প্রায়ই ফেসবুকে একটা বিষয় নিয়ে মানুষজনের বিরক্তি চোখে পড়ে আর সেটা হল ছোট বাচ্চাদেরকে কীভাবে মসজিদের ভিতরে ‘মুরুব্বি’রা হুমকি-ধমকি দিয়েছে, কীভাবে সামনের কাতার থেকে ঠেলে পিছনে পাঠিয়ে দিয়েছে কিংবা নামাযের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করার জন্য নামাযের পর মসজিদ থেকে বের করে দিয়েছে ইত্যাদি। এসব দেখে/পড়ে যদিও আমার কষ্ট লাগে তথাপি একটা প্রশ্ন দিনশেষে মাথায় থেকেই যায়- কোমলমতি বাচ্চাদের এমন প্রাণচাঞ্চল্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু মসজিদের ভিতরে এই যে অনাকাঙ্খিত একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হল এর জন্য করণীয় কী? দেখুন, আমি কিন্তু বলছি না যে ‘দায়ী’ কে কারণ কারও উপর দোষ চাপিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না বিশেষত যেখানে শিশুটি সন্দেহাতীতভাবে নির্দোষ। কতিপয় ‘মুরুব্বি’র এমন আচরণ দেখে আমাদের যেমন উচিত হবে না বাচ্চাকে মসজিদ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া তেমনি আবার দিনের পর দিন একই রকম অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয় সেজন্য বাচ্চাদেরকে মসজিদে নেওয়ার আগে আমাদেরও কিছু হোমওয়ার্ক করতে হবে। আসুন তাহলে জেনে নিই কী কী করা যেতে পারে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে ‘শান্তিপূর্ণ’ উপায়ে মসজিদমুখী করার জন্য।

বাচ্চাকে কখন মসজিদে নিয়ে যাবেন: আমাদের সমাজে অনেক উৎসাহী বাবাকে দেখা যায় একেবারে ২/৩/৪ বছরের বাচ্চাদের মসজিদে নিয়ে যেতে। এই বয়সে তারা যেহেতু মসজিদের আদব খুব একটা বুঝতে পারে না তাই তাদের অনাকাঙ্খিত আচরণ নিয়ে তাদেরকে মসজিদের মধ্যে বকা-ঝকা করলে পজিটিভ রেজাল্টতো হয়ই না বরং সে আরও ভয় পেয়ে মসজিদ থেকে দূরে দূরে থাকে। এক্ষেত্রে প্রধান দায়িত্ব বাবাকে পালন করতে হবে। বাচ্চাকে তখনই প্রথমবার মসজিদে নিবেন যখন অন্তত এটুকু সে বুঝতে পারে যে- “মসজিদে নামাযের মধ্যে চিৎকার-দৌড়াদৌড়ি করলে ‘আঙ্কেল’রা মন খারাপ করেন”। এই বুঝ ৭-১০ বছর বয়সের আগে যে বয়সেই আসুক, আপনি তাকে মসজিদে নিয়ে যেতে পারেন।

