গেল সপ্তায় ওয়ার্ডে এক ডাক্তারের স্ত্রী ভর্তি হলেন: ভি আই পি পেশেন্ট, ভি আই পি ট্রিটমেন্ট। মেডিসিনের যত বাঘা বাঘা স্যারেরা লাইন দিয়ে আসতে লাগলেন, আমরা ডিউটি অন ডক্টর, এত বড় বড় স্যারদের এক জায়গায় কখনও দেখিনি, একটা পেশেন্টের জন্য এত স্যারকে আসতে দেখে আমরা রীতিমত ‘থ’: আমরাও সতর্ক থাকার চেষ্টা করছি, কোন ভুল হয়ে গেলে খবর আছে, তিন স্তরের নিরাপত্তাবেষ্টনী দিয়ে ঘেরা পেশেন্ট, আমাদের ইন্টার্ন লাইফে এত ভি আই পি রোগী এই প্রথম…

তো এই আন্টির সমস্যা ছিলো, মাংস খেতে গিয়ে একটা হাড়(ফরেন বডি) ইসোফেগাসে/ট্রাকিয়ায় ঢুকে যায়, সেটা অপারেশন করে বের করার জন্যই এসেছেন। বয়েস চল্লিশের কাছাকাছি হবে, দেখতে একদম সুস্থ। স্যারেরা চলে যাওয়ার পর আমরাও উৎসাহ নিয়ে দেখতে গেলাম: কে এই পেশেন্ট। ভদ্রমহিলা বেশ সুস্থ সবল, ব্যাগে কাপড় চোপড় গোছাচ্ছেন, সবার সাথে দিব্যি কথা বলছেন, আমরাও দুচার কথা বললাম….

পরদিন রাতে আরেক বান্ধবী ডিউটিতে ছিলো, তার সাথে কথা বলতেই:
জানিস, ঐ ভি আই পি পেশেন্টটা ওটিতে মারা গেছে, আমি ডেথ সার্টিফিকেট লিখে এলাম দুপুরে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি’ঊন….

স্যারেরা এখনও বুঝে উঠতে পারছেন না কীভাবে আন্টি মারা গেলেন: কেউ বলছেন অপারেশনের সময় নিউমোথোরাক্স ডেভেলপ করেছিলো, কেউ বলছেন হার্ট ফেইলিউর, ব্লা ব্লা…. এত এত নিরাপত্তার মধ্যে থেকেও ডাক্তারের স্ত্রীর এইরকম অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু! স্যারদের মুখে মুখে প্রশ্ন….

আমি ভাবছিলাম টাইটানিক জাহাজের কথা: শতাব্দীর কাছে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া বহুস্তরের নিরাপত্তাবেষ্টনী বেষ্টিত জাহাজটি প্রথম সেইলিং এই সামান্য বরফের আঘাতে লিকেজ হয়ে ভূমিসাৎ হয়ে গেলো হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে: এ ইতিহাস নতুন নয়। যুগের পর যুগ এসব গল্প আমাদের বার বার এটিই স্মরণ করিয়ে দেয় যে: মানুষের ক্ষমতা বড্ড বেশিই সামান্য। আল্লাহ রাব্বুল ইযযার পক্ষ থেকে যে আদেশ ঘোষিত হয়ে যায়, সারা আ’লামীনের কোন মাখলূক্বের ক্ষমতা নেই সেই আদেশের সামান্যতম রদবদল করার: আল্লাহু আকবার!

فَلَوْلَا إِذَا بَلَغَتِ الْحُلْقُومَ
অতঃপর যখন কারও প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়।
وَأَنتُمْ حِينَئِذٍ تَنظُرُونَ
এবং তোমরা তাকিয়ে থাকো।
وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنكُمْ وَلَكِن لَّا تُبْصِرُونَ.
তখন আমি তোমাদের অপেক্ষা তার অধিক নিকটে থাকি; কিন্তু তোমরা দেখোনা।
فَلَوْلَا إِن كُنتُمْ غَيْرَ مَدِينِينَ-تَرْجِعُونَهَا إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ.
যদি তোমাদের হিসাব-কিতাব না হওয়াই ঠিক হয়, তবে তোমরা এই আত্মাকে ফিরিয়ে আনো না কেন, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো?
[সুরা ওয়াক্বিয়া: ৮৩-৮৭]

প্রতিদিন মৃত্যু, চারিদিকে মৃত্যু, আর আমরা জীবিতরা যে হায়াতের জিন্দেগী বয়ে নিয়ে চলেছি, তা আল্লাহরই দেয়া কিছুদিনের আমানাহ কেবল, চাইলেই ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু সেই আমানাতের সদ্ব্যবহারটুকুই করতে পারছি কি??