শীতের আমেজ পড়ে গেছে। সকালের মিষ্টিরোদে বসার এই অনুভূতিটা একেবারেই অন্যরকম তাইনা? অথচ এই ছড়িয়ে থাকা রোদকে যদি এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত করা হয়, তখন কী হয় বলুন তো! ছোটবেলায় আমরা  ম্যাগনিফায়িং গ্লাস দিয়ে এমন খেলতাম না? রোদের আলোকে ফোকাস করে কাগজের উপর ফেললে কাগজে আগুন ধরে যেতো। দৃশ্যটা কল্পনা করলেই বোঝা যাবে, ফোকাসের শক্তি কত বেশি!

IMG_20191107_220434.jpg

‘ফোকাস’ মানে কী? ‘মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা’। সহজ কথায়, দশটা কাজ একসাথে না করে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজে মনোযোগ নিবদ্ধ করা।

টাইম ম্যানেজমেন্টের ১৫ নং পর্বে আমরা ডিসট্র‍্যাকশন নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। এই মাল্টিপল ডিসট্র‍্যাকশনের যুগে ‘ফোকাসড’ হয়ে কোন কাজ করতে পারা রীতিমতো যুদ্ধ করার মত। অথচ কাজের কোয়ালিটি পুরোটাই নির্ভর করে এই ফোকাসের উপর।

“It’s realizing that extraordinary results are directly determined by how narrow you can make your Focus.” ~ Garry Keller

ফোকাস আমাদের কেন করতে হয়? বহুল পঠিত বই ‘Deep Work’ এর লেখক ক্যাল নিউপোর্ট বলছেন, কোন একটি কাজে দক্ষতা অর্জন করা কিংবা কাজটি সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার জন্য আমাদের মস্তিষ্কের সংশ্লিষ্ট নিউরনটিকে অধিক মায়েলিন-সমৃদ্ধ (well-myelinated) হতে হয়। তা কিভাবে সম্ভব? আমরা যখন মনোযোগ দিয়ে কোন একটা কাজ দীর্ঘক্ষণ ধরে করতে থাকি, তখন সেই কাজের সার্কিটটি একসময় কম পরিশ্রমে বেশি কার্যকরভাবে ফায়ার করতে পারে। এভাবে একটি নির্দিষ্ট সার্কিট বার বার ফায়ার করতে থাকায় তা নিউরনের অলিগোডেন্ড্রোসাইট (Oligodendrocyte) কোষকে উদ্দীপিত করে। আর এই কোষের কাজই হলো সংশ্লিষ্ট সার্কিটের নিউরনগুলোকে সুন্দরভাবে মায়েলিন-বেষ্টিত করা। ফলে নিউরনগুলো মায়েলিন-সমৃদ্ধ হতে থাকে, আমাদের ঐ কাজটির দক্ষতা বাড়তে থাকে।

তো এই দুর্মুল্য- ফোকাসের যুগেও সফল মানুষেরা কিভাবে ফোকাস করে যাচ্ছেন, তা নিয়ে কয়েকটা গল্প বলি….

পিটার শাঙ্কম্যান আমেরিকার একজন খ্যাতিমান লেখক ও উদ্যোক্তা। তিনি ADHD (Attention Deficit & Hyperactivity Disorder) এর রোগী, তাই দীর্ঘক্ষণ কোনকিছুতে মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না। গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো মনোযোগ দিয়ে করার জন্য তিনি বিমানের ফ্লাইট বেছে নেন। তো একবার তিনি একটা বই লেখার কাজ পেলেন, জমা দেয়ার ডেডলাইন মাত্র ১৪ দিন। ২ দিন পার হয়ে গেছে, কাজে হাত দিতে পারেননি, হাতে আছে ১২ দিন। এবার তিনি ৪০০০ ডলার দিয়ে নিউইয়র্ক থেকে টোকিও যাত্রার একটা রাউন্ড ফ্লাইট টিকেট কাটলেন বিজনেস ক্লাস লাউঞ্জের। বিমান ছাড়ার পরপরই বই লেখার কাজে মনোযোগ দিলেন, ১৪ ঘণ্টার ফ্লাইট পুরোটা সময় লিখে বইয়ের ৫ চ্যাপ্টার শেষ করে ফেললেন। টোকিও নেমে একটু হাত-পা ঝেড়ে এক মগ এসপ্রেসো কফি খেয়ে ঐ একই প্লেনের ফিরতি ফ্লাইটে উঠে বসলেন। ফেরতি ফ্লাইটেও পুরোটা সময় লিখে বই শেষ করে ফেললেন। যাওয়া-আসায় মোট ৩০ ঘণ্টারও কম সময়ে পুরো একটা বই লিখে শেষ করা, ভাবা যায়? এত কঠিন একটি কাজ এত অবিশ্বাস্য কম সময়ে কি করে করা সম্ভব হলো? কারণ ‘ফোকাস’। আর শুধু এই ফোকাসড সময়টুকুই তিনি কিনেছিলেন ৪০০০ ডলার দিয়ে। যার কাছে যে জিনিসের মূল্য বেশি! সময়ের মূল্য তো আসলেই ডলারের চেয়ে বেশি, আর ‘ফোকাসড সময়’? সে বাজারতো এ যুগে দুর্মূল্য বললেও কম হয়।

আমাদের আকাবিরেরা কিতাব অধ্যয়নের কাজে কেমন ফোকাসড ছিলেন, তা লিখতে গেলে শেষ করা কঠিন হবে। ইবন জাওযী রহিমাহুল্লাহ এতটাই ফোকাসড হয়ে কাজ করতেন যে, প্রতিদিন কমপক্ষে ৪ কুররাসা বা ৪ টি পুস্তিকা (ছোট বই) লিখতেন। প্রতিবছর তার লেখার পরিমাণ হতো পঞ্চাশ থেকে ষাট জিলদ (খণ্ড)।

উদাহরণ দেয়া যায় আল্লামা ইবন রুশদ রহ. এর কিতাব অধ্যয়নে মনোযোগের। তিনি নিজেই বলছেন-
“বিবেক-বুদ্ধি হওয়ার পর আমি কোনদিন কিতাব মুতালা’আ করা বাদ দিইনি, কেবল আমার পিতার মৃত্যুর দিন ও বাসর রাত ব্যতীত।”

কতটা ফোকাসড হয়ে উনারা কাজ করতেন তা তাদের আকাঙ্ক্ষা জানলেও আন্দাজ করা যায়। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে জারীর তাবারী রহ. তার বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ ‘তারীখে তাবারী’ লেখার আগে ছাত্রদের কাছে জানতে চাইলেন- একটি বিশ্ব ইতিহাস লিখলে তোমরা কি খুশি হবে?
তারা জিজ্ঞেস করলো- হযরত, এর কলেবর কেমন হবে?
তিনি বললেন- আনুমানিক ত্রিশ হাজার পাতা।
তারা বললো- এত বড় কিতাব রচনায় তো কয়েক জীবন পেরিয়ে যাবে!
এ উত্তর শুনে তিনি আফসোস করে বললেন-
“ইন্না-লিল্লাহ! আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস তো দেখছি আজকাল হারিয়েই গেছে!”