আর রহমান এবং আর রহিম আল্লাহর নামে

মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই গল্প শুনতে পছন্দ করে। গল্পচ্ছলে শিক্ষার্জনও প্রকৃতিগতভাবেই মানুষের জন্য সহজসাধ্য। এ কারণে মহান আল্লাহ আজ্জা ওয়া যাল অতীতের বিভিন্ন সত্য ঘটনা উল্লেখ করার মাধ্যমে আমাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক শিক্ষা দিয়েছেন। এমনই একটি ঘটনা হলো আসহাবে কাহফ বা গুহাবাসীদের ঘটনা। আল-কুর’আনে বর্ণিত অন্যান্য ঘটনার মতো এটিও অনেক শিক্ষণীয় এবং প্রত্যেক বিশ্বাসীর জন্য এতে রয়েছে চিন্তার খোরাক। এই ঘটনাটি সূরা কাহফের ৯-২৬ আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে। এই সত্য অথচ বাখ্যাতীত ঘটনাটির মূলকথা হল- “ঈমানের পরীক্ষা”।

এছাড়াও এর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে শেখাচ্ছেন-

১। ইসলামি একত্ববাদের জন্য আত্মত্যাগঃ

এই ঘটনার মূল শিক্ষা হলো ইসলাম ও একত্ববাদের জন্য আমাদের আত্মত্যাগ কেমন হতে পারে। যে তরুণদের ঘিরে এই ঘটনাটি তাদের সমকালীন সমাজ ও শাসক আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করেছিল। কতিপয় যুবক যারা এই কাজে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, তারা যদি আল্লাহর সাথে অন্যান্য মিথ্যা মা’বুদের ইবাদাত করত তবে হয়ত তাদের সমাজের রোষানলে পড়তে হত না; কিন্তু তারা তা করেনি, ফলশ্রুতিতে আল্লাহর সাহায্যে কোনো ক্ষতিই তাদের স্পর্শ করতে পারেনি। বর্তমানে অনেক যুবকদের দেখা যায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বিলাসী জীবনযাপন করে পরিবারের সামান্য বাধার মুখে পড়লেই হা-হুতাশ করে অথচ আলোচ্য ঘটনার যুবকেরা তাদের পরিবার, ঘর, সমাজ এবং নিশ্চিত জীবন ছেড়ে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত জীবনের পথে পা বাড়িয়েছিল। দৃশ্যতই দ্বীনের স্বার্থে এ ছিল অনেক বড় আত্মত্যাগ।

২। যেকোনো পরিস্থিতিতে একমাত্র আল্লাহর ওপর আস্থা পোষণঃ

তরুণরা পালিয়ে এসে সম্পূর্ণ নির্জন, অচেনা ও অজানা গুহার মাঝে আশ্রয় নিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করল এই বলে-

“হে আমাদের প্রভু! আমাদের ওপর আপনার রহমত বর্ষিত করুন এবং সঠিক উপায়ে আমাদের জন্য ব্যবস্থা করুন।” (সূরা আল-কাহফ, ১৮: ১০)

আল্লাহর ওপর অসীম আস্থা স্থাপনের এ এক অনন্য উদাহরণ। এ থেকে আমরা তাওয়াক্কুলের একটি মূলনীতিও জানতে পারি- সর্বসাধ্য চেষ্টার সাথে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে।

