“অতঃপর শুভবুদ্ধির অধিকারী দ্বীনের সেই মহান খাদিমদের কাল অতিক্রান্ত হয়ে গেলো। এরপর এমনসব লোকের আগমন ঘটে, যারা সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হওয়ার কারণে হিংসা-বিদ্বেষ ও বিবাদের ঝড় বইয়ে দেয়। মতপার্থক্যপূর্ণ বিষয়গুলোর কোন একটিকে আকড়ে ধরে, এ মতের অধিকারীদের একপক্ষ আর ঐ মতের অধিকারীদের আরেক পক্ষ ভাবতে থাকে- এভাবেই শুরু হয় ফিরকা-পুরস্তী। এতে করে মানুষের মধ্য থেকে বিলুপ্ত হয়ে পড়ে তাহকীক ও চিন্তা গবেষণার জজবা, জায়গা করে নেয় অন্ধ অনুকরণ। আফসোস তাদের এই অবস্থার জন্য!

অথচ এইসব মতভেদপূর্ণ বিষয়ে সাহাবী, তাবেয়ী ও তাদের পরবর্তী মহান আলিমগণের অবস্থা দেখো! তারা নামাযে কেউ বিসমিল্লাহ পড়তেন, কেউ পড়তেন না। কেউ সশব্দে পড়তেন, কেউ নিঃশব্দে। কেউ ফজরে দোয়ায় কুনুত পড়তেন, কেউ পড়তেন না। কেউ নকসীর(নাক দিয়ে রক্ত পড়া), বমি ও ক্ষৌরকার্যের পর অযু করতেন, কেউ করতেন না। কেউ কামনার সাথে স্ত্রীকে স্পর্শ করলে অযু করতেন, কেউ করতেন না। কেউ উটের গোশত খেলে অযু করতেন, কেউ করতেন না।

এতদসত্ত্বেও তাদের একজন অপরজনের পিছে নামাজ পড়তেন। যেমন, আবু হানীফা রহ. ও তার সাথীরা, শাফেয়ী রহ. মদীনার মালেকী ইমামদের পিছে নামাজ পড়তেন। ইমাম আবু ইউসুফ হারুনুর রশীদের পিছে নামাজ পড়েছেন, অথচ তারা ছিলেন ভিন্ন মতাবলম্বী।

একবার ইমাম শাফেয়ী আবু হানিফার কবরের কাছাকাছি স্থানে ফজরের নামাজ আদায় করেন, এসময় তিনি আবু হানীফার সম্মানার্থে ফজরের নামাজে দোয়ায় কুনুত পড়েননি, যদিও তিনি কুনুত পড়ার মতপন্থী ছিলেন। তিনি বলতেন: আমি অনেকসময় ইরাকবাসীদের(আবু হানীফার) মাযহাবের উপর আমল করি।

ইমাম মালিক রহ. ফাতওয়া দিয়েছেন: নকসীর ও ক্ষৌরকার্যের পর অযু করার প্রয়োজন নেই। ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল রহ. বলেছেন: অযুর প্রয়োজন আছে। কিন্তু তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো:
যদি ইমামের শরীর থেকে রক্ত বের হয় আর তিনি অযু না করেন, তবে কি আপনি তার পিছে নামাজ পড়বেন?
ইমাম আহমাদ উত্তর দিলেন:
“কেমন করে আমি মালিক ও সায়্যিদ ইবনুল মুসায়্যিবের পিছনে নামাজ না পড়ে থাকতে পারি?”

~ শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলাবী
(মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে সঠিক পন্থা অবলম্বনের উপায়)

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এক চিঠিতে মাওলানা রশিদ আহমদ গাংগুহী রহ. কে লিখেন:

“অধিকাংশ আম মুকাল্লিদ বরং খাস মুকাল্লিদ এতটাই গোড়া হয় যে মুজতাহিদ (ইমাম) এর বিপরীতে তারা যদি কোন আয়াত বা হাদিস পাঠ করে তবে তাদের অন্তরে প্রশান্তি থাকে না বরং প্রথমে অন্তরে ঘৃণা সৃষ্টি হয়। তারপর অপব্যাখ্যার চিন্তা করে, তাতে অপব্যাখ্যা দূরবর্তী হোক বা শক্তিশালী দলিল তার বিরোধী হোক। মুজতাহিদের দলিল যদিও শুধু কিয়াস নির্ভর হয় এবং নিজের অন্তরও যদি সে অপব্যাখ্যা গ্রহণ না করে, তবুও মাযহাব বাঁচাতে তারা অপব্যাখ্যা কে অত্যাবশ্যক মনে করে। তাদের অন্তর মানতে পারে না যে, তাদের কথা বাদ দিয়ে স্পষ্ট হাদীসের উপর আমল করা হোক। এ কারণে কিছু মতভেদপূর্ণ মাসালা, যেমন- জোরে আমিন বলা ইত্যাদি নিয়ে মারামারি এবং যুদ্ধের ঘটনা ঘটে যায়। তিন যুগে (সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ী) তারা যাকে ইচ্ছা জিজ্ঞাসা করতেন। যদিও এ ব্যাপারে ইজমার কথা বলা হয়ে থাকে যে চার মাযহাব ত্যাগ করে পঞ্চম মাযহাব চালু করা জায়েজ নয় অর্থাৎ যে মাসালা চার মাযহাবের বিপরীতে তার উপর আমল জায়েজ নয়। হক চার মাযহাবে সীমাবদ্ধ, কিন্তু তার পক্ষে কোন দলিল নেই।

তাকলিদে শাখসী জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে এবং তারা তা বিশ্বাস ও আমলগতভাবে এতটাই অত্যাবশ্যক মনে করছে যে, তারা তাকলিদ অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে এতটাই ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করে, তা সালাত ত্যাগকারী ফাসেক ও পাপীদের সঙ্গেও করে না। যদিও তাদের সমস্ত আকিদার কিতাব সুন্নাহ অনুযায়ী হয়।

কিছু মুকাল্লিদ তাদের ইমামকে ভুলের উর্ধ্বে, শতভাগ সঠিক এবং তার অনুসরণ করাকে ফরজ মনে করে পাক্কা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ইমামের মতের বিপরীতে যেমনই সহীহ হাদিস হোক। অথচ ইমামের মত একমাত্র কিয়াস নির্ভর- হাদিসের মধ্যে বিভিন্ন সমস্যা, দোষত্রুটির ধোঁয়া তুলে বা দূরবর্তী অপব্যাখ্যা করে হাদিস কে প্রত্যাখ্যান করতেই হবে। ইমামের মত কে কখনোই পরিত্যাগ করা যাবে না। এই ধরনের তাকলিদ হারাম। এদের ক্ষেত্রে আল্লাহর বাণী:
“তারা তাদের আলিম ও দরবেশদের রব বানিয়ে নিয়েছে” প্রযোজ্য।”

(তাযকিরাতুর রশীদ ১/১৩১, ইমদাদুল ফাতওয়া ৫/২৯৭)

~ আহলে হাদীস- হানাফী ঐক্য: সমস্যা ও সম্ভাবনা(হাফিয সালাহুদ্দীন ইউসুফ)