এই রাত ভারতীয় উপমহাদেশে শবে বরাত বা লাইলাতুল বারা’আত নামে পরিচিত। অথচ এ রকম কোন শব্দ রাসুল ﷺ বা খোলাফায়ে রাশেদিন বা সাহাবি, তাবে, তাবে তাবেইন বা ইমামগন কেউই ব্যবহার করেন নি, উনারা করেছেন লাইলাতুন নিসফু মিন শাবান অর্থাৎ মধ্য শাবানের রজনী।

এই রাত কে অনেকে লাইলাতুল ক্বদরের সাথে গুলিয়ে ফেলেন, লাইলাতুল বারাআত বলতে ‘ভাগ্যরজনী’ মনে করে থাকেন। এই ধারনা সঠিক নয়, ভাগ্যরজনী বা ক্বদরের রাত রমজানের শেষ ১০ বিজোড় রাতের এক রাত।

মধ্য শা’বানের রাতের ফজিলত নিয়ে সহিহ যে হাদিস টি এসেছে তা হল আবূ মূসা আল-আশআরী (রাঃ) বলেন রাসুলুল্লাহ ﷺবলেন:

إن الله تعالى ليطلع في ليلة النصف من شعبان فيغفر لجميع خلقه إلا لمشرك، أو مشاحن.

“আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে (সমগ্র সৃষ্টির প্রতি) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক/ঘৃণাকারী ব্যতীত তাঁর সৃষ্টির সকলকে ক্ষমা করে দেন।” [সুনানে ইবনে মাজাহ-১৩৯০]

সুতরাং, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এই রাতে যারা শিরক করে ও যাদের মনে হিংসা আছে তাদের কে ছাড়া সৃষ্টির সকল কে ক্ষমা করে দেন। সৃষ্টি কুলের উপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার এটি একটি বিশেষ রহমত, যা ইনশাআল্লাহ আপনি এই রাতে ইবাদাত না করলেও আপনা আপনিই আপনার একাউন্টে জমা হয়ে যাবে।

 এই রাতে যা বর্জনীয়:

১- হালুয়া রুটির সংস্কৃতি, পটকা, আতশবাজি ইত্যাদি একদমই বর্জনীয়। শাইখ আব্দুল হক দেহলভী রহ. বলেন, সম্ভবত এই সংস্কৃতি হিন্দুদের ‘দেওয়ালি’ প্রথা থেকে এসেছে।

২- সম্মিলিত আমল। অর্থাৎ সবাই মিলে একসাথে নফল জামাত করে আদায় ইত্যাদি করা যাবে না।

৩- বিশেষ কোন নামাজ নেই, নামাজের নিয়মও নেই। মাকসুদুল মোমেন জাতীয় কিতাবে যে নামাজের কথা আছে সেটা বানোয়াট, মনগড়া পদ্ধতি মাত্র। যেমন, ১০ বার সুরা এখলাস পড়া, বা এই সুরা পড়া, এত রাকাত পড়া, কে কত রাকাত নামাজ পরল সেটা অন্যকে জানায়, এগুলো করা যাবে না।

৪- এই রাতে গোসলের কথা বর্ণিত নেই। গোসল করলে অমুক তমুক ফজীলত, এগুলো ভিত্তিহীন।

৫- এ রাতের পরদিন রোজার রাখার হাদিসটি যায়ীফ। তাই এইদিন নির্দিষ্ট করে রোযা রাখা যাবেনা।

 এই রাতে করণীয়:

(এই রাতের বিশেষ কোন আমল সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়, কেউ ইবাদত করতে চাইলে প্রতি রাতেই করতে পারেন। তবে অন্যান্য রাতের তুলনায় যদি এই রাতে কেউ ব্যক্তিগতভাবে বেশি নামাজ পড়েন বা বেশি দুয়া করেন এতেও কোন বাধা নেই, অনেক আলেম তা জায়েয বলেছেন। অনেক তাবেয়ী এমনটি করেছেন বলেও জানা যায়।)

১- একাকী নফল ইবাদত করা (যেমন: তাহাজ্জুদের নামাজ)। প্রতিরাতেই শেষ রাতে আল্লাহ নিচে নেমে আসেন, বান্দাহর গুনাহ মাফ করেন, অভাব পূরণ করেন।
২- গুনাহ মাফের দুয়া করা।
৩- কারো সাথে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করে থাকলে, বন্ধন পুনস্থাপন করা।
৪- অন্যদের ক্ষমা করে দেয়া।
৫- কারো গীবত বা কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়ে নিতে পারেন।
৬- শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখার কথা একাধিক হাদিসে এসেছে, রাসূল সা: এই মাসে এত রোযা রাখতেন যে উম্মুম মুমিনীনরা বলাবলি করতেন, তিনি বোধহয় আর রোযা ছাড়বেনই না। তাছাড়া প্রতি মাসে আয়্যামে বীজের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে রোজা রাখার কথা সহীহ হাদিসে এসেছে। সুতরাং এই বিবেচনায় কেও যদি ঐ তিন দিন রোজা রাখতে চান, তবে তিনি রোজা রাখতে পারবেন, ইনশাআল্লাহ।

 এই রাত উপলক্ষে যারা ব্যক্তিগতভাবে ইবাদত করার পক্ষে মত দিয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন:
১. তাবিয়ী ইমাম মাকহুল
২. ইমাম আওযাঈ
৩. ইমাম আশ-শাফিয়ী
৪. ইমাম ইসহাক্ব ইবন রাহাওয়াইহী
৫. ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ
৬. ইমাম ইবন রজব রহিমাহুমুল্লাহু তা’আলা আজমাঈন

 এই রাত উপলক্ষে ইবাদত করাকে যারা বিদ’আত বলেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন:
১. তাবিয়ী ইমাম আত্বা ইবন আবী রাবাহ
২. ইমাম ইবন আবী মুলাইকা
৩. ইমাম আব্দুর রহমান ইবন যাইদ ইবন আসলাম
৪. ইমাম মালিক ইবন আনাস
৫. মক্কা ও মদীনার ফক্বীহগন
৬. শাইখ ইবন বায
৭. শাইখ ইবন উছাইমীন
৮. শাইখ জিবরীন রহিমাহুমুল্লাহু তা’আলা আজমাঈন
৯. শাইখ ফাওযান
১০. শাইখ মুনাজ্জিদ
.
আমরা দেখতে পাচ্ছি, উভয় পক্ষেই আহলুস সুন্নাহ উচ্চপর্যায়ের ইমাম ও আলিমগন রয়েছেন। সুতরাং আমাদের নিজেদের অবস্থান যেটাই হোক না কেনো, আমরা এ বিষয়ে বিপরীত মতের উপর আমলকারী ব্যক্তিকে ‘বিদ’আতী’ বলবো না অথবা ‘আমল চোর’ও বলবো না। সালাফদের মাঝে এ বিষয়ে ইখতিলাফ ছিল, কিন্তু বিদ্বেষ ছিল না, ছিল না বিদ’আতী বলার অভ্যাস।

~ সংগৃহীত ও পরিমার্জিত