বাচ্চার প্রথম মসজিদ গমনকে তার জীবনের স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে শিক্ষা দিন: দুঃখের বিষয় হল আমাদের সমাজে শুধু বাচ্চার প্রথমদিন স্কুল গমনকেই বাবা-মায়েরা স্মরণীয় দিন হিসেবে মনে করেন। তাই এই দিন উপলক্ষ্যে তারা বিভিন্ন রকম আয়োজন করে থাকেন, নতুন স্কুল ড্রেস বানিয়ে দেন, নতুন ডায়েরী লিখেন, স্টুডিয়োতে গিয়ে ছবি তোলেন, বাসায় হরেক রকম খাবার-দাবার আয়োজন করেন আর কিছু না করলেও নিদেনপক্ষে বারবার বাচ্চাটিকে বোঝাতে থাকেন যে এই দিনটি তার জন্য কত বিশেষ একটা দিন। একইভাবে বাচ্চাকে প্রথমবারের মত মসজিদে নিয়ে যাওয়ার কয়েকদিন আগে থেকেই তাকে বারবার বোঝাতে থাকুন যে তার জীবনে একটি স্মরণীয় ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। জীবনে প্রথমবারের মত সে তার আল্লাহ্‌র সামনে হাজিরা দিতে যাচ্ছে এবং সেখানে সে সরাসরি আল্লাহর সাথে কথা বলতে পারবে আর আল্লাহও তার কথা শুনবেন। এমনকি সে চাইলে আল্লাহ্‌র কাছে ইচ্ছামত চকলেট/আইসক্রিম/খেলনা চাইতে পারে। একমাত্র আল্লাহই পারেন তার এই চাহিদাগুলো পূরণ করতে। আর তাই আল্লাহ্‌র কাছে চাওয়ার জন্য মসজিদ একটা উত্তম জায়গা [লক্ষ্য করুন, সে কিন্তু ঐ বয়সে বোঝে না যে তাকে ফরয/ওয়াজিব আদায়ের জন্য মসজিদে যেতে হবে, তাই মসজিদের প্রতি আগ্রহী করে তোলার জন্য তার বোঝার মত করে সত্যটা বলুন]।প্রয়োজনে প্রথমবার মসজিদে গমন উপলক্ষ্যে বাসায় একটা ছোটখাট ইসলামি প্রোগ্রাম করতে পারেন। যেখানে বড়রা মসজিদের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলবে আর বাচ্চারা মসজিদ নিয়ে তাদের অনুভূতি জানাবে, তারা কেন মসজিদে যেতে চায় বা চায় না [অনেক বাচ্চা ভয়ের কারণে অনেক সময় যেতে চায় না] তা মন খুলে বলবে। প্রয়োজনে সেদিন বাসায় বাচ্চার পছন্দমত কিছু রান্না করা যেতে পারে, বাবা-মা ও কাছের আত্মীয়-স্বজন বাচ্চাটির জন্য উপহারের ব্যবস্থা করতে পারেন। আরও ভাল হয় যদি এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে এই প্রোগ্রামে কিছু বলার জন্য দাওয়াত করা হয়। বাবা-মার উচিত বাচ্চার সাথে ইমাম সাহেবের পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং ইমাম সাহেবের জন্য জরুরী হল এই উপলক্ষ্যে বাচ্চাটির সাথে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক গড়ে তোলা। এতে বাচ্চাটি আগে থেকেই ইমাম সাহেবকে চিনবে এবং তার ভয় অনেকাংশে কেটে যাবে।

একেবারে শুরুতেই ৫ ওয়াক্ত মসজিদে যেতে জোর করবেন না: উপরের আলোচনা থেকে ধরে নিয়েছি যে, আপনার সন্তানের বয়স এখন ১০ এর কম এবং সে প্রথমদিন মসজিদে গিয়েছে, অনেক আনন্দ নিয়েই গিয়েছে এবং ফিরে এসেছে। এমনটা ভেবে বসবেন না যে প্রথমদিন সে মজা পেয়েছে মানেই এখন থেকে ৫ ওয়াক্ত মসজিদে আসবে। কারণ বাচ্চাদের মন প্রকৃতিগতভাবেই চঞ্চল এবং খেলাধুলা প্রিয়। তাই শুরুতে যতই ভাল লাগুক, দিনের মধ্যে ৫ বার মসজিদে যাওয়াটা অনেক বাচ্চার জন্য বোঝা মনে হতে পারে। তাই আপনি মসজিদে যাওয়ার আগে তাকে জিজ্ঞেস করুন সে যাবে কিনা। যদি না যেতে চায় তবে আবার জিজ্ঞেস করুন এরপর কখন সে যেতে চায়। তার পছন্দের কোন চকলেট/খেলনা থাকলে তাকে বলুন মসজিদে গিয়ে আল্লাহ্‌র কাছে ঐটা চাইতে। সে একথায় যদি অন্তত খেলনা/চকলেটের লোভেও মসজিদে যায় তবে আপনি তাকে ফেরার পথে ঐ খেলনা/চকলেট কিনে দিন এবং তাকে শেখান যে এভাবে মসজিদে আসলে আল্লাহও দূয়া শোনেন। তবে এই পর্যায়ে তাকে জোর করে বকা দিয়ে/টেনে হিঁচড়ে মসজিদে নিয়ে আসবেন না। মসজিদ নিয়ে তার মনে কোন অযথা ভয়/রাগ যেন তৈরী না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তবে বাচ্চারা কখনও নিজে থেকে মসজিদে যেতে চাইলে কিছুতেই তাকে ‘না’ করা যাবে না কিংবা কোন অজুহাতেই তাকে মসজিদে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে দেওয়া যাবে না।

