রাত্রি ১২:৩০। শীতের রাত, শুনশান নিরব চারদিক, মেয়েকে ঘুমিয়ে দিয়ে যখন নিজে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছি, ঠিক এমনসময় আশেপাশে কোথাও ফ্যান ছাড়ার শব্দ।
– আরে, এই শীতের রাতে ফ্যান ছাড়ে কে আবার?

পরক্ষণেই টের পেলাম: আমার মা, নিচের ফ্ল্যাট থেকেই শব্দটা আসছে। হুম, ‘হট ফ্লাশ(Hot Flush)’। টার্মটার নাম শুনেছেন? একটা মোস্ট কমন পেরিমেনোপজাল সিন্ড্রোম। দিন-রাতের মধ্যে অনেকবার এই ফ্ল্যাশ এটাক হয়: হঠাৎ করে মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুরোটা শরীর গরম হয়ে ঘামতে শুরু করে, একদম ঠকঠকে শীতেও দরদরে ঘাম, দমবন্ধ একটা অনুভূতি, সাথে সাথে ফ্যান ছাড়লে অস্বস্তি একটু কমে। ৪৫/৫০ এর দিকে এসে যখন এতদিনের চলে আসা একটা রেগুলার সাইকেল বন্ধ হয়ে যায়, শরীরের স্বাভাবিক ইস্ট্রোজেন লেভেল দুম করে কমে যাওয়া শুরু করে, সেটা কোপ আপ করতেই তখন বিপরীতে অনেকগুলো ফিজিক্যাল, সাইকোলজিক্যাল, ইমোশনাল সাইন-সিম্পটম শুরু হয়….

হাড়-গোড়ের শক্তি কমে যাওয়া, ক্ষয় হওয়া, হার্টের সমস্যা, প্রেশার বেড়ে যাওয়া, ক্লান্তি, অবসাদ, বিষন্নতা, নিদ্রাহীনতা, হতাশা, বিরক্তি, আইডেন্টিটি ক্রাইসিস এসব তো আছেই, তবে সবচে কষ্টের যে বিষয়টা তা হচ্ছে: ইমোশনাল আনস্ট্যাবিলিটি যেটাকে আমরা বলি ‘মুড সুইং’। মন এই ভালো তো এই মন্দ, সামান্য কষ্ট পেলেও ছোট বাচ্চাদের মত কান্না জুড়ে দেয়া, ছোট ছোট দুঃখগুলো জমে অনেক বড় হতাশার বস্তুতে পরিণত হওয়া, নিজের এতদিনের সব কষ্ট বৃথা মনে হওয়া। এই লক্ষণগুলোর সামষ্টিক আরেকটা নাম আছে, যেটাকে বলে ‘মিডলাইফ ক্রাইসিস(Mid-life crises)’, ৪৫-৬৪ বছর বয়সী নারীরাই সাধারণত এই ক্রাইসিসে ভুগে থাকেন।

মানবমন অদ্ভুত এক ঘুড়ি, চাইলেই সব সময় সে ঘুড়ি নাটাই দিয়ে কন্ট্রোল করা যায়না, মাঝে মাঝে কন্ট্রোলের বাইরেও উড়াল দিতে চায়। হর্মোনাল ইম্ব্যালেন্স এই উড়াউড়ির একটা বড় কারণ। মেয়েদের অনেকেই প্রিমেন্সট্রুয়াল সিন্ড্রোমেও এরকম মুড সুইং সাফার করে, প্রেগন্যান্সির শুরুর দিকে ফার্স্ট ট্রাইমস্টারেও এমনটা খুব বেশি হয় অনেকের, আবার বাচ্চা জন্মের পর পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশানের সাথেও এই হরমোন ওঠা-নামার সম্পর্ক।

আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে বেশ ইমোশন-কন্ট্রোলড একটা মানুষ, আলহামদুলিল্লাহ। মেয়ে পেটে আসার বিষয়টা তখনও জানিনা আমরা, কিন্তু হঠাৎ করেই কয়েকদিন পরপর স্বপ্নে অন্যের বাচ্চা কোলে নেয়া দেখি। এরপর কয়েকদিন ইন্টার্ন ডিউটিতে কয়েকজনের দেয়া ছোট্ট কয়েকটা কষ্ট থেকে বাসায় ফেরার পথে রিকশায় কেদে ফেলি। আবু ফাতিমাহর উপর সামান্য কারণে রেগে গিয়ে কেদে ফেলি। হিসাব মেলাতে পারলাম না, কেন আমি এত কষ্ট পাচ্ছি সবার আচরণে! আমিতো এত সহজে কাদিনা ইউজুয়ালি! অদ্ভূত বিষয় হচ্ছে, এসব ঘটনার সপ্তাহখানেক পরই প্রেগন্যান্সি টেস্ট করে পজিটিভ পাই, এরপর রহস্যের জট খুলতে শুরু করে….

