কজন ‘আলিমের বক্তব্য শুনছিলাম। পরিবারের ভিতরে পারস্পরিক সম্পর্কগুলো মজবুত রাখতে হবে কীভাবে তা নিয়ে কথা বলছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বললেন, ‘ইবাদাহ দিয়ে পরিবারের বন্ধন দৃঢ় হয় না, বন্ধন দৃঢ় হয় আখলাক দিয়ে। এরপর বাখ্যা করলেন বিষয়টা। আমি তাঁর কথাগুলো কাছাকাছি নিজের ভাষায় বলছি-

পরিবারের ভিত্তি হবে ‘ইবাদাহ কিন্তু সেই পরিবার সাজাতে হবে আখলাক দিয়ে। ফরয-ওয়াজিব অন্তত আদায় করে এমন কাউকেইতো পছন্দ করতে হবে জীবনসঙ্গী হিসেবে। কিন্তু আদর্শ পরিবার গড়ে তুলতে হলে শুধু সালাত-সিয়াম-তাহাজ্জুদগুজার হওয়াই যথেষ্ট নয়। একারণেই অনেক প্র্যাক্টিসিং মুসলিম পরিবারেও অশান্তি লেগেই থাকে। অথচ সেখানে সালাত-সিয়াম-দারসের কমতি হয়না কখনো। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? এই বিষয়ে রাসূল(সা) তাঁর গৃহাভ্যন্তরে কেমন ছিলেন সেদিকে তাকানোই যথেষ্ট।

ঘটনা-১:
একবার ইথিওপিয়া থেকে কিছু লোক এসে মাসজিদ আন নববীতে তরবারি খেলা দেখাচ্ছিল। আয়েশা (রা) রাসূল(সা) কে বললেন তিনি খেলা দেখতে চান। এমন অবস্থায় আমরা হলে কী বলতাম? “হ্যাঁ!! উম্মাহর এই অবস্থা আর তুমি চাও খেলা দেখতে!! ছি! যাও যাও কুরআন পড়…তাফসীর পড়…” অথচ রাসূল(সা) আয়েশাকে নিয়ে গেলেন এবং তাঁকে আড়াল করে সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহর পিছনে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতে লাগলেন। এত দীর্ঘ সময় তিনি খেলা দেখলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বারবার এক পা থেকে আরেক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন। তিনি আয়েশা(রা)কে জিজ্ঞেস করলেন যে তাঁর দেখা শেষ হয়েছে কিনা। আয়েশা বললেন তিনি আরো দেখতে চান। কোন আপত্তি না করে রাসূল(সা) সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকলেন। দীর্ঘক্ষণ পর আয়েশা(রা) নিজেই ক্লান্ত হয়ে বললেন যথেষ্ট হয়েছে। এরপর রাসূল(সা) তাঁকে বাসায় নিয়ে আসলেন।

ঘটনা-২:
রাসূল(সা) তাঁর দুই নাতী হাসান আর হোসেনকে নিয়ে ঘোড়া ঘোড়া (আমাদের দেশীয় ভাষায়) খেলছেন। মানে, চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে ঘোড়া সেজেছেন আর হাসান-হোসেনকে পিঠে বসিয়ে সারা ঘর চক্কর দিচ্ছেন। এ অবস্থায় এক সাহাবী ঘরে ঢুকে এই দৃশ্য দেখে মজা করে বললেন, “বাহ! সাওয়ারীটাতো খুব সুন্দর।” রাসূল(সা) মজা করে উত্তর দিলেন, “সাওয়ার যারা হয়েছে তারাওতো সুন্দর।” [অথবা এমনটিই বলেছেন, এর কিছু কম বা বেশি]

ঘটনা-৩:
একদিন সালাতের মধ্যে রাসূল (সা) সিজদায় গেছেন এমন অবস্থায় হাসান এসে তাঁর পিঠে উঠে বসল খেলার জন্য। একবার হাসান বসেন, আরেকবার হোসেন। রাসূল(সা) কী করেছিলেন ? যতক্ষণ না তাদের খেলা শেষ হয় ততক্ষণ সিজদাহ থেকে মাথা ওঠাননি। এমনকি তাদেরকে নেমে যাওয়ার জন্য ইঙ্গিতও করেননি। আর এখন মাসজিদে বাচ্চা ছেলেদের সাথে আমরা এবং অনেক হুজুররাও এমন আচরণ করেন যেন বাচ্চাদের কারণে তাদের সালাতটাই নষ্ট হয়ে গেছে। এতে মাসুম বাচ্চাদের মনে দাড়ি-টুপিওয়ালাদের সম্পর্কেই একটা ভীতিকর ধারণা তৈরী হয়। অথচ আমাদের দ্বীন পুরো উল্টোটাই শেখায়।

ঘটনা-৪:
আয়েশা(রা)তখন ছোট। রাসূল(সা) কোন এক সফর থেকে ফিরছিলেন। সাথে ছিলেন আয়েশা। তিনি সাহাবীদেরকে বললেন সামনে এগিয়ে যেতে। তাঁরা চোখের আড়াল হলে রাসূল(সা) আয়েশাকে দৌড় প্রতিযোগীতায় আহ্বান করলেন। আয়েশা জিতে গেলেন সেইবার। এর কয়েকবছর পর একই সিনারিও। আবার রাসূল(সা) আয়েশাকে দৌড় প্রতিযোগীতায় আহ্বান করলেন। এবার রাসূল(সা) জিতে গিয়ে মজা করে বললেন, “এইটা আগেরটার শোধ।” [অথবা এমনটিই বলেছেন]

উপরের ঘটনাগুলোর কোনটাই ‘ইবাদাহ-র সাথে জড়িত নয়। ইবাদাহ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ তবে পরিবারে শান্তি আর আনন্দের জন্যও আমাদের রাসূল(সা) এর দুনিয়াবী আচরণগুলোর দিকে তাকাতে হবে। তিনি কেমন স্বামী ছিলেন, কেমন নানা ছিলেন, কেমন শ্বশুর ছিলেন, কেমন পিতা ছিলেন এগুলো না জেনে সারা দিনরাত শুধু দারস করলেই পরিবারে শান্তি আসবে না। আল্লাহু আ’লাম।