বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম

আমরা যখন প্রথম প্রথম ইসলাম প্র্যাক্টিস করতে শুরু করি তখন সাধারণত দুইটা Extreme মতের যেকোন একটার খপ্পরে পড়ে যাই। এর একটা হল- অন্ধভাবে কোন একটা মাজহাবকে অনুসরণ করা এবং কখনো কখনো একে ‘ওয়াজিব’ বলে মেনে নেওয়া ও প্রচার করা। অন্যটি হল- সমস্ত মাজহাবকে ছুঁড়ে ফেলে ‘কুরআন-হাদীস ছাড়া কিচ্ছু মানিনা’ টাইপ কথা বলা। এই দুই মতেরই ভয়াবহ সমস্যা আছে।

প্রথম মতের সমস্যা হল এটা মুসলিমদের মধ্যে শুধু বিভেদ আর দলাদলিই বাড়ায়, কাজের কাজ কিছুই হয় না। আর দ্বিতীয় মতের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে প্রথম তিন শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম ছাড়াও পরবর্তী ‘উলামাগণের নিরলস সাধনা ও ফিক্বহশাস্ত্রের গবেষণাকে তাচ্ছিল্যভরে ছুঁড়ে ফেলা হয়। একটা বাস্তব উদাহরণ দিলে সমস্যাটা আরও ভালভাবে বুঝা যাবে। ১৪০০ খ্রীষ্টাব্দের পরবর্তী সময়ে হানাফী আলেমগণ ফতোয়া দেন কোন হানাফী মাজহাবের অনুসারীর সাথে শাফিঈ মাজহাবের অনুসারীর বিয়ে বৈধ নয়!! এই ফতোয়া পরবর্তী কয়েকশ বছর চলেছিল। পরে কিছু হানাফী আলেম আবার ফতোয়া দেন যে হানাফীরা শাফিঈদেরকে অন্তত আহলে কিতাব এর সম্মান দিতে পারে এবং এজন্য হানাফী পুরুষদের সাথে শাফিঈ মহিলাদের বিয়ে বৈধ তবে শাফিঈ পুরুষদের সাথে হানাফী মহিলাদের বিয়ে অবৈধ!!! লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

এইত গেল প্রথম মতের সমস্যা। আরেকটা ঘটনা বলি। ভারতের চেন্নাই এর এক ‘স্যুডো স্কলার’ ফতোয়া দিলেন যে কোন সম্পদের উপর একবার যাকাত দিলে তার উপর আর দ্বিতীয়বার যাকাত দেওয়ার দরকার নেই। কোন নতুন সম্পদ হস্তগত হলে এবং নিসাব পরিমাণে পৌঁছালেই কেবল তার উপর যাকাত দিতে হবে। কারণ যাকাত এর উদ্দেশ্য সম্পদ পবিত্র করা। সুতরাং একবার সম্পদ পবিত্র হয়ে গেলে তার উপর আর যাকাত দেওয়া লাগবে না। (বিস্তারিত জানতেঃ The Chennai Treatise; Dr.Bilal Philips) অথচ এই মতটি কুরআন, সুন্নাহ, সকল মাজহাব এবং বিগত ১৪০০ বছরের মুসলিম উম্মাহর ‘উলামাগণের ইজমার বিরোধী। এই ফতোয়াটি তখন স্বাভাবিকভাবেই ব্যাবসায়ী মহলের কাছে অত্যন্ত আনন্দদায়ক হয়েছিল এবং তারা সহ আরও অনেকে বিভ্রান্ত হয়েছিল। পূর্ববর্তী ‘উলামাগণের গবেষনাকে প্রত্যাখান করে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ছাড়াই কুরআন ও হাদীস থেকে ফতোয়া বের করতে গেলে কী হতে পারে তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ এটি।

তাই এই দুই মতের মাঝামাঝি আমরা কীভাবে চলব তা জানতে হলে ফিক্বহ বিবর্তন ও মাজহাব আগমনের ইতিহাস সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরূরী। আমরা তাই এই সিরিজে ফিক্বহ বিবর্তনের ধারাকে ৭ টি পর্যায়ে ভাগ করে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ-