বাচ্চার প্রথম মসজিদ গমন যেন জুম’আর দিন ইংবা সাপ্তাহিক কোন ইসলামিক প্রোগ্রামের দিন না হয়: বাচ্চার প্রথম মসজিদ গমন যেন জুম’আর দিন কিংবা সাপ্তাহিক কোন ইসলামিক প্রোগ্রামের দিন (তাফসীর মাহফিল, তালিম, হালাকা) ইত্যাদি না হয় তা লক্ষ্য রাখুন। কারণ, অভ্যাস ছাড়াই প্রথমবারের মত এত দীর্ঘসময় মসজিদে বসে থাকতে গেলে বাচ্চারা অতিষ্ঠ হয়ে যেতে পারে। এতে কিছুক্ষণ পরেই বাসায় ফেরার জন্য তারা উসখুস শুরু করে এমনকি কান্নাও শুরু করে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে বাবার জন্য যেমন বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরী হয় তেমনি অন্যান্য মুসল্লিদেরও বিরক্তির উদ্রেক করে। তাই প্রথমদিন তাকে কোন ওয়াক্তিয়া সালাতে নিয়ে যান। এভাবে ধীরে ধীরে সে মাসজিদে অবস্থান করতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে তখন জুম’আর সালাতে কিংবা অন্যান্য মসজিদ ভিত্তিক প্রোগ্রামে নিয়ে যেতে পারেন।

মসজিদে প্রবেশ করার পর বাচ্চাকে কড়া নিয়মকানুনের বয়ান করবেন না: বাচ্চাকে নিয়ে মসজিদে প্রবেশের পূর্বেই ন্যূনতম আদবটুকু ভালমত শিখিয়ে দিন। মসজিদে প্রবেশের পর “এটা করা যাবে না-ওটা করা যাবে না” এসব বলে তাকে বিরক্ত ও উদ্বিগ্ন করবেন না। নিশ্চিত করুন যেন মসজিদের ভিতরে আপনার বাচ্চা সবচেয়ে খোলা মনে, খুশি মনে ও নিশ্চিন্তে অবস্থান করতে পারে। নিয়মকানুনের খড়গ মসজিদের ভিতর আনবেন না, যা শেখানোর আগেই শেখাবেন। মসজিদের ভিতরের জগৎটাকে তার আপন করে নিতে দিন।

মসজিদের লাইব্রেরীতে শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক/দ্বীনি কমিক/বই-পত্র রাখুন: আমাদের দেশে প্রায় সকল মসজিদেই দেখা যায় লাইব্রেরী থাকলেও শুধু বড়দের বই-ই থাকে। কুরআন শরীফ, হাদীসের গ্রন্থাবলী ইত্যাদির সাথে সাথে শিশুদের জন্যও বইপত্র রাখা চাই। বর্তমানে বাজারে শিশুদের জন্য কুরআন ও হাদীসের ঘটনাবলী নিয়ে অনেক সুন্দর সুন্দর বই-পত্র আছে। এগুলো সংগ্রহ করে মসজিদ লাইব্রেরীতে একটি Child Corner করা যেতে পারে। মসজিদে এসে সালাতের আগে কিংবা সালাতের পরে বাচ্চারা এখান থেকে নিয়ে বই-পত্র পড়তে পারবে। অনেক মসজিদে বড়রা সালাতের পরে তালিম করে থাকে। মসজিদ কমিটির সহায়তা নিয়ে এবং ইমাম সাহেবের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে মসজিদে বাচ্চাদের তালিমও শুরু করা যেতে পারে। সেখানে একজন ‘বড়’ ব্যক্তি বাচ্চাদের নিয়ে কুরআন ও হাদীসের ঘটনাবলী তাদের মত করে শোনাবেন, এমনকি বাচ্চাদের কোন বই থেকেও পড়ে শোনানো যায়। এতে তাদের দ্বীনের মৌলিক ভিতটুকু যেমন গড়ে উঠবে তেমনি মসজিদ হবে তাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।আবারো বলছি, এজন্য মসজিদ কমিটিকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