৩। যুবকরা সমাজে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারেঃ

যুগে যুগে প্রতিটি সভ্যতার কারিগর হিসেবে থেকেছে ন্যয়নিষ্ঠ যুবকেরাই। তারা সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্যায়-অনাচারের প্রতিবাদে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে। অন্যায্য সামাজিক প্রথাকে তারা তোয়াক্কা করে না। ঈমানদার তরুণদের হৃদয়ে আল্লাহ তা’আলা অগাধ সাহসিকতা দান করেন। আলোচ্য গল্পের যুবকেরা সমাজের প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে শাসকের অত্যাচারের শিকার হয়েছিল। কিন্তু তা তাদের মত প্রকাশে দমাতে পারে নি। হাদীস থেকে জানা যায়, মুসলিম হিসেবে যেসব তরুণ তাদের তারুণ্য ব্যয় করে আল্লাহ তাদেরকে তাঁর আরশের নিচে আশ্রয় দিবেন বিচার দিবসের সেই কঠিন দিনে যেদিন আল্লাহর আরশের ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না। এভাবেই ঈমানদার মুসলিম যুবকেরা দুনিয়া ও আখিরাতে সফলকাম হয়।

৪। যারা কেবল আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, আল্লাহই তাদের জন্য যথেষ্টঃ

আল্লাহ তা’আলা গুহার যুবকদের হৃদয়ে সাহস যুগিয়ে, ঘুমন্ত রেখে এবং মাটির গ্রাস থেকে নিরাপদ রেখে তাদের রক্ষা করেছিলেন। তাই পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন, আল্লাহ আমাদেরকে প্রতিটি অবস্থায় সাহায্য করার সামর্থ্য রাখেন। এজন্য আমাদের করণীয় হলো, তাঁর ওপর অগাধ আস্থা রাখা এবং সুখের দিনগুলোতেও তাঁর আদেশকে যথাযথভাবে মেনে চলা। কেবলমাত্র তাহলেই আল্লাহ আমাদের বিপদের দিনগুলোতে আমাদের ডাকে দ্রুত সাড়া দিবেন। কোনো ঘটনায় আমরা আশার আলো দেখতে না পেলে সেখানেও আল্লাহ অপ্রত্যাশিতভাবে অসম্ভবকে সম্ভব করে ফেলতে পারেন, সমাধান এনে দিতে পারেন। আল্লাহ বলেন-

“যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পরিত্রাণের পথ খুলে দিবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে রিযক দান করবেন; যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভর করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।” (সূরা আত-ত্বলাক, ৬৫: ২-৩)

মূলত কেউ আল্লাহর জন্য আত্মত্যাগে এগিয়ে এলে আল্লাহ তার হৃদয়ে শক্তি যোগান এবং তার এ কাজকে সহজ করে দেন। এটা আল্লাহর ওয়াদা যা তিনি একটি হাদীসে কুদসীর মাধ্যমে জানিয়েছেন- কেউ যদি আল্লাহর দিকে হেঁটে আসে, আল্লাহ তার দিকে দৌড়ে আসবেন। এভাবেই ক্রমান্বয়ে আল্লাহ ও বান্দার মাঝে নৈকট্য বাড়তে থাকে।

৫। দা’ওয়াহর মূলনীতিঃ

যুবকদের কথোপকথন থেকে আমরা দা’ওয়াহর মূলনীতি আহরণ করতে পারি। প্রথমেই মানুষকে তাওহীদের প্রতি আহবান করতে হবে এবং আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করার কুফল বোঝাতে হবে। শুধু গ্রন্থগত তাত্ত্বিক উদাহরণ দেওয়া নয় বরং আলোচনামূলক বিতর্ক এবং যুক্তি ও সাধারণ বুদ্ধির দ্বারা সত্যকে বুঝাতে হবে। যুবকেরা তাওহীদ আর-রুবুবিয়াহ এবং তাওহীদ আল-উলুহিয়াহর দাওয়াত দিয়েছিল এভাবে-

“আমাদের রব আসমান ও জমিনের রব। আমরা তাঁর পাশে আর কোনো প্রভু গ্রহণ করতে পারি না…” (সূরা আল-কাহফ, ১৮: ১৯)

অতঃপর তারা শিরকের ভয়াবহ কুফল সম্পর্কে আলোচনা করেছিল,

“…যদি আমরা করতাম, তবে তা অতিশয় গর্হিত কাজ হতো।” (সূরা আল-কাহফ, ১৮: ১৪)