(১) রাসূল(সা.) এর নবুওয়্যাতের যুগ

(২) খুলাফায়ে রাশেদা ও উমাইয়া খলিফাদের যুগ

(৩) আব্বাসীয় খলিফাদের যুগ

(৪) বিভিন্ন মাজহাবের আগমন

(৫) অন্যান্য বিলুপ্ত মাজহাব

(৬) ৯৫০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে বাগদাদের পতন ও এরপর থেকে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের যুগ

(৭) তাক্বলীদঃ আগমন, কারণ ও আমাদের করণীয়

মূল আলোচনায় আসার আগে আমরা দুইটা Basic Islamic Term সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নিয়ে নিই- ‘শারী’আহ’ ও ‘ফিক্বহ’। এতে পরবর্তীতে আলোচনার সাথে খাপ খাওয়াতে সুবিধা হবে ইনশাআল্লাহ।

শারী‘আহঃ রাসূলুল্লাহ (সা.) এর উপর নাযিলকৃত ওয়াহী ও বিধান যা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহয় সংরক্ষিত হয়েছে তাই শারী‘আহ। শারী‘আহ সময়ের সাথে অপরিবর্তনীয় এবং এতে বেশিরভাগ সমস্যার সাধারণ Guideline দেওয়া হয়েছে, Specific নয়।

ফিক্বহঃ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামের বিধিবিধান বের করার বিজ্ঞানই হল ফিক্বহশাস্ত্র। এটি সময় ও পরিবেশের সাথে পরিবর্তনীয় এবং বিভিন্ন সমস্যার Specific সমাধান দেয়, General নয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নবুওয়্যাতের যুগ (৬০৯-৬৩২ খ্রীষ্টাব্দ)

এই সময় ইসলামী বিধিবিধানের একমাত্র উৎস ছিল কুরআন ও সুন্নাহ। এসময়ই কুরআন ধাপে ধাপে নাযিল হতে থাকে এবং কুরআনের বাইরেও রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে ওয়াহী আসতে থাকে আর এটাই হল সুন্নাহ। কুরআনের আয়াতগুলি নাযিল হত মূলত দুইটি প্রেক্ষাপটে-

(১) মুসলিম ও অমুসলিমদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে (২:২১৭,২১৯,২২২ ইত্যাদি)

(২) বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে (২৪:৬-৯)

অনেকেই প্রশ্ন করে থাকে কুরআন একেবারে পুরোটা নাযিল না হয়ে ধাপে ধাপে নাযিল হল কেন? এর কারণও মূলত দুইটি-

(১) ধীরে ধীরে অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষকে উপযোগী করে তোলা ও

(২) বিধানগুলির কারণ, যৌক্তিকতা এবং ফলাফল মানুষের মনে দৃঢ়ভাবে গেঁথে দেওয়া।

কুরআন বিশারদগণ কুরআনিক বিধানগুলির চারটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। এতে মানুষের জন্য যেমন কঠিন কিছু নেই(২:১৮৫,২৮৬; ৪:২৮; ৫:৪৪; ২২:৭৮) তেমনি ধর্মীয় আবশ্যিক কাজগুলির পরিমাণ কমানোর মাধ্যমে মানুষকে ইবাদাতে প্রশান্তি দেওয়ার ব্যাবস্থা করা হয়েছে(৫:৩,৫)। এছাড়াও জনসাধারণের ব্যক্তিগত, আধ্যাত্নিক, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণ(২:২৪০,২৩৪) সাধনের পাশাপাশি বিশ্বজনীন ন্যায়বিচার এর অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন(৪:৫৮; ৫;৮; ১৬;৯০) করাও কুরআনিক বিধিবিধানের অন্যতম উদ্দেশ্য।