কিশোর বয়সের কেউ মসজিদে দুরন্তপনা করলে করণীয়: মহল্লার মসজিদগুলোতে এলাকার কিশোরেরা দল বেঁধে নামাযে যায়, বিশেষ করে লায়লাতুল ক্বদরের রাতে, রমযানের প্রথম তারাবীতে, শবে বরাতের (?) রাতে তারা দলবেঁধে মসজিদে আসে এবং যথারীতি খোঁচাখুঁচি করে। এসব ক্ষেত্রে এবং এর বাইরেও ব্যক্তিগতভাবে কোন কিশোর মসজিদে দুষ্টামি করলে করণীয় কী ? এক্ষেত্রে করণীয় সহজ। যেহেতু সে কিশোর, তার যথেষ্ট বোধ হয়েছে নিজের ও অন্যের ভাল-মন্দ এবং মসজিদের আদব বোঝার জন্য। তাই এক্ষেত্রে তাদেরকে বকা না দিয়ে কাছে ডাকুন। মাথায় হাত বুলিয়ে বোঝান, তার/তাদের বাবা/কোন আত্মীয় মসজিদের মুসল্লি হলে তার সাথে কথা বলে ঐ কিশোরকে নসিহত করতে বলুন, প্রয়োজনে ইমাম সাহেবের সাথে কথা বলিয়ে দিন। দ্বীন হল নসীহাহ, বকা-ঝকা কিংবা গালিগালাজ নয়।

প্রথমদিন মসজিদে যা যা করবেন:

  • ইক্বামতের আগে এতটুকু সময় হাতে নিয়ে মসজিদে যাবেন যেন বাচ্চা এই নতুন পরিবেশ ও নতুন জায়গায় ধাতস্থ হওয়ার সময়টুকু পায়। একেবারে দৌড়ে গিয়ে নামাযে দাঁড়িয়ে গেলে তার অজানা ভয়-আশঙ্কা কিংবা আড়ষ্টতা কাটবে কীভাবে ?
  • যথাসম্ভব সুন্দর ও পরিষ্কার কাপড় পরিয়ে নিয়ে যাবেন। নতুন কাপড় হলে আরও ভাল। এতে বাচ্চার মনে একটা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব থাকে যে, সে খুব বিশেষ কোন কাজে যাচ্ছে।
  • সালাত শুরুর পূর্বেই ইমাম সাহেব ও মুয়াজ্জিনের সাথে তার পরিচয় করিয়ে দিন। পূর্বে পারিবারিক অনুষ্ঠানে ইমাম সাহেবের সাথে পরিচয় হলেও আজকে আবার দেখা করিয়ে দিন। যেন কোন রকম সমস্যা-সংশয় কিংবা প্রশ্ন নিয়ে সে নির্দ্বিধায় এই “ইমাম আঙ্কেল” এর কাছে আসতে পারে। এজন্য ইমাম সাহেব ও মুয়াজ্জিনদেরও ভূমিকা রাখতে হবে।
  • সালাতের পর সাথে সাথে না বেরিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। বাচ্চাকে মসজিদের পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর মত সময় দিন। বাবারা যদি নিজে বাচ্চার হাত ধরে পুরো মসজিদ ঘোরাতে পারেন (বিশালায়তনের মসজিদের ক্ষেত্রে) তাহলে সবচেয়ে ভাল।
  • মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি আঙ্কেলদের সাথে বাচ্চার পরিচয় করিয়ে দিন। এতে সে ভবিষ্যতেও মসজিদে আসলে অচেনা অনুভব করবে না।

যে কোন মুসলিম বাবা-মার জীবনের চরম চাওয়া থাকে তার সন্তানদেরকে দ্বীন ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত রেখে যাওয়া। আর এই চাওয়াকে পাওয়ায় পরিণত করতে হলে একেবারে শৈশবেই সন্তানদের মাঝে দ্বীনের বীজ বপন করতে হবে যার উপযুক্ত বীজতলা হচ্ছে মসজিদ। আল্লাহ আমাদেরকে একটি মসজিদমুখী প্রজন্ম দান করুন। আমীন। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।