সালাতে ‘খুশু’ অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়, তবে তা অর্জনে কন্টিনিউয়াস প্রচেষ্টা, আন্তরিক দু’আ ও কিছু নিয়ম-কানুন অনুসরন করা প্রয়োজন।

সালাতে খুশু অর্জনের উপায়:


সালাতের পূর্বে করনীয়:
১। সালাতের অন্তত দশ মিনিট আগে সালাতের স্থানে উপস্থিত হোন, কিছু তাসবীহ পড়ুন(হোক মাসজিদে কিংবা ঘরে)।
২। মু’আযযিনের ইক্বামাতের সাথে সাথে নিজেও পড়ুন, এটিও একটি যিকর।
৩। সালাত শুরুর আগেই সালাতে কী কী সূরাহ পড়বেন সেগুলো প্রস্তুত করুন।
৪। পরিপূর্ণরূপে উযূ করুন।
৫। সালাতের জন্য এমন একটা জায়গা নির্বাচন করুন যেখানে মনোযোগ দেওয়া সহজতর।
৬। সালাতের জন্য উত্তম পোশাক পরিধান করুন, বিশেষ করে ফাজর সালাতে।
৭। সালাতের পূর্বে সম্ভব হলে দু’রাকাত নাফল সালাত পড়ুন।
৮। কিছুক্ষণ ক্বুরআন তিলাওয়াত করুন।
৯। কিছু দু’আ ও আযকার পড়ুন।
১০। সালাতের আগে অন্য কারো সাথে বেশি কথা পরিহার করুন, প্রয়োজনীয় কথা সালাতের পরে বলুন।
১১। সালাতের স্থান/ মাসজিদের আশেপাশে বেশি লক্ষ্য না করে সালাতের দিকে মনোনিবেশ করুন।
১২। জামাতের প্রথম কাতারে দাড়ানোর চেষ্টা করুন, এখানে মনোযোগ রাখা সহজতর।
১৩। কাতার সোজা করুন।
১৪। আল্লাহর বড়ত্ব নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন, যার সামনে আপনি দাঁড়াতে যাচ্ছেন।
১৫। সালাফদের খুশু সংক্রান্ত কাহিনীগুলো মনে করুন(যেমন, আলী রাঃ এর খুশু, আব্দুল্লাহ ইবন যুবাইর রাঃ এর খুশু)।
১৬। সালাতে তাকবীর বলার পূর্বে খুশুর গুরুত্ব ও মর্যাদার কথা স্মরণ করুন।
১৭। ক্ষুধার্ত থাকলে কিংবা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই আগে সেরে আসুন। তবে সালাতের আগে মত্রাতিরিক্ত ভোজন করবেন না, বিশেষ করে তারাবীহ এর সালাতের আগে।
১৮। সালাতের সময় তন্দ্রা অনুভব করলে/ ক্লান্ত থাকলে সালাত শুরু না করে ‘ন্যাপ’ নিন। তবে এরকম প্রাত্যহিক হলে সেক্ষেত্রে আপনার প্রাত্যহিক কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনুন।
১৯। প্রথম কাতারে দাড়ানোর জন্য প্রতিযোগিতা করুন।
২০। ইমামের যথাসম্ভব কাছাকাছি দাড়ানোর চেষ্টা করুন, এতে মনোযোগ নষ্ট হবার সম্ভাবনা কম থাকে।
২১। মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করুন। যখন সালাতে দাঁড়াবেন, তখন মনে করবেন এটাই আপনার জীবনের শেষ সালাত।

সালাতের মধ্যে করনীয়:
১। ‘আল্লাহু আকবার’ শব্দ দু’টির অর্থ ও তাতপর্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন।
২। সালাতে ‘ইহসান’ অর্জনের চেষ্টা করুন। (ইহসান এর সংজ্ঞাঃ তুমি এমনভাবে ইবাদাত করো যেন তুমি আল্লাহকে দেখছো, যদি তা নাও পারো তবে নিশ্চিত থাকো যে তিনি তোমাকে দেখছেন।)
৩। হাত বাধুন এবং দৃষ্টি নিচের দিকে রাখুন।
৪। সালাতের আহকাম, আরকানগুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন করুন।
৫। সালাতে মনোযোগ ও প্রশান্তি আনয়নের জন্য ধীরে ধীরে তিলাওয়াত করুন।
৬। সূরাহ পড়া শুরুর আগে দু’আ পড়ুন(ইস্তিফতাহ এর দু’আ)।
৭। যা তিলাওয়াত করছেন তার অর্থ অনুধাবনের চেষ্টা করুন।
৮। সুন্দর, সুললিত কণ্ঠে তিলাওয়াত করুন, এতে মনোযোগ বেশি থাকে।
৯। আল্লাহ সালাতকে তাঁর ও বান্দাহ এর মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন, তা স্মরণ করা (অর্থাৎ ফাতিহা পাঠের সময় আল্লাহ তার যে জবাব দিয়ে থাকেন সেটা মনে করে পড়া)।
১০। সিজদার স্থানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করুন, এদিক ওদিক তাকাবেন না।
১১। সিজদার মধ্যে ‘সুবহানা রব্বিয়াল আ’লা’ ছাড়াও অন্য আযকার করুন।
১২। সালাতের মধ্যে আকাশের দিকে তাকাবেন না, সবসময় সিজদার স্থানেই দৃষ্টি রাখুন।
১৩। সালাতের স্থানের, কার্পেট বা জায়নামাজের কারুকার্য যেন আপনার মনোযোগে বিঘ্ন না ঘটায়।
১৪। সিজদাহ এর সময় বান্দাহ আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়, তাই সিজদায় বেশি বেশি দু’আ করুন।

সালাতের পরে করনীয়:
১। সালাত শেষ হওয়ার পরপরই উঠে না গিয়ে কিছু দু’আ ও আযকার করুন, কেননা সালাত শেষে উঠে দাঁড়ানো কিংবা উযু নষ্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত ফিরিশতারা তার জন্য দু’আ করতে থাকেন।
২। সালাত শেষে অবশ্যই তিন বার করে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার পড়ুন(রাসূল সাঃ এর উপদেশ)।
৩। সালাতের মধ্যে কোন দু’আ করতে ভুলে গেলে তা করুন।
৪। সালাতে আপনি কতখানি খুশু অবলম্বন করতে পেরেছেন তা নিয়ে আত্মসমালোচনা করুন।
৫। সালাতের মধ্যে অনাকাংক্ষিত কোন ভুল হয়ে যেতে পারে ভেবে তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে নাফল সালাত আদায় করুন।

আরো কিছু করনীয়:
• সালাতে খুশু আনার জন্য ‘চোখ বন্ধ করা’ সুন্নাহভুক্ত নয়, পারতপক্ষে তা না করাই উত্তম।
• সালাতে মনোযোগ নষ্ট করা/ ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে থাকে ‘খিঞ্জাব’ নামক শয়তান। শয়তা্নের ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য বাম দিকে ফিরে আ’উযুবিল্লাহ বলে তিনবার থুথু ফেলুন।
• সালাতের নিয়ম কানুন, খুশু অর্জনের উপায় এসব নিজে জেনে অপরকেও শিক্ষা দিন, যাতে তা আপনার ভালোভাবে আত্মস্থ হয়।
• ‘সালাতকে গতানুগতিক অভ্যাসে পরিণত না করে প্রাত্যহিক আবশ্যিক ইবাদাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করুন’।

তথ্যসূত্রঃ শাইখ ইয়াসীর বিরযাস এর ‘Khusoo’ লেকচার অবলম্বনে।

মূল লেকচার লিংকঃ https://www.youtube.com/watch?v=7KRqNv22F6E