে ঐ বান্দার ক্ষমা পাবার তেমন কোন প্রয়োজন নেই এবং তার মাঝে বিনীত ভাবও নেই। এটা অহংকারী ও বিমুখতা অবলম্বনকারীদের কাজ। বরং দৃঢ় সঙ্কল্প নিয়ে আশা, ভয় ও ভালবাসার সাথে এবং শর্তবিহীনভাবে আল্লাহ-র কাছে দুয়া করতে হবে।

৯)বাক্যে যদি শব্দ ব্যবহার করা:

আমরা দৈনন্দিন জীবনে অগণিতবার শির্কে লিপ্ত হই যদি শব্দ ব্যবহার করে। যদি শব্দটি অতীতের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হারাম ও শির্ক, ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে আল্লাহ-র রহমত ও কল্যানের প্রতি আশাবাদ ব্যাক্ত করে বলা হলে তা বৈধ হবে তবে এক্ষেত্রে অহংকারবশত ব্যাবহার করলে তাও নাজায়েজ। কুরআন থেকে জানা যায় (আলে ইমরানঃ১৫৪) অতীতের ক্ষেত্রে যদি শব্দ ব্যবহার করা মুনাফিকদের আলামত, এছাড়া এক্ষেত্রে তাকদীর অস্বীকার করা হয়। এমন কতিপয় শির্কযুক্ত কথা – যদি কুকুর/হাঁস থাকত তাহলে বাড়িতে চোর আসত না, বাড়ির পাশে পুকুর ছিল বলে ডাকাত আসতে পারেনি, যদি অমুক মেডিক্যালে নিয়ে যেতাম তবে রোগী মরত না, যদি অমুক কাজ করতাম তবে এই বিপদ আসত না, যদি ওখানে যেতাম তবে এটা হত না, যদি ওখানে যেতে পারি তবে কাজটা করবই করব ইত্যাদি। তবে এগুলো জায়েজ- যদি বৃষ্টি হয় তবে স্কুলে যাবনা, যদি আল্লাহ সুস্থ করে দেয় তবে ইনশা আল্লাহ বাড়ি যাব, যদি বেতন পাই তবে ইনশা আল্লাহ ওটা কিনব…ইত্যাদি।

১০) বাক্যে এবংঅতঃপর ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা:

যেমন- যদি আল্লাহ চায় এবং অমুক চায়, যদি আল্লাহ ও অমুক না থাকত, আল্লাহ-র কসম এবং তোমার কসম, আল্লাহ যা চেয়েছেন এবং তুমি যা চেয়েছ,আল্লাহ ও আপনার কাছে আশ্রয় চাই ইত্যাদি বলা শির্কে আসগার। মানুষ এসব কথায় আল্লাহ-র উল্লেখ করে থাকে মূলত আল্লাহ-র উপর ভরসা বুঝাতেই তবে তা নিয়মতান্ত্রিক না হওয়ায় শির্কে পতিত হয়। এসব ক্ষেত্রে এবং এর বদলে বলতে হবে- ‘অতঃপর’; কারণ আল্লাহ-র ইচ্ছাই সর্বাগ্রে প্রযোজ্য এবং মানুষ আল্লাহ-র ইচ্ছার বাইরে কিছু ইচ্ছা করতে পারে না। উপরোক্ত কথা গুলা বলতে হবে এভাবে- যদি আল্লাহ চায় অতঃপর অমুক চায়, আল্লাহ যা চেয়েছেন অতঃপর তুমি যা চেয়েছ ইত্যাদি। তবে তাওহীদের পুর্ণতা হল ‘অতঃপর’ না বলে একমাত্র আল্লাহ-র কথা বলা।

আল্লাহ-ই সর্বাধিক অবগত ।

সহায়কঃ

‘কিতাবুত তাওহীদ ও এর বাখ্যা’

মূল- মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব(রহিমাহুল্লাহ),

বাখ্যা-  শায়খ সালেহ বিন আব্দুল আযীয মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম আলে শায়েখ

অনুবাদ- মুহাম্মাদ আব্দুর রব আফফান

অডিও ভাষ্য- শায়খ মতিউর রহমান মাদানী

প্রকাশনায়- আন নূর ইসলামিক লাইব্রেরী