পোস্ট এডমিশান নাইট: ভোর ৫ টার সময় করাঘাত, তড়িঘড়ি করে গেট খোলা:
– ম্যাডাম, আমার আব্বার রাতে অক্সিজেন দেয়া ছিলো, একটু আগে বড় দুইটা নিঃশ্বাস নিলো, তারপর থেকে আর কিছু বলছে না, একটু দেখবেন?
– চলুন, দেখি। (বুঝলাম, যা হওয়ার হয়ে গেছে)

মরা রোগী দেখে মোটামুটি এতই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, রোগীর ফেইস দেখেও আন্দাজ করে ফেলতে পারি মরে গেছে কিনা। যাহোক, রোগীর গা হাত পা ঠাণ্ডা, চেহারা দেখে মনে হলো: শেষ। কিন্তু যে সাইনগুলো দেখে আমরা মৃত্যু নিশ্চিত করি, সেগুলো নিয়ে ঝামেলায় পড়ে গেলাম। পালস: তখনও পাচ্ছি, আর ২ মিনিট পরেই পালস আর নেই। চোখ খুলে দেখি: পিউপিল পুরো ডাইলেটেড না। ওদিকে অক্সিজেন সিলিন্ডারে তখনও বুদবুদ চলছে। কিন্তু তাও আমার মনে হচ্ছে মরে গেছে অথবা যাচ্ছে। অগত্যা নার্সদেরকে এড্রেনালিন দিতে বললাম: শেষ চেষ্টা করে দেখা যায়। ইসিজি করতে বললাম….

৫ মিনিট পরেই সিস্টার রুমে এসে আবার নক: আপা, ইসিজি দেখেন, মরে গেছে। সার্টিফিকেট লিখে দেন। অতঃপর সার্টিফিকেট লিখতে বসা আর মনে মনে: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি’ঊন। আল্লাহুম্মাগফিরলী, আল্লাহুম্মাগফিরলাহু….

এই তিনমাসে আমার কাছে সবচে কষ্টকর মৃত্যু ছিলো ১৪ বছর বয়সের এক বাচ্চাছেলের মৃত্যু। আগের দিন পেশেন্ট রিসিভ করলাম, পিচ্চিটার সাথে কথা বললাম, ডায়াগনোসিস নিয়ে কনফিউশানে ছিলাম তাই স্যারকে ডেকে এনেও দেখালাম: এই বয়সের অসুস্থ বাচ্চা দেখলে আমার নিজের ভাইটার কথা মনে পড়ে, ও খুব চঞ্চল একটা ছেলে কিন্তু ও অসুস্থ হলে একদম বিরক্ত করেনা আর সবার মত। জ্বরে গা পুড়ে যায় আর ও আমার হাতটা ধরে বলে: আমার বিলাই(ও আমাকে বিলাই বলে ডাকতো ছোটবেলা)। ওর একবার জন্ডিস হয়েছিলো, এত অসুস্থ হয়ে গেছিলো, ওর অসুস্থ মুখটা দেখেই কান্না পেতো…. এই পিচ্চিটাও এমনভাবে বুঝতে পারছি ভেতরে খুব কষ্ট হচ্ছে কিন্তু বাইরে তার প্রকাশ নেই। দু’আ করেছিলাম: আল্লাহ, বাচ্চাটাকে সুস্থ করে দিন। ভাবিনি, এতটাই খারাপ হয়ে যাবে একদিনের মধ্যে।

পরদিন ডিউটিতে এসেই শুনি হাউমাউ, গলা ফাটিয়ে কান্নাকাটি। কি হয়েছে? ঐ পিচ্চিটা মারা গেছে: ইন্না লিল্লাহ! ছুটে গেলাম, মুখটা আবারও দেখলাম, গতকাল যার সাথে জীবিত কথা বলেছি, সে এখন নিথর। মা টাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলাম….

