ইএনটি ওটিতে ঢুকতেই আপাদমস্তক তাকিয়ে স্যার বললেন:
যাও যাও, তোমাকে দিয়ে হবেনা, বোরখা পরেনা এমন কাউকে পাঠাও….

আই ওটিতে ঢুকতেই স্যারসহ নার্সদের অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা: তোমার অবস্থাতো খুবই খারাপ, এখানে স্টেরিলাইজেশন খুব জরুরী, এটাও বোঝনা?? ব্লা ব্লা….

অপমানিত হয়ে স্বেচ্ছায় বেরিয়ে আসি, আর অবাক হয়ে ভাবি:
মুসলিম মেজরিটির দেশে থেকে একজন মুসলিমাহ হয়ে মুসলিমদের কাছেই হিজাব/নিক্বাব নিয়ে কথা শুনতে হচ্ছে, আফসোস! স্টেরিলাইজেশনের ব্যাপার কি আমার অজানা?? ওটি ড্রেস পরতে হবে, অপারেশন এজিস্ট করতে গেলে হ্যান্ডগ্লাভস খুলেই করতে হবে এটাতো আমি জানিই। হ্যান্ডওয়াশ কিভাবে নিতে হয় সেটাও আমার অজানা নয়। কিন্তু আশ্চর্য, অন্য ইন্টার্নরা নর্মাল পোশাক পরে রাস্তা দিয়েই এসেছে, আমি আবায়া পরেও একই রাস্তা দিয়েই এসেছি, আমার ড্রেস আনস্টেরাইল হলে ওদেরটা কেন নয়? ওরা কি বাসা থেকে কাপড় চোপড় অটোক্লেভ করে এসছে??

উহু, অপমান এখন আর লাগেনা, গা সহা হয়ে গেছে, আলহামদুলিল্লাহ। সেই যে হলিক্রস কলেজ থেকে সিস্টারদের কাছে ফুলস্লীভ ড্রেস আর হিজাব নিয়ে নিত্যদিন অপমানিত হওয়া, সেই থেকে শুরু: এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দেয়া, রাগগুলো ঢোক গিলে হজম করা: পর্দা ফরজ: ফরজ-ওয়াজিবে ছাড় চলেনা, আপনি একটা ঝাড়ি দিলেই আমি আমার পর্দা বিকিয়ে দিতে পারিনা। আপনার মুখ আছে বলেন, আমার কান আছে শুনি, তবে মহাবিচারকের বিচারশালায় এই পট উলটে যেতে পারে, যখন আমার মুখ থাকবে, আপনাকেই শুনতে হবে….

মুখের কথারও ভদ্রতা আছে, ধর্মকে সম্মান দিতে হলে সবসময় ধার্মিক হওয়াও লাগেনা। মেডিসিন সেন্ট্রাল ওয়ার্ড করেছি, ইউনিটের হেড ছিলেন সরকারী দলের নেতৃস্থানীয়, অবাক হয়েছি, উনি ড্রেসআপ নিয়ে সামান্য প্রশ্নও কখনও তোলেননি তিন মাসের মধ্যে। নেফ্রো ওয়ার্ডে ডিউটি করেছি, স্যারেরা মুভি মিউজিক দেখা মানুষ, কিন্তু আমাদের দুইজন নিক্বাবী ইন্টার্নকে সম্মান করতেন, খাবার আনলেই প্রথমে আমাদের ডেকে বলেছেন: তোরা আগে খেয়ে আয়, এরপর আমরা বাকিরা খাই…. মন থেকেই দু’আ আসে উনাদের জন্য, আল্লাহ স্যারদের কবুল করুন।

এ প্রজন্মের ডাক্তার আপু, ভাই, বন্ধু যারা আছেন, আপনি হিজাবী, নন হিজাবী, নিক্বাবী কিংবা পুরুষ যে-ই হন না কেন, আপনি যখন মিড লেভেলে যাবেন, তখন আপনার ‘say’ থাকবে, ইন্টার্নদের ‘say’ নেই, এইটুকু অনুরোধ করবো: নিক্বাবী বোনদের জন্য একটু ক্ষেত্র সৃষ্টি করার চেষ্টা করবেন, স্যারদের একটু বুঝিয়ে বলবেন: এই মেয়েগুলো নিক্বাবী হলেও ‘স্টেরিলাইজেশন’ সম্পর্কে আর সবার মত তারাও পড়ে এসেছে, তারাও সবকিছু জানে, তাদেরকে পর্দা রক্ষা করেই স্টেরিলাইজেশন মেইন্টেইন করতে দিন না! যে মেয়েটা পর্দার জন্য গাইরে মাহরামের সামনে আওরাহ আনকাভার করেনা, সে হ্যান্ডওয়াশ নেয়ার সময় কনুই পর্যন্ত কাপড় তুলে হাত ধোয়ার কাজটা একটু পর্দার আড়ালেই করুক না! আপনার তো কাজটা ঠিক হওয়া জরুরী, তার পোশাক আবায়া হোক আর নর্মাল হোক, তার সাথে কাজের সম্পর্ক কী? সার্জনের স্পেশ্যালিটি হাতের দক্ষতায়, পোশাকের বিশেষত্বে নয়, এইটুকু বুঝতে বোধহয় বেশি জ্ঞানের দরকার পড়েনা।

আল্লাহর নির্দেশ নিজে পালন করতে না পারুন, যে বোনটি পালন করতে চাইছে, তাকে হেল্প করুন; যে ভাইটি জামাতে নামায মিস করেনা, তাকে কাজে আটকে না রেখে অন্য কাউকে ধরিয়ে দিন- হতেও পারে এইটুকু ‘ইকরাম’ এর কারণেই আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করবেন।

বিনীত:
ডাক্তার নিশাত তামমিম,
ইন্টার্ন(২০১১-১২), রামেকহা।