ঐ যে বললাম, মনঘুড়ির নাটাই চাইলেই সবসময় টেনে ধরা যায়না। যারা স্বাভাবিকভাবে ইমোশন কন্ট্রোলে দক্ষ তাদের জন্য একটু সহজ হলেও যারা একটু বেশি ইমোশনাল, তাদের জন্য আরেকটু বেশিই কঠিন। ৪৫+ কিংবা ৫০+ এর যে বয়সে মায়েরা তাদের কৈশোর, যৌবন সব পেরিয়ে বার্ধক্যের সারিতে দাঁড়িয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের জীবনখাতার পাতা খুললে দেখা যাবে, অনেক অনেক কষ্টের ইতিহাস, কিছু কষ্ট হয়তো জমে জমে পাথর হয়ে গেছে। আমাদের জেনারেশনের স্বামীরা স্ত্রীদের অনুভূতির প্রতি যতটা সহনশীল, আমাদের বাবা-মায়েদের যুগে তেমনটা ছিলোনা, দাদী-নানীদের যুগে আরও কম; আমরা যতটা সুযোগ-সুবিধা পেয়ে বড় হয়েছি, আমাদের বাবা মায়েরা অধিকাংশই তা পাননি। তাদের জীবনখাতায় পাওয়ার চেয়ে না-পাওয়ার গল্পই বেশি। আর এই গল্পগুলোর সাথে যখন ৪৫+ এ এসে যোগ হয় ইস্ট্রোজেন কমে যাওয়ার ইমোশনাল ইম্ব্যালেন্স, তখন ছেলেমেয়েদের কাছে পাওয়া ছোট ছোট কষ্টগুলোও অনেক বড় মনে হয়, সামান্য একটা ‘উহ’ কথাতেও তাদের চোখ গড়িয়ে পানি পড়তে থাকে। তাদের কষ্টের কথাগুলো আমাদের সাথে শেয়ার করে যখন একটু হালকা হতে চান, তখন আমরা হয়তো মুখ বাকা করে ভেবে বসি: লেও, টেপরেকর্ডার অন হইলো….

আমরা অনেকে এখনো বাবা-মা হইনি আবার অনেকে হয়েছি, কিন্তু আমরা এখনো ২৫-৩০। পচিশে দাঁড়িয়ে কি পঞ্চাশের অনুভূতি পুরোটা কল্পনা করা যায়? পঞ্চাশোর্ধ মহিলাটির আচরনে আমরা বিরক্ত হই: উহ! এই মা বুড়ো বয়সে ভিমরতি শুরু করেছে কেন? এত্ত ছোট বিষয় নিয়ে ইমোশনের কী আছে? মেনে নিলেই তো হয়। আজীইইইব!!

এই ‘কেন’র উত্তরটাই এতক্ষণ ধরে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলাম। আশা করি একটু হলেও চিন্তার খোরাক পাবেন।

আরেকটা কথা একটু বলে রাখি, আমার এই লেখাটিকে কোন মা তার ছেলেবউয়ের উপর করা অন্যায় আচরনের জাস্টিফিকেশান হিসেবে নেবেন না প্লিজ, আপনার কৃত অন্যায়ের জবাবদিহিতা কিন্তু আপনারই। আমার এই লেখাটি সেইসব ছেলে, মেয়ে কিংবা ছেলেবউ এর জন্য, যাদের কাছে কখনো যদি মনে হয় মায়ের আচরনে হঠাৎ এমন অসংলগ্নতা কিংবা ইম্যাচ্যুরিটি কেন? তাহলে একটু দম নিয়ে আরেকবার ভাবুন, নিজের করা হিসেবে গরমিল হয়ে গেলেও আবার নতুন করে হিসেব মেলানোর চেষ্টা করুন, এই হিসেব অংকের না, সাইকোলজির। ইমোশনাল কিংবা সাইকোলজিক্যাল বিষয় ইমোশন কিংবা সাইকোলজি দিয়েই হ্যান্ডেল করতে হয়। আর হ্যা, আজকে আমি-আপনি ছেলে, মেয়ে; কাল আমরাও কারও মা, কারও শ্বশুর, কারও শাশুড়ি, সময়টুকুর ব্যবধানই কেবল। পঞ্চাশের পিড়িতে পা দিয়ে এই আমাকে-আপনাকেও যেন আফসোস করতে না হয়: মা-কে যদি আরেকটি বার ফিরে পেতাম! আরেকবার জড়িয়ে ধরে বলতে পারতাম- ‘স্যরি, মা!’

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوٓا۟ إِلَّآ إِيَّاهُ وَبِٱلْوَٰلِدَيْنِ إِحْسَٰنًاۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ ٱلْكِبَرَ أَحَدُهُمَآ أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَآ أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا-

“আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন যে তিনি ছাড়া অন্য কারো ‘ইবাদাত কোরোনা ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করো। তারা একজন বা উভয়ই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের প্রতি ‘উফ’ শব্দটিও উচ্চারণ করোনা। তাদেরকে ধমক দিও না এবং তাদের সাথে সম্মানসূচক ভাষায় কথা বলো।” [বানু ইসরাঈল ১৭:২৩]