এরপর সমাজের লোকদেরকে তাদের মতের পেছনে প্রমাণ দেখানোর আহবান করে তারা বলেছিল,

“…তারা এসব মা’বূদ সম্বন্ধে স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থিত করে না কেন?…” (সূরা আল-কাহফ, ১৮: ১৫)

যখন তাদের দাওয়াহ প্রত্যাখ্যাত হলো, তারা একে অপরকে ধৈর্য ও সত্যের ওপর অটল থাকার উপদেশ দিল এই বলে-

“…তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে তাঁর দয়া বিস্তার করবেন এবং তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজকর্মকে ফলপ্রসূ করবার ব্যবস্থা করবেন।” (সূরা আল-কাহফ, ১৮: ১৬)

আল্লাহ তা’আলা সূরা আল-আসরেও একে অপরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেওয়ার ঠিক একই নির্দেশ দিয়েছেন।

। গায়েবের বিষয়ে মাথা না ঘামানোঃ

আল্লাহ তা’আলা মানবজাতিকে তাঁর অসীম জ্ঞানের তুলনায় খুব নগণ্যই জ্ঞান দান করেছেন। আমাদের তিনি যেসব জ্ঞান দান করেছেন তার অধিকাংশই দৃশ্যমান জগত সম্পর্কে। অদৃশ্য জগতের জ্ঞান (যেমন, কিয়ামাতের আলামত, বিচার দিবসের ঘটনাসমূহ, মৃত্যু পরবর্তী পুরষ্কার ও শাস্তি, ইত্যাদি) একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই জানেন। তিনি কেবলমাত্র তাঁর ইচ্ছামাফিক বিষয়গুলোই আমাদের জানিয়েছেন তাঁর নবী ও রসূলদের মাধ্যমে। তাই অদৃশ্যের ব্যাপারে গবেষণা ও অতিরিক্ত মাথা ঘামানো অনুচিত, বরং এসব ব্যাপার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। যুবকেরাও একই কাজটি করেছিল,

“…তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ, তা তোমাদের প্রতিপালকই ভালো জানেন…” (সূরা আল-কাহফ, ১৮: ১৯)

এবং তারা আরো বলেছিল,

“…বলো, আমার প্রতিপালকই তাদের সংখ্যা ভালো জানেন; তাদের সংখ্যা অল্প কয়েকজনই জানে…” (সূরা আল-কাহফ, ১৮: ২২)

৭। কিছু ফিক্বহী নীতিমালা আহরণঃ

ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর যুবকেরা একে অপরকে বলেছিল,

“…এখন তোমাদের একজনকে তোমাদের এই মুদ্রাসহ নগরে প্রেরণ কর; সে যেন দেখে কোন খাদ্য উত্তম ও তা হতে যেন কিছু খাদ্য নিয়ে আসে তোমাদের জন্য…” (সূরা আল-কাহফ, ১৮: ১৯)

আলিমগণ এই আয়াত থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলিতে অনুমতির নীতিমালা তুলে এনেছেন,

১। অন্যদেরকে ক্রয়-বিক্রয়ে নিয়োগ দান বৈধ,

২। সবচেয়ে ভালো খাবারের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করাতে কোনো সমস্যা নেই,

৩। বিক্রয়ের সময় কোনো কিছুকে “সবচেয়ে ভালো” বলে বর্ণনা দেওয়াতে দোষের কিছু নেই।

৮। পরীক্ষার মুহূর্তে করণীয়ঃ

গুহায় ঘুম থেকে উঠার পর বাইরে লোক পাঠানোর ব্যাপারে যুবকেরা আলোচনা করতে লাগল-

“…সে যেন বিচক্ষণতার সাথে কাজ করে ও কিছুতেই যেন তোমাদের সম্বন্ধে কাউকেও কিছু জানতে না দেয়। তারা যদি তোমাদের বিষয় জানতে পারে, তবে তোমাদেরকে প্রস্তারাঘাতে হত্যা করবে অথবা তোমাদেরকে তাদের ধর্মে ফিরিয়ে নিবে এবং সেক্ষেত্রে তোমরা কখনই সাফল্য লাভ করবে না।” (সূরা আল-কাহফ, ১৮: ১৯-২০)