অনেকেই ভাবতে পারেন: এই আপা ডাক্তার, বাচামরা নিয়েই কাজ সারাদিন, তাও দুইদিন পর পর এত মৃত্যু নিয়ে বক বক করে কেন? কারণ হচ্ছে: আমি চাইনা, মৃত্যুটা আমার কাছে কিংবা আমার কলিগদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে যাক। এত এত মৃত্যু আমরা দেখি যে, ওদিকে ডেথ সার্টিফিকেট লিখছি, এদিকে গল্প চলছে। এক স্যার একবার বলেছিলেন:
তোমরা নতুন, তাই মৃত্যুকে খুব কঠিন মনে হয়, কিন্তু আমাদের কাছে এতই নর্মাল হয়ে গেছে যে, নিজের হাতের উপর বাবা মা মারা গেছে, তাও অস্বাভাবিক লাগেনি, তোমাদেরও এমনই হয়ে যাবে।

এই ‘স্বাভাবিক’ হওয়াটাই চাইনা, চাইনা মৃত্যুকে ভাত মাছ মনে করতে, যদিও আমাদের প্রোফেশানটাই এমন যে বাধ্য করে। আমি ভাবতে চাই: যে মুহুর্তে আমি পালস পাচ্ছিলাম না কিন্তু পিউপিল তখনও ডাইলেট হয়নি, ঐ মুহুর্তে ঐ রোগীটির জান কবজ করা হচ্ছিলো, হয়তো ঐ মুহূর্তে বাইরে আমি টেস্ট করছি আর ভেতরে মালাকুল মউত তার রুহ টেনে বের করছে। খুব সহজ?? উহু, মোটেই না। আল্লাহর রাসূল পর্যন্ত মৃত্যুর আযাব থেকে, মৃত্যুর ফিতনা থেকে পানাহ চেয়েছেন। মৃত্যুযন্ত্রণার স্বরূপ নিয়ে অনেক হাদীস ও আসার পাওয়া যায়, এর মধ্যে কা’ব রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনাটি এরকম:

“মৃত্যু হল একটি কাঁটাযুক্ত গাছের ন্যায়। সে গাছটি আদম সন্তানের দেহে প্রবেশ করিয়ে দিলে তার প্রতিটি কাঁটা শিরা উপশিরায় গেঁথে গেল। অতঃপর কোন শক্তিশালী ব্যক্তি সেটা ধরে টান দিলে তার কিছু অংশ ছিঁড়ে চলে এল আর কিছু অংশ রয়ে গেল।”

যে মুহুর্তে আমরা মনে করছি: জাস্ট মৃত্যু, সেই মুহূর্তে ওর দফারফা হয়ে যাচ্ছে; হয়তো শয়তান শেষবারের মত তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে, তার জান্নাত জাহান্নামের ফায়সালাও হয়ে যাচ্ছে…. ভাবা যায়? যার মৃত্যু হলো, তার তো কিয়ামত শুরুই হয়ে গেলো, বারযাখের জীবনে পা দিয়ে ফেললো। আমরা যেন এই চিন্তাটুকু করতে ভুলে না যাই:
প্রতিটি মৃত্যুই আমার জন্য একটি করে রিমাইন্ডার, ওরতো রোজ কিয়ামত শুরু হয়েই গেলো, এই অবস্থানে আমাকেও যেতে হবে, মালাকুল মউত আমাকে আজ ছেড়ে দিলেন, সময় হলে আর একটা মুহূর্তও অপেক্ষা করবেনা। আশেপাশের মানুষগুলো এভাবেই ‘জাস্ট মৃত্যু’ ভেবে হাসি-গল্পে মত্ত হয়ে যাবে, কিন্তু আমার আযাব- গজবের ওখানেই শুরু, মিথ্যে জীবনের শেষ, এরপর পুরোটাই সত্য জীবন: যে জীবনে মানুষ তা-ই চাক্ষুস দেখবে যা সে হায়াতের জিন্দেগীতে অস্বীকার করে এসেছিলো।

হাদীসে বলা হয়েছে: আকছিরূ যিকরা হা-যিমিল লাযা-ত। অর্থাৎ, ‘জীবনের স্বাদ বিনষ্টকারী মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো।’

আসুন, মৃত্যু নিয়ে প্রতিদিন ভাবি, প্রতি মুহূর্তে ভাবি, পাশের মানুষটিকে ভাবাই; এই ভাবনা-চিন্তার মত জরুরী আর নেই। যে জানে এবং ইয়াক্বীন রাখে: মৃত্যু অমোঘ, মুহুর্তের ব্যবধানে তার দুনিয়ার জীবনের সব মিথ্যে হয়ে যাবে, সে কি মৃত্যুকে ভুলে দুনিয়ার মোহে ছুটতে পারে?
‘ভাই, এইতো আর কদিন যাক, নামায শুরু করবো’ ‘এইতো আরেকটু গুছিয়ে নিই, পর্দা শুরু করবো’…. মালাকুল মউত আমাকে গুছিয়ে নেবার সময় দেবে তো???