বলা বাহুল্য, এই সময় রাসূলুল্লাহ(সা.) স্বয়ং সাহাবাদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন এবং কুরআন ও সুন্নাহর যা কিছুই নাযিল হত তিনি সাহাবাগণকে আন্তরিকভাবে তা শিক্ষা দিতেন আর এজন্যই এই সময় কোন ইখতিলাফ ছিল না। হ্যাঁ, সাহাবাদের মাঝে অতি নগণ্য যেসব বিষয়ে ইখতিলাফ ছিল তাকে বর্তমান সময়ে ইখতিলাফ এর চিত্র দিয়ে বিচার করলে একেবারেই উপেক্ষণীয়(বানু কুরায়যার এলাকায় যেয়ে সালাত আদায়ের উদাহরণটি এখানে উল্লেখযোগ্য) বলা যায়। তবে রাসূলুল্লাহ (সা.) কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজে ইজতিহাদ করেছেন। তাঁর ইজতিহাদ ভুল হলে আল্লাহ তাঁকে সংশোধন করে দিয়েছেন (বদর যুদ্ধে বন্দীদের মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য) আর ঠিক হলে তা ইসলামী বিধানের অংশ বলে সাব্যস্ত হয়েছে। প্রশ্ন আসতে পারে, যখন সরাসরি ওয়াহী নাযিল হচ্ছে তখন তিনি কেনই বা ইজতিহাদ করতে গেলেন? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমরা ‘ইজতিহাদ’ এর সংজ্ঞাটা জেনে নেই-

The process of arriving at reasoned decisions to suit new circumstances and the decisions themselves are referred to as ‘Ijtihaad’.  [The Evolution of Fiqh, Dr. Bilal Philips]

সুতরাং ইজতিহাদ সর্বদাই নতুন যুগের নতুন সমস্যার ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে গ্রহণযোগ্য সমাধান দিয়ে ইসলামকে সকল যুগের উপযোগী জীবন ব্যাবস্থা হিসেবে তুলে ধরবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) জানতেন তাঁর মৃত্যুর পর নতুন নতুন সমস্যা দেখা দিবে আর সেগুলোর সমাধানের জন্য সাধারণ মানূষ সাহাবায়ে কেরামগণের কাছে আসবে কারণ তাঁরাই তো সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান পরবর্তীদের মাঝে প্রচার করবেন। এজন্যই নতুন যুগের নতুন পরিস্থিতির আলোকে তাঁদেরকে ইজতিহাদ এর উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্যই তিনি নিজে ইজতিহাদ করেছেন এবং কখনো কখনো সাহাবাদেরকেও ইজতিহাদ করতে বলেছেন। এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হল- বানু কুরায়যার বিচার করার জন্য সা’দ বিন মু’আয কে দায়িত্ব দেওয়া। পরে তিনি নিশ্চিত করেন যে সা’দ এর বিচার যথার্থ হয়েছিল। অর্থাৎ বলা যায়, এই সময়ে সাহাবাদের ইজতিহাদ ছিল মূলত আসন্ন সময়ের জন্য ‘প্র্যাক্টিস’।

এখানে মনে রাখতে হবে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ব্যাক্তিগত ইজতিহাদ ভুল হলে আল্লাহ অবশ্যই ওয়াহীর মাধ্যমে সংশোধন করে দিয়েছেন এবং ঠিক হলে ওয়াহী না পাঠিয়েই তা অনুমোদন করেছেন। আর এই দুই শর্তেই কেবল রাসূলুল্লাহ(সা.) এর ইজতিহাদ শারী‘আহর মর্যাদা লাভ করে।

সবশেষে বলা যেতে পারে, এই সময়টাই ফিক্বহ বিবর্তনের সূচনাবিন্দু। কারণ, নাযিলকৃত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ওয়াহী ছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবাগণকে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে ইজতিহাদ করার ‘প্র্যাক্টিস’ করাতে  থাকেন। পরবর্তীতে কাল পরিক্রমায় তা বিশাল এক বিজ্ঞানের রূপ ধারণ করে। আমরা পরবর্তী পর্বগুলিতে তা দেখব ইনশাআল্লাহ।