বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম

৯৫০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে বাগদাদের পতন (১২৫৮ খ্রীষ্টাব্দ):

ফিক্বহ বিবর্তনের এই পর্যায়টি ৯৫০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১২৫৮ খ্রীষ্টাব্দে বাগদাদের পতন পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সময়কালেই আব্বাসীয় খিলাফতের পতন শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায়। পূর্ববর্তী পর্বগুলিতে আমরা ফিক্বহশাস্ত্র বিবর্তনের যে ধাপগুলি আলোচনা করেছি তার সাথে বর্তমান সময়ের ফিক্বহশাস্ত্রের গতি-প্রকৃতির মিল খুঁজে পেতে হলে এই সময়কালে ফিক্বহশাস্ত্রের প্রতি নজর দেওয়া জরূরী।

৮৫০-৯৫০ খ্রীষ্টাব্দের মতই এই সময়েও আব্বাসীয় খলীফাদের পৃষ্ঠপোষকতায় Court Debate এবং Hypothetical Fiqh এর মাত্রাতিরিক্ত প্রসার ঘটে। এইসব Debate এর কিছু আবার বই আকারে সংকলিত হয়। সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন মাজহাবের মধ্যে এসব Debate এ জেতার বাসনা তীব্র আকার ধারণ করে এবং ‘উলামাগণ ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই প্রতিযোগীতা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বিভিন্ন মাজহাবের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়তে থাকে। আমরা আগের পর্বে দেখেছি কিছু কিছু মাজহাব বিলুপ্ত হয়ে মাত্র চারটি মাজহাব টিকে থাকে এবং এই চারটি মাজহাব এই সময় প্রণালীবদ্ধ করা হয়। এই চারটি মাজহাব এত বেশী বিস্তৃতি লাভ করে যে মানুষ ধীরে ধীরে ভুলেই যায় অন্যান্য মাজহাবের এককালীন অস্তিত্বের কথা।

এই সময়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল এই সময় থেকেই কিছু কিছু ‘আলিম তাঁদের নামের সাথে সংশ্লিষ্ট মাজহাবের নাম যুক্ত করার নতুন রীতি চালু করেন। যেমন- শারহ আস সুন্নাহ-র লেখক আল হুসাইন ‘ইবনু মাস‘উদ আল বাগাভী পরিচিত হতেন আল হুসাইন ‘ইবনু মাস‘উদ আল বাগাভী আশ শাফিঈ নামে। কেউ কেউ আবার নামের সাথে যুক্ত করেন ‘আল মু’তাযিলী’, ‘আল আশ‘আরি’, ‘আস সালাফি’ ইত্যাদি। কোন কোন সুফি ঘরানার ‘আলিম তাঁদের নামের সাথে যুক্ত করেন ‘আল জিলানী’, ‘আল চিশতী’, ‘আল কাদেরি’ ইত্যাদি।

এই পর্যায়ে বিভিন্ন মাজহাবের ‘উলামাগণ তাঁদের নিজ নিজ মাজহাবের কথিত প্রতিষ্ঠাতার (সম্মানিত ৪ ইমাম) বিভিন্ন ফতোয়া নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেন এবং সেগুলোর পিছনের মূলনীতিগুলি সংকলিত করেন। যেসব ক্ষেত্রে ইমামগণের নিজস্ব গবেষনা তাঁরা পেতেন না সেসব ক্ষেত্রে তাঁরা সীমিত পরিসরে নিজেরাই ইজতিহাদ করতেন। কিন্তু Court Debate এর ভিতর-বাইরে Hypothetical Fiqh এর প্রসারের কারণে ধীরে ধীরে এই সীমিত ইজতিহাদও বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিটি মাজহাবের উসূল গ্রন্থাকারে সংকলিত হওয়ায় এই সময় ‘উলামাগণ কোন নতুন সমস্যার মুখোমুখি হলে নিজ নিজ মাজহাবের উসূল এর আলোকে ইজতিহাদ শুরু করেন এবং এই নতুন প্রথাকে বলা হয় ইজতিহাদ মাজহাবী

এই সময়ে ‘উলামাগণের মধ্যে আরও দুটি নতুন ধারা দেখা যায়- তারজীহ ও তাসহীহ। ‘তারজীহ’ হল কোন একটি বিষয়ের সমাধানে কোন একটি মাজহাবের মধ্যেই একাধিক মতের মধ্যে একটি মত বেছে নেওয়া। সম্মানিত ৪ ইমাম ছাড়াও প্রতিটি মাজহাবের পরবর্তী ‘উলামাগণ কখনো কখনো পূর্বের মত পরিবর্তন করতেন। ফলে উভয় মত মাজহাবগুলির নিজ নিজ গন্থগুলিতে সংকলিত হয় এবং এভাবে কোন একটি বিষয়ে একটি মাজহাবের মধ্যেই একাধিক মত গড়ে উঠে। এছাড়াও এই সময় সম্মানিত ৪ ইমামের নামে প্রচলিত দূর্বল ও বানোয়াট কথাগুলি প্রতিটি মাজহাবের ‘উলামাগণ চিহ্নিত করেন এবং ৪ ইমামের নামে প্রচলিত ফতোয়াগুলি বিশুদ্ধতার ভিত্তিতে শ্রেণীবিন্যস্ত করেন। একে বলা হয় ‘তাসহীহ’।

এই সময় ফিক্বহগ্রন্থ সংকলনের একটি নতুন পন্থা উদ্ভূত হয় যা বর্তমান সময় পর্যন্ত চলে আসছে। বিভিন্ন ইস্যুগুলিকে একটি শিরোনামের মধ্যে এবং বিভিন্ন শিরোনামগুলিকে একটি অধ্যায়ের মধ্যে লিপিবদ্ধ করা হয়। এমনকি অধ্যায়্গুলির ক্রমবিন্যাসের একটি সাধারণ ধারা অনুসরণ করা হয়। ধারাটি এমন-

তাহারাহ>সালাহ>সাওম>যাকাহ>হাজ্জ্ব>নিকাহ>তালাক>বায়’(ব্যাবসায়িক চুক্তি)>আদাব ।

ঈমান এর আলোচনা ছিল আক্বীদা গ্রন্থগুলির অন্তর্ভূক্ত। তাই এসব বইতে ঈমান এর আলোচনা করা হত না। বইগুলি লিখার সময় ‘উলামাগণ কোন একটি ইস্যুতে বিভিন্ন মাজহাবের মত ও তাদের দলীলগুলি তুলে ধরতেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজ মাজহাবের মত ও তার দলীলের যথার্থতা প্রমাণ করতেন।

এভাবে প্রতিটি মাজহাবের নিজস্ব গবেষনা ও কর্মপন্থার পার্থক্যের বিস্তৃতির কারণে মাজহাবগুলির মধ্যে দূরত্ব দিন দিন বাড়তে থাকে।

বাগদাদের পতন থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ঃ

এই সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হল ১২৯৯ খ্রীষ্টাব্দে তূর্কি নেতা উসমান ১ এর দ্বারা অটোমান সাম্রাজ্যের উত্থান। এই সময়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল ‘তাক্বলীদ’(কোন একটি নির্দিষ্ট মাজহাবের অন্ধ অনুসরণ) এবং দলাদলি। এর আগের পর্যায়ে নিজ মাজহাবের উসূল এর আলোকে ইজতিহাদ করা হত কিন্তু এই পর্যায়ে এসে ইজতিহাদ একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। এই সময়ের ফিক্বহ গ্রন্থগুলিতে কেবলমাত্র পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলির উপর বাখ্যা লিখা হত এবং নিজ মাজহাবের বিস্তারে সেগুলো ব্যাবহার করা হত। এই সময়ে ফিক্বহশাস্ত্র তার গতি হারিয়ে ফেলে এবং স্থবির হয়ে পড়ে। নতুন ইজতিহাদ বন্ধের ফলে অনেক ইসলামী আইন তার যুগোপযোগীতা হারিয়ে ফেলে এবং এই সুযোগে কিছু পাশ্চাত্য আইন সংশ্লিষ্ট ইসলামী আইনের স্থান দখল করে। ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের ক্রমাগত বিস্তৃতি এবং ইসলামী সাম্রাজ্যের ভাঙ্গনের ফলে অনেক স্থানে ইসলামী আইনের স্থান দখল করে ইউরোপীয় আইন এবং অটোমান খিলাফাতের সম্পূর্ণ পতনের ফলে প্রায় সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ইউরোপীয় আইন ইসলামী আইনের স্থান দখল করে।

পূর্ববর্তী পর্যায়ে লিখিত ফিক্বহ গ্রন্থগুলিকে এই পর্যায়ে এসে সংক্ষিপ্ত আকারে পুনরায় লিখা হয়। এমনটি করা হত মূলত মুখস্থের সুবিধার্থে। কিছু কিছু গ্রন্থকে আবার কাব্যরূপ দেওয়া হয়। এভাবে বারবার সংক্ষিপ্তকরণ এর ফলে একসময় ছাত্রদের কাছে তা বোঝা দুরূহ হয়ে পড়ে। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের ‘উলামাগণ সেগুলোর বাখ্যা লিখতে শুরু করেন, তার পরবর্তী ‘উলামাগণ ঐসব বাখ্যার উপর মন্তব্য লিখতেন এবং অন্যান্যরা ঐ মন্তব্যের সাথে পাদটীকা যোগ করতেন।

এই সময়ে এসে উসূল আল ফিক্বহ এর উপর বেশ কিছু বই লিখা হয়। এই বইগুলিতে ইজতিহাদ এর সঠিক পদ্ধতি এবং তা প্রয়োগের শর্তাবলী লিপিবদ্ধ করা হয়। তবে এসব শর্ত এতই কঠিন ছিল যে ঐ সময়ের তো বটেই, এমনকি তার পূর্ববর্তী পর্যায়ের অনেক ‘আলিমও সেগুলো পূরণ করতে ব্যর্থ হতেন।

এই পর্যায়ের শেষের দিকে অটোমান খলীফাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামী আইন লিপিবদ্ধকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং এই উদ্দেশ্যে সাতজন শীর্ষস্থানীয় ফুকাহার সমন্বয়ে একটি প্যানেল গঠন করে এই কাজের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। তারা প্রত্যেকেই ছিলেন হানাফী মাজহাবের তাই শেষ পর্যন্ত যে সংবিধানটি দাঁড়াল তা হল শুধু হানাফী মাজহাবের ফসল। অটোমান খলীফা একে সমগ্র অটোমান সাম্রাজ্যের সংবিধান হিসেবে ঘোষণা করেন এবং এর নাম দেওয়া হয় ‘মাজাল্লাহ আল আহকাম আল আদিলাহ’।

এই সময় অবশ্য কিছু সংস্কারক বিশুদ্ধ ইসলামের দিকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান করতে থাকেন তবে বিভাজন কেবল বাড়তেই থাকে যা বর্তমান সময়েও চলছে।