– জানিস, বিয়েতে যে গহনা পেয়েছি, তাতে আমাকে এবার যাকাত দিতে হচ্ছে, ইনশাআল্লাহ!
– ল্যাও ঠ্যালা! তারচে ৭ ভরি গহনা রেখে বাকিটা বিক্রি করে দে। যাকাতের বোঝা বয়ে বেড়াতে হবেনা শুধু শুধু….
– আরে, বাচ্চাদের নামে গহনাগুলো দিয়ে তারপর রেখে দে। ওয়ারিশের মধ্যে বণ্টন হয়ে গেলে আর যাকাতের টেনশান নাই…

নাঊযুবিল্লাহি মিন যা-লিক। আল্লাহর দেয়া একটা ফরয ইবাদাতকে আমরা বোঝা/ টেনশান মনে করছি? আমি বলছিনা, এই উপদেশ গ্রহণ করাটা হারাম, এটা বৈধ বটে। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, সব জায়গায় আমরা দুই নাম্বারি করতে গিয়ে আল্লাহর সাথে বেচাকেনায়ও সেই ধান্ধা করছি? লজ্জা লাগা উচিৎ না যে কোন রকমে বাড়তিটুকু বেচে দিয়ে যাকাত থেকে খালাস পাওয়ার উপায় খুজছি? অথচ আল্লাহ তা’আলা নিজেই ওয়াদা করেছেন, আল্লাহর কাছে যারা জান মাল বিক্রি করে দেয়, তাদের প্রতিদান কেবলই জান্নাত। আল্লাহ তো আমাদের দান-সাদাক্বাহ-যাকাত-ফিতরার মুখাপেক্ষী নন, তিনি ধনী আমরাই গরীব, আমাদের নিজের প্রয়োজনেই আমরা তার সাথে বেচাকেনা করি, তাতে আল্লাহ যাল্লা শানুহুর কোন লাভক্ষতি নেই।

চিন্তা করুন, যাকাত আমাদের মুসলিম সমাজের একটা অনন্য বৈশিষ্ট্য, যেটা অন্য কোন ধর্ম কিংবা সমাজব্যবস্থায় নেই। এই সিস্টেমের কারণেই খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মুসলিম খিলাফতে টাকা নেওয়ার মত মানুষ খুঁজে পাওয়া যেতোনা, এতটাই আর্থিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো, যা পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোথাও শোনা যায়নি। যাকাত আমাদের বোঝা নয়, যাকাতের ব্যবস্থাটা আমাদের মুসলিম সমাজের গর্ব, অন্য সব ধর্ম ও সমাজব্যবস্থা থেকে আমাদের ইউনিকনেস। এজন্যেই আবু বাকর রাঃ যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। চিন্তা করেন, ঐ যুগে আপনার জন্ম হলে যাকাত অস্বীকার করলে আপনার বিরুদ্ধে সিদ্দীকে আকবর যুদ্ধে নেমে যেতেন, সেই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যিনি আল্লাহর রাসূলের ঘনিষ্ঠতম মানুষটি ছিলেন, যেই রাসূলকে আমরা ‘ভালোবাসি’। (লিখতে গিয়ে কেঁদে ফেললাম)

এবার চিন্তা করুন: মুসলিম সমাজের এই ইউনিক সিস্টেমে আল্লাহ তা’আলা দুইটি শ্রেণী করব দিয়েছেন: একদল ডোনার, আরেকদল এক্সেপ্টর; কেউ দেবে কেউ নেবে। মানুষের মধ্যে যাদের সম্পদ/ গহনা/ অর্থের পরিমাণ একটা সার্টেইন লিমিট ক্রস করবে, তক্ষণই সে অন্যকে তার সম্পদের অংশ থেকে ভাগ দেবে, অর্থাৎ তার সম্পদের উপর অটোম্যাটিক্যালি দরিদ্রদের হক্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, চাহিবামাত্র নয় বরং না চাহিলেও সে দিতে বাধ্য থাকিবে। এই সার্টেইন লিমিটটাই নিসাব। এই সিস্টেমের কারণেই সম্পদ কেবল একটা শ্রেণীর হাতে কুক্ষিগত হয়ে থাকবেনা, দুটো বিপরীত শ্রেণীর মধ্যে ক্রমান্বয়ে ব্যবধান কমে কমে সাম্যাবস্থায় চলে আসবে, কাউকে আর হাত পাততে হবেনা। চিন্তা করুন, আপনি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন মানেই আল্লাহর দেয়া এত সুন্দর একটা সিস্টেমের দুটি শ্রেণীর মধ্যে ডোনার গোত্রের মধ্যে সিলেক্ট হয়েছেন। আপনার হাত আল্লাহ উচুতে রেখেছেন, নিচু করেননি, এতে তো আপনার বরং আনন্দিত হবার কথা! কেরানীর পদের পরিবর্তে ডিরেক্টরের পদ পেয়ে কেউ অখুশি হয়??

আসুন এখন থেকে অন্যভাবে চিন্তা করি: আলহামদুলিল্লাহ, আমি নিসাবের মালিক হয়েছি, আল্লাহ আমাকে ডোনার শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সোনার হিসেবে নয়, পারলে রূপার হিসেবেই যাকাত আদায় করবো, কম দিয়ে নয়, বেশি দিয়েই ফরয আদায় করবো। যাকাতের উদ্দেশ্যই তো দরিদ্র মুসলিম সমাজের গ্রেটার বেনিফিট, কোনরকমে ১০/১২ টা শাড়ি কিনে দিয়ে খালাস পাওয়া নয়, সমাজের দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রোজেক্টে স্বেচ্ছায় সাগ্রহে অংশ নেয়া, সেই সাথে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সম্পদের পবিত্রকরণ বোনাস।

আমি আবারও বলছি, প্রথম কনভার্সনের প্রস্তাবিত দুটি উপায় অবৈধ নয়, পুরোপুরি বৈধ। কিন্তু আমার পয়েন্ট এই যে: ইবাদাতের সৌন্দর্য হচ্ছে ইবাদাতের ইখলাসে, নিয়্যাতে, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসায়। বাধ্য হয়ে করা ইবাদাত আর আল্লাহ তা’আলাকে ভালোবেসে করা ইবাদত কি এক হতে পারে? আর সত্যিকার ভালোবাসার দাবিদার তো কখনো প্রেমিকের সাথে ছল-চাতুরী করেনা, সে প্রতিদানের আশা ছাড়াই বিলিয়ে যায়: আর প্রতিদানদাতাদের মধ্যে আল্লাহ তা’আলাই কি উত্তম প্রতিদানদাতা নন ??

وَأَنْفِقُوا مِنْ مَا رَزَقْنَاكُمْ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ فَيَقُولَ رَبِّ لَوْلَا أَخَّرْتَنِي إِلَىٰ أَجَلٍ قَرِيبٍ فَأَصَّدَّقَ وَأَكُنْ مِنَ الصَّالِحِينَ

“আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি, তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় কর। অন্যথায় সে বলবেঃ হে আমার পালনকর্তা, আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সদকা করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।”

[সূরা মুনাফিকুনঃ আয়াত ১০]