এ থেকে আমরা ধৈর্য ধারণের মূলনীতি এবং সমাজের পরীক্ষা ও দুর্যোগ থেকে দূরে থাকার শিক্ষা পাই। বহু সহীহ হাদীস আমাদের বলে যে, কিয়ামাতের আগে ফিতনা জমিনে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়বে এবং মুসলিমরা নানাভাবে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। এসব ফিতনা থেকে আমাদের দূরে থাকতে হবে এবং তাওহীদ ও সুন্নাহর পথে অবিচল থাকতে হবে। এই আয়াত আমাদের এও শিক্ষা দেয় যে, নিজেদের ও আমাদের দ্বীনী ভাইদের ব্যাপারে গোপনীয়তা সর্বতোভাবে আমাদের রক্ষা করে চলতে হবে।

৯। আলিম ও বয়স্কদের কাছে বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে নেওয়াঃ

এটা বর্তমান ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রবাহের যুগে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শত শত বই, লেকচার এবং তথ্যের উৎস ইন্টারনেটে ছড়িয়ে আছে। এসব উৎসকে বিশ্বাস করার পূর্বে সতর্কতার সাথে যাচাই করে নিতে হবে, বিশেষত ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারগুলোতে। এই মূলনীতিটি আমরা তরুণদের এই কথা থেকে পাই,

“এবং এভাবেই আমি তাদেরকে জাগ্রত করলাম, যাতে তারা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করে…” (সূরা আল-কাহফ, ১৮: ১৯)

তরুণেরা তাদের ঘুমের সময়কাল সম্পর্কে নিশ্চিত হতে একে অপরকে জিজ্ঞেস করেছিল। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে তথ্য যাচাই-বাছাই না করেই গ্রহণ ও প্রচারের কারণে সাধারণ মানুষতো বটেই, অনেক ‘আলিমদের মধ্যেই ভুল বোঝাবুঝি এবং তা থেকে পারস্পরিক দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ ও প্রচার করা তাই মুমিন মাত্রেরই দাবী। হাদীস থেকেও আমরা এই শিক্ষা পাই যেখানে রাসূল (সা) বলেছেন একজন ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শুনবে তাই যাচাই না করেই প্রচার করবে।

১০। অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে বিতর্কে না জড়ানোঃ

মহান আল্লাহ বলেন-

“অজানা বিষয়ে অনুমানের ওপর নির্ভর করে কেউ কেউ বলবে, তারা ছিল তিনজন, তাদের চতুর্থটি ছিল তাদের কুকুর; এবং কেউ কেউ বলে, তারা ছিল পাঁচজন এবং তাদের ষষ্ঠটি ছিল তাদের কুকুর; আর কেউ কেউ বলে, তারা ছিল সাতজন, তাদের অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর; বলো, আমার প্রতিপালকই তাদের সংখ্যা ভালো জানেন; তাদের সংখ্যা অল্প কয়েকজনই জানে; সাধারণ আলোচনা ব্যতীত তুমি তাদের বিষয়ে বিতর্ক করো না এবং তাদের কাউকেও তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করো না।” (সূরা আল-কাহফ, ১৮: ২২)

উপরের আয়াত থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে, অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে বিতর্কে জড়ানো আমাদের নিজেদের ও অন্যদের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। বর্তমান যুগের মানুষের জন্য এটি একটি মারাত্মক সমস্যা, যেমন, দুনিয়াবী ও ধর্মীয় এমন বিষয়ে অনেকেই বিতর্ক করে যেগুলো কখনোই কোনো ফলপ্রসূ সমাধান আনে না। এ জাতীয় বিতর্ক সচেতনভাবে আমাদের এড়িয়ে চলা উচিত